সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোর শক্তি নিয়ে যাদের সন্দেহ ছিল, তাদের সেই সন্দেহ দূর হয়ে গেছে আরব বসন্তের জাগরণের সময়েই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যখন রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভুগছিল, তখন সাধারণ মানুষদের এক কাতারে গাঁথার কাজটি সংগঠিত হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোর মাধ্যমেই। যে কারণে সময়ে সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট। কিন্তু বন্ধ করা যায়নি মানুষের আন্দোলন। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল সার্ভিস ব্যবহার করেই ফেসবুক এবং ইন্টারনেটের অন্যান্য সেবা চালু করা হয় দেশগুলোতে। আর তাতে করে যেন সত্যি করেই বিকল্প গণমাধ্যমে পরিণত হয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। আর এর সাথে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে ব্লগগুলো। সারা বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের উপস্থাপন করার কাজটিতে এই ফেসবুক আর ব্লগই রেখেছে মুখ্য ভূমিকা।
ফেসবুক, ব্লগ আর সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মকে তারপরেও অনেকেই নিছক ব্যক্তিচর্চার স্থান বলেই অভিহিত করতে পছন্দ করে থাকেন। তবে এই প্ল্যাটফর্ম যে ব্যক্তি ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এই প্ল্যাটফর্ম যে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজেও ব্যবহার করা যায়, তার প্রমাণ আবারও একবার মিলল আমাদের এই বাংলাদেশেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে আজকে যে সারা বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে, এর পেছনে অন্যতম প্রধান ভূমিকাই পালন করেছে অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক আর বিভিন্ন ব্লগের মাধ্যমেই এই আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে, ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাংলাদেশে। আর এই আন্দোলনের বড় একটি অংশই এখনও হয়ে যাচ্ছে অনলাইনেই। যারা রাজপথে অবস্থান নিতে পারেন নি, তারা যোগ দিচ্ছেন ফেসবুকে, ব্লগে।
শুরুতে শাহবাগে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের ডাক দেয় ব্লগার এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের দল। তাদের ডাকেই সাড়া দিয়ে জড়ো হতে থাকে মানুষরা। আবার অনলাইনেই প্রতিক্রিয়াশীলদের সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। কেননা বাস্তবে সশরীরে অনেকেই আন্দোলনের বিপক্ষে কথা বলার সাহস না করলেও কাপুরুষের মতোই তারা অনলাইনে ফেক আইডি ব্যবহার করে আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, আন্দোলনের বিরুদ্ধে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনলাইনেই এদের মোকাবেলা করাটাও সশরীরে শাহবাগের আন্দোলনে উপস্থিত হওয়ার সমান বলেই মন্তব্য অনেক ব্লগারের। এদের অনেকেই আবার সরাসরি শাহবাগ থেকেই আন্দোলনের নানা খবর ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছেন অনলাইনে, ফেসবুকের পেজে, বিভিন্ন ব্লগে। এই আন্দোলনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই ফেসবুকে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ। এর মধ্যে শাহবাগের আন্দোলনের সার্বক্ষণিক খবর মিলছে ‘শাহবাগে সাইবার যুদ্ধ’ পেজ থেকে। এখানে কেবল শাহবাগের খবরই নয়, মিলছে বলতে গেলে সারা বাংলাদেশের খবর। কোথায় আন্দোলন নিয়ে কী ঘটছে, কারা কী মন্তব্য করছে, তার সব খবরই মিলছে এখান থেকে। এসব খবরের জন্য আরও রয়েছে ‘প্রজন্ম চত্বর’ পেজটি। সেইসাথে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের পেজটিতে মিলছে আন্দোলনের সব খবর এবং ছবি। ফেসবুকের এসব পেজের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্লগেও চলছে আন্দোলন নিয়ে নিয়মিত পোস্ট এবং খবর। পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বীকৃত কিছু ব্লগ রয়েছে যেখানে এই আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালানো হয়ে থাকে। সেই অপপ্রচারের জবাব দিতেও বসে নেই আন্দোলনকারীরা। ক্রমাগত বিভিন্ন ব্লগে তারা সেসবের জবাব দিয়ে যাচ্ছেন। সবমিলিয়ে ব্লগ এবং ফেসবুক পরিণত হয়েছে আন্দোলনের নতুন এক মাধ্যমে। গোটা বিশ্বের বিবেচনায় এটি নতুন না হলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে এটি এক নতুন অভিজ্ঞতা বটে।
