মহাজোট সরকারের অন্যতম রূপরেখা হিসেবে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ অনন্য। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশক হিসেবে সরকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে, উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে, সমাজের অবহেলিত জনগণসহ সবার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে, সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে তথ্যপ্রযুক্তিসহ অন্যান্য যথাযথ প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি শিক্ষিত দেশ এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষা। আর দেশের ১০০ ভাগ মানুষকে নিমিষেই শিক্ষিত করে গড়ে তোলা যেমন প্রায় অসম্ভব, তেমনি প্রযুক্তি জ্ঞান বাড়ানোও কঠিন একটি কাজ। ইদানীং বিশ্বমানের কনফারেন্সগুলোতে বলা হচ্ছে— একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিশ্বমানের শিক্ষা তথা প্রযুক্তিগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এই বিশাল কাজটি করতেও আমাদের ডিজিটাল প্রযুক্তির উত্পাদনশীলতাকে কাজে লাগাতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের অন্যতম উপাদান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি। বিশ্বের অন্যান্য দেশ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইসিটির গুরুত্ব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এখন পৃথিবীতে আইসিটিবিহীন ভবিষ্যত্ কল্পনা করাও প্রায় অসম্ভব। অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির তুলনায় আইসিটির ক্ষেত্রে সম্পদের প্রয়োজনীয়তা বেশ কম এবং মানব সমাজের ভবিষ্যত্ নিবিড়ভাবে আইসিটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তাই দেশের জাতীয় কর্মসূচিতে এ প্রযুক্তিকে সম্পৃক্ত করতে সবার আগে যেটা প্রয়োজন সেটা হলো আইসিটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আইসিটি হলো যে কোনো প্রকারের তথ্যের উত্পত্তি, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, সঞ্চালন এবং বিচ্ছুরণে ব্যবহূত সকল ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি। এক কথায় আমরা বলতে পারি আইসিটি হলো— তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিগত সুবিধা।
বাংলাদেশ সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের ১ ও ২ পরিচ্ছেদে প্রচলিত সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদের সুষম বণ্টনের নির্দেশনা রয়েছে। সংবিধানে বলা হয়েছে “১৯ (১) সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন। (২) মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।” এই নির্দেশনা জাতীয় উন্নয়নে তথ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রয়োজ্য।
এদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো ভৌত অবকাঠামোতে সমৃদ্ধ নয়, শিক্ষকরাও তত প্রশিক্ষিত নন, গবেষণাগার কিংবা গ্রন্থাগারও তেমন সমৃদ্ধ নয়। এ অবস্থায় আমাদের তরুণ ছাত্রদের অফুরন্ত প্রাণশক্তিকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে উত্সাহিত করতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এখনও গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য শিক্ষক দিয়ে স্কুল-কলেজকে সমৃদ্ধ করা যায়নি। রাতারাতি এত যোগ্য শিক্ষক তৈরি করা সম্ভবও নয়। এ অবস্থায় আমাদের প্রযুক্তির শরণাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজনে ই-বুক কিংবা ই-স্কুলিং করে তা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষায় আইসিটি অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য যে সকল উপাদান বা উপকরণ প্রয়োজন তা হলো বিদ্যুত্ , ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক /টেলিকম সংযোগ, ল্যাপটপ, কি-বোর্ড, মাউস প্রভৃতি আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষের জন্য অতিরিক্ত প্রয়োজন মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, প্রজেকশন স্ক্রিন, হোয়াইট বোর্ড, পারমানেন্ট মারকার, ডাস্টার প্রভৃতি। এ উপাদানসমূহ শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার জন্য নিশ্চিত করার মাধ্যমেই শিক্ষায় প্রকৃত ডিজিটালকরণ সম্ভব।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে রোল মডেল হিসেবে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে দেশের মানুষ জানতে পারে কী কী কাজ করলে একটি প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল বলা যায়। প্রকৃতপক্ষে আমাদের তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা নিয়ে প্রতিযোগিতা হতে পারে। সুখের বিষয়, মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো আমাদের তরুণদের মধ্যে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের প্রয়োগের প্রতিযোগিতার সুযোগ করেছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতা সরকারের সংশ্লি¬ষ্ট সংস্থাগুলোও আয়োজন করতে পারে। যেমন হতে পারে ডিজিটাল সিটির ওপর প্রতিযোগিতা, যেখানে আমাদের দেশের শহরগুলো তাদের কম্পিউটারায়নের বিষয়গুলো একটি মেলায় দেখাবে এবং যে শহর ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বেশি এগিয়ে তাদের পুরস্কৃতও করা হবে। একইভাবে প্রতিযোগিতা হতে পারে সরকারি সংস্থা, হাসপাতাল, পরিবহন সংস্থা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে।
আমাদের দেশে বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ভালো, যেখানে বিদ্যুত্ নেই সেখানে বিকল্প হিসেবে সোলার সিস্টেম আছে—এর মাধ্যমেই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। বাংলাদেশে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিদ্যুতের চাহিদা অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ বিদ্যুত্ ব্যবহারের সুযোগ পায় যা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কম নয়। মহাজোট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কয়েক বছরে বিদ্যুতের অবস্থা যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তবে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক / টেলিকম সংযোগ আমাদের দেশে চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট অপ্রতুল । এই সংযোগগুলো বিশেষত শহর এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিছু বেসরকারি মোবাইল অপারেটর এজ/ জিপিআরএস/ ইভডু ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করে আসছে। কিছু ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার ব্রডব্র্যান্ড ইন্টারনেট এক্সেস দিচ্ছে , সেটাও শহরকেন্দ্রিক আবার দ্রুত গতির ইন্টারনেট থ্রি জি সার্ভিস সেটাও শহরকেন্দ্রিক । শিক্ষায় তথ্য ও প্রযুক্তি নিশ্চিতকরণে মফস্বল থেকে শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সুবিধা বণ্টন করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি মোবাইল অপারেটর, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষামূলক ওয়েবসাইটের আইপিগুলোকে যে কোনো আপারেটরে বিনামূল্যে এক্সেস দিতে হবে। আমরা দেশীয় প্রযুক্তিতে আমাদের টেলিফোন শিল্প সংস্থা স্বল্প মূল্যের ল্যাপটপ তৈরি করছে। আমাদের সবার ল্যাপটপ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সরকারের ডিজিটাল স্বপ্ন যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষায় ডিজিটালকরণের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটালকরণের মাধ্যমে গোটা জাতির ডিজিটাল স্বপ্ন যাত্রার পথ প্রশস্ত হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
