তিন প্রজন্মের বাঙালি- তাদের মধ্যে সময় ও বয়সের বেশ ফারাক, তবু তারা তাদের মতো করেই তারুণ্যের শক্তি সম্বন্ধে সবাইকে সচেতন করে দিতে চেয়েছেন। বিশেষ করে তারুণ্যকে তো বটেই, জয়গানও করেছেন তারুণ্যের। প্রথমজন ১৯১৪ সাল পরবর্তী বলাকা পর্বের রবীন্দ্রনাথ। যিনি স্থবির, জড়, আধমরাদের জাগিয়ে তোলার আহবান জানিয়েছিলেন। বিষয়টা অনেকাংশে মানসিক জড়তার। আর এ চিন্তা মাথায় রেখে ‘ঝড়ের খেয়া’য় উঠে নতুন বন্দরের দিকে পাড়ি জমান তিনি।
বছর কয় পর বাংলা কাব্যের দ্বিতীয় দিকপাল কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের দামামা বাজিয়েই ক্ষান্ত হন না, ‘ধূমকেতু’র আহবানে তারুণ্যের প্রতি আহবান জানান সকল জড়তা ভেঙ্গে কাঁটাভরা পথে নির্ভয়ে এগিয়ে আসতে—লক্ষ্য দেশমাতৃকার মুক্তি। এরপরও তার কণ্ঠে আমরা কেবলই তারুণ্যের জয়গান শুনেছি। শুনেছি তার ভাষায় মুমূর্ষু জাতিকে জেগে উঠে সত্যের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে। নিজেও নেমে পড়েছেন ঝাণ্ডাহাতে বা হার্মোনিয়াম কাঁধে ঝুলিয়ে তারুণ্যের জয়ধ্বনিতে সব পথ মুখর করে তুলেছে। আর তৃতীয়জন? তরুণের স্বপ্ন দেখা ও লেখার নায়ক সুভাষচন্দ্র বসু। পূর্বোক্ত দুজনের অনেকটা পরে জাগ্রত তারুণ্যের প্রতীক হিসাবে সব ভয় দূরে ঠেলে লক্ষ্য অর্জনে সক্রিয় হতে তিনি তারুণ্যের প্রতি আকূল আহবান জানান। তিনিই নজরুলের উদ্দীপক গান নিয়ে মন্তব্য করেন যে- আন্দোলনে হোক, জেলে বসে হোক, সংগ্রামী মানুষ নজরুলের গান গাইবে। তার নেতৃত্বেই গড়ে ওঠেছিল অসাম্প্রদায়িক আজাদ হিন্দফৌজ। উদ্দেশ্য, দেশের স্বাধীনতা অর্জন। কিন্তু সময় ও পরিবেশের কারণে দেশের স্বাধীনতা এসেছিল ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ ধরে অবাঞ্ছিত নানা ঘটনার চাপে।
এরপর সময় কেটেছে অনেকটা, তবে খুব বেশি নয়। ১৯৫২’র বাঙালি তারুণ্য তাদের পূর্বসূরিদের চেতনা ধারণ করেছে কিছুটা অসচেতনভাবেই। পূর্বসূরিদের উদ্দশ্যই ছিল স্বাধীন ভূখণ্ডের পাশাপাশি সংকীর্ণতামুক্ত সামাজিক বিকাশ। আর বাহান্নর তরুণদের স্বপ্ন ও প্রচেষ্টা ছিল তাদের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা আর সে উদ্দেশ্যে উচ্চারিত শ্লোগানগুলোতে ছিল বাংলা-বাঙালির স্বাধীনতার চেতনার প্রকাশ। ঢাকার রাজপথে ফেব্রুয়ারিতে ছোট ছোট পতাকা হাতে তারুণ্যের পথচলার উদ্দেশ্য পতাকা বিক্রি করে শুধু অর্থ সংগ্রহই নয়, জনতার সঙ্গে আত্মীকরণ গড়ে তোলা, একুশের সফল লক্ষ্য অর্জন। নেপথ্যে রাজনৈতিক দল সমর্থন জুগিয়েছে বা নীরব দর্শক হয়ে থেকেছে। কোনো আত্মগোপনে থাকা দল তাদের সার্কুলারে ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে ছাত্র-জনতার শক্তিশালী সংহত চরিত্র অর্জনের লক্ষ্যে আহবান জানিয়েছে। সে আহবান তারুণ্যের উদ্দেশ্যে হলেও মূলকথা সর্ববাদী ঐক্য, চেতনার ঐক্য, যাতে লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত হয়। ঐক্য তরুণ ও বয়সীদের- সর্ববয়সী জনতার।
বাহান্নর তারুণ্য তেমনই এক পথ ধরে চলেছে ছয় দশক আগে- রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ তারুণ্য নিজস্ব মতামতের ভিন্নতা দূরে সরিয়ে রেখে। মাথায় এমন ধারণা ও দৃঢ়তা নিয়ে- জয় আমাদের হবেই। সেদিন তাদের হাতিয়ার ছিল মনোবল আর পথচলা মিছিলে মিছিলে লক্ষ্য অর্জনের শ্লোগান। সেই শ্লোগানের অবশেষ পরিণতি ছিল বিজয় সূচক। সেখানে ছায়া ফেলেছে বাঙালিদের চেতনা। ছয় দশক পর বেলতলা, আমতলা বা মেডিক্যাল ব্যারাক প্রাঙ্গণে নয়, এখন সেই তারুণ্যের উদ্দীপক শক্তি দেখতে পাচ্ছি পূর্বসূরি ছাত্র ও তরুণদের অবস্থান থেকে সামান্য দূরে শাহবাগ চত্বরে। এবার তাদের লক্ষ্য আরো ব্যাপক, আরো গভীর- মানবতার জয়, দানবিক শক্তিকে যথার্থ শাস্তিদানে মানসিক চেতনার জয় নিশ্চিত করা। এবার তারা গানে-শ্লোগানে মাতিয়ে রেখেছে শাহবাগ চত্বর। বাসন্তী আমেজ নতুন মাত্রা পেয়ে গেছে; যেমন পেয়েছিল বাহান্নর বসন্তে সেই ফেব্রুয়ারিতে, এখন সেই ফেব্রুয়ারি একইভাবে এসেছে সময়ের আশ্চর্য সঙ্গতি নিয়ে—একাত্মতা নিয়ে। কাদের মোল্লা নিমিত্ত মাত্র, শাস্তি চাই গোটা রাজাকারকুলের- এমন এক শপথে বলীয়ান শাহবাগ চত্বরের সমাবেশ। জয় তাদের পেতেই হবে।
তারুণ্য যে শক্তির আহবান জানায়, সূচনা ঘটায়, সাধারণত সেই আহবানে সাড়া দেন সববয়সী মানুষ। এমনকি বয়োবৃদ্ধও। তার বয়সী, জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলতে তারুণ্যের সংস্পর্শে এসে। অতীতের মতো ঐতিহ্যবাহী ধারায় শাহবাগ- উত্তপ্ত শাহবাগ সে সত্যই প্রমাণ করতে যাচ্ছে। তবে একাজে দরকার সাবধানতা, সতর্কতা। কারণ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ওতপেতে আছে। লুকিয়ে আছে নানাভাবে পাল্টা আঘাত করতে।
বাহান্ন বিরোধী চক্রে ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র- সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। তারা পারেনি তারুণ্যের শক্তি ভাঙ্গতে। এবার রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, কিছু আছে মৌলবাদী, ধর্মবাদী শক্তি। তারা এখন অনেক পরাক্রান্ত—তাদের হাত এখন অনেক লম্বা এবং তা বিশ্বপরিসরে বিস্তৃত। রাজাকার এখন শুধু রাজাকারই নয়, সে সাপের চেয়েও ভয়ংকর। তার এবং তাদের অপরাধ্যের যোগ্য যুক্তিসঙ্গত সঠিক শাস্তি তাই পিছু হটে। সে শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাখে একমাত্র সংঘবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ, উজ্জীবিত তারুণ্য। দলনিরপেক্ষ এ তারুণ্যের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে শাহবাগ চত্বরে দেখেছি- বয়োবৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং শিশুকেও, যে শিশু আগামী প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাই উদ্দীপ্ত চেতনায় বলতে হয়- জয় হোক তারুণ্যের। যে তারুণ্য যূথবদ্ধ কিন্তু দলীয়বৃত্ত আবদ্ধ নয়। যেমনটা ঘটেছিল ১৯৫২’র ফেব্রুয়ারিতে। আজকের ঐক্য ও সমাবেশ এবং জনসংহতিকে আরো বিস্তৃত করতে হবে। এর সমান্তরাল সমাবেশ ছড়িয়ে যাক দেশের সর্বত্র শহরে-গ্রামে-গঞ্জে। এ চেতনার আগুন জনশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারলে জয় সুনিশ্চিত। আজকের লেখা প্রাণ পাক শাহবাগ সমাবেশে। আজকের দিনটি খোদিত থাক নবভাস্কর্যে।
লেখক:ভাষা সংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক
