বায়োনিক ম্যান ‘রেক্স’

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩২
কৃত্রিম মানব নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার সীমা নেই। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির দ্রুতগতির কল্যাণে সেই কৃত্রিম মানব তৈরির পালে নতুন হাওয়া লেগেছে। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলোতে হরহামেশাই দেখা মিলত এসব কৃত্রিম মানবের। কৃত্রিম মানব বলতে রোবটকেই উপস্থাপন করা হয়। এসব রোবট নানা কাজের হলেও এদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতির বিষয়টি মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। পাশাপাশি এসব রোবটের গঠনাকৃতি যতটা সম্ভব মানুষের কাছাকাছি হওয়ার বিষয়টিও সবাইকে বেশ আকৃষ্ট করে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর যুগ পেরিয়ে একটা সময় এসে রোবট পরিণত হতে শুরু করে বাস্তবে। বিভিন্ন আকৃতির রোবটের মধ্যে একটা সময় এসে সরাসরি মানুষের আকৃতির রোবটও তৈরি করতে সক্ষম হন বিজ্ঞানীরা। এর ধারাবাহিকতায় এবারে যে কৃত্রিম মানবটি তৈরি করা হয়েছে, তাকে বলা হচ্ছে এখন পর্যন্ত তৈরি সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ‘বায়োনিক ম্যান’। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘রেক্স’। বায়োনিক ম্যান তৈরি নিয়ে গবেষণার সূচনা অনেক আগেই। এর আগে বিভিন্ন সময়েই বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন নানা কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কৃত্রিম পা বা হাত তৈরির ঘটনা খুব বেশি পুরোনো নয়। আর সেগুলো ইতোমধ্যেই ব্যবহার করছেন হাত-পা হারানো মানুষেরা। শুধু তাই নয়, গত কয়েক বছরে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম রক্ত, কৃত্রিম হূদপিণ্ডসহ আরও অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরির বার্তাই জানিয়ে আসছিলেন প্রযুক্তি বিশ্বকে। এবারে কৃত্রিম এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বয়েই তারা তৈরি করেছেন আস্ত একটা কৃত্রিম মানুষ ‘রেক্স’। প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার খরচ করে তৈরি করা হয়েছে এই কৃত্রিম মানব। এতে ব্যবহার করা হয়েছে শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির তৈরি কৃত্রিম রক্ত; এমআইটি’র তৈরি কৃত্রিম পা; অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি কৃত্রিম রেটিনা; ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের তৈরি কৃত্রিম কিডনি, অগ্ন্যাশয়, প্লিহা এবং সোয়ানসিয়া’র তৈরি কৃত্রিম ফুসফুস। উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোসহ ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের যৌথ সহযোগিতায় তৈরি করা হয়েছে সাড়ে ৬ ফুট লম্বা বাদামী রঙের চোখবিশিষ্ট ‘রেক্স’কে। লন্ডনের সায়েন্স মিউজিয়ামে গত ৭ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো প্রদর্শন করা হয় এই বায়োনিক ম্যানকে। উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা রেক্সকে নতুন এক যুগের সূচনা বলেই অভিহিত করছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। একটা সময় পর্যন্ত মানুষের শরীরের কোনো একটি অঙ্গ অকেজো হয়ে গেলে তা প্রতিস্থাপনের কোনো উপায় ছিল না। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে কৃত্রিম অঙ্গগুলো তৈরি হতে থাকে এবং পরীক্ষামূলকভাবে সেগুলোর ব্যবহারও বাড়তে থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত যেভাবে কৃত্রিম সব অঙ্গ দিয়ে রেক্স তৈরি করা হয়েছে, তাতে করে কৃত্রিম অঙ্গ এবং কম্পিউটার চিপের ব্যবহার করে শরীরের সাথে সেগুলোকে সংযুক্ত করার প্রযুক্তি আরও উন্নত হয়েছে। যার ফলে সফলভাবে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনে বিজ্ঞানীরা সফলতা অর্জন করতে পেরেছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। ‘রেক্স’ তৈরির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে রোবোটিক দল শ্যাডো। এই দলের অন্যতম পরিচালক রিচ ওয়াকার এই বায়োনিক ম্যান তৈরি করতে পেরে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘মানুষের শরীরের কত অঙ্গকে প্রতিস্থাপন করা যায়, তা জানতে পেরে আমরা অত্যন্ত বিস্মিত। রেক্সকে সফলভাবে তৈরি করা হলেও এতে একজন মানুষের শরীরের শতভাগ অঙ্গ ব্যবহার করা হয়নি। পাকস্থলী বা এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঙ্গ আমরা এতে ব্যবহার করতে পারিনি। তবে মানবদেহের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ অঙ্গকেই এতে সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে, এই ৬০ থেকে ৭০ ভাগ অঙ্গকে আমরা মানবদেহেও সফলভাবে প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হব। আর তাই এই সাফল্য সংশ্লিষ্ট গবেষণায় নতুন এক যুগের সূচনা করবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।’ এই গবেষণার সাথে সংশ্লিস্ট আরেক বিজ্ঞানী বারটল্ট মেয়ার। তার জন্মই হয় বাম হাত ছাড়া। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বাম হাতের স্থলে কৃত্রিম হাত ব্যবহার করে আসছেন। তিনি তার মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘বায়োনিক প্রযুক্তি নিয়ে আমি নিজেও দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ প্রকাশ করে আসছি এবং তা আমার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণেই আমার কাছে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। তবে পাঁচ-ছয় বছর আগেও এই খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য আমরা দেখতে পাইনি। তবে এখন আমরা এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি, যাতে করে আমরা এসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারি।’ এদিকে এখনও পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গ তৈরি করতে না পারাকেও খুব বড় করে দেখছেন না গবেষকরা। এ বিষয়ে রিচার্ড ওয়াকার বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা একমাত্র পাকস্থলী হিসেবে যেটিকে দেখেছি, সেটি আকারে অনেক বড় এবং তা বিদ্যুত্ উত্পন্ন করে। তাই সেটিকে মানুষের শরীরে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। তবে আমি নিশ্চিত, এ বিষয়ে অনেকেই কাজ করছেন এবং তারা এর একটি সমাধান নিয়ে হাজির হবেন শীঘ্রই।’ কৃত্রিম অঙ্গগুলোর কর্মদক্ষতা যদি সাধারণ অঙ্গের চাইতে বেশি হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে কেউ কেউ কৃত্রিম অঙ্গগুলোর ব্যবহারে উত্সাহিত হবেন কি না, এ নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে এ নিয়ে এখনই চিন্তা করতে নারাজ ওয়াকার। এখনও পর্যন্ত ‘রেক্স’র সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা নিয়েই চিন্তিত তিনি এবং তার দল।