গতকাল শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর অস্টম দিনেও জনতার ফেনিল উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিল। পূর্বঘোষিত তিন মিনিট নীরবতা পালনের ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার আবালবৃদ্ধবনিতা জোয়ারের পানির মতো ছুটে এসে প্রজন্ম চত্বরকে সয়লাব করে দেয় বেলা ৩টার মধ্যেই। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া, তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী সব বয়সের মানুষ প্রাণের উচ্ছ্বাসে ঝর্ণাধারার মতো কল কল রবে এগুতে এগুতে প্রজন্ম চত্বরে এসে বজ নিনাদরূপে আছড়ে পড়ে। এ যেন নীলাম্বু রাশির অতন্দ্র তরঙ্গ। এর কলমন্ত্র মুখরিত রূপ এক অনির্বচনীয় দৃশ্যকল্প তৈরি করেছে।
বাঙালি তার হূত্-আত্মপরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠাকল্পে গতকালও সারাদেশে নটবরের মতো জ্বলে উঠেছে। একাত্তরে যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য বাঙালির জাতিসত্তা ও জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে অবধারিত করে তুলেছিল এবার রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় সেই একাত্তরের বীর্যবত্তাকেই বারবার জানান দিয়ে যাচ্ছে। প্রজন্ম চত্বরে যে ইতিহাস নির্মিত হচ্ছে তা যে জাতীয় জীবনে এক মহা গৌরবের প্রতিশ্রুতিবাহী এতে কোন সন্দেহই নেই। বাংলাদেশকে সেই পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় ফিরিয়ে নেবার যে নিরবচ্ছিন্ন চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র চলেছে এতকাল, বাংলার জাগ্রত তরুণ সমাজ এবার তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতেই রুখে দাঁড়িয়েছে তার স্বাজাত্য বোধে উচ্চকিত হয়ে।
জাতীয় পতাকার মর্যাদা তথা মায়ের মর্যাদা রক্ষার এ এক কঠিন লড়াই। একাত্তরে এই লড়াইয়ে আমরা জিতেছি দুর্জয় সাহস, দৃঢ় প্রত্যয়বোধ এবং দেশপ্রেমের উপর ভর করে। পরবর্তী প্রজন্মের মনে সেই শৌর্য-বীর্য-সাহসের উপাখ্যান আমরা সঠিকভাবে মেলে ধরতে পারিনি। আমরা এ ক্ষেত্রে সংকীর্ণতার এবং হীনমন্যতার কাছে আত্মসমর্পণ করে এমন এক আঁধার সৃষ্টি করেছিলাম যার বক্ষ বিদীর্ণ করে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যটাকে আবার ছিনিয়ে আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আর তাই প্রজন্ম চত্বরে নবীন প্রজন্মের যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে তা অনায়াসে সকল ভ্রূকুটিকে অগ্রাহ্য করার ও সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করার শক্তিতে ভরপুর।
গতকাল সারা দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত মানুষ তিন মিনিটের নীরবতা পালন করে। প্রজন্ম চত্বরের অগ্নিস্রাবী ভিসুভিয়াস যেন অকস্মাত্ মহত্ মৌনী ও ধ্যাননিমগ্ন রূপ ধারণ করেছিল ঐ তিন মিনিট কাল। তিন মিনিটের নীরবতা শেষ হতেই আবার মাউন্ট এটনার মতো গর্জে ওঠে ক্ষুব্ধ জনতা, রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ চাই। ঘাতকদের ফাঁসি চাই। এক সকাল থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত তরুণ-তরুণীরা প্রজন্ম চত্বরে অবিরাম ধারায় গগন বিদারী স্লোগান এবং নানান নৃত্যসঙ্গীতের মাধ্যমে আত্মপরিচয় তুলে ধরেছে। এ কি অপরূপ রূপ তাদের। এই তো বাংলাদেশ! এইতো সংগ্রামী বাঙলা! বাঙালির শক্তিমত্তা ও বাঙালির দেশপ্রেমের অতলস্পর্শী রূপ যদি কেউ দেখতে চাও তবে প্রজন্ম চত্বরে যাও। একটি জাতির জীবনে এমন মাহেন্দ্রক্ষণ শত শত বছরেও একবার আসে না। এই অভাবনীয় ইতিহাস নির্মাণ প্রক্রিয়ায় শামিল হবার জন্য ঘর থেকে আজ পাগলপারা হয়ে যারা ছুটে আসছে তারা এই দেশের সূর্যসন্তান, তারা সকলের শ্রদ্ধার্হ।
গতকাল ইসলামী ছাত্র শিবিরের সদস্যরা ঝটিকা হামলা চালিয়ে, বোমা-ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলি চালিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ট্রাইব্যুনাল নস্যাতের জন্য ব্যাপক ভাংচুর করেছে। প্রজন্ম চত্বরে বাতাসের গতি তারা আঁঁচ করতে পারছে না, পারলে এই হঠকারিতা কিংবা একাত্তরের মতো এ ধরনের গণবিরোধী কর্মকাণ্ড তারা নিশ্চয়ই করতে পারতো না। যারা এদেরকে বিভ্রান্ত করছে তারা অচিরেই হয়তো দেখবে যে, ইতিহাসের গতি অনিরুদ্ধ, মিথ্যার গতি বড্ড পিচ্ছিল। সুতরাং ঐ পিচ্ছিল পথে যাদেরই যাত্রা তারা একাত্তরের মতই পা পিছলে পড়বে- পড়বেই, কেননা এইতো ইতিহাসের নির্দেশ।
