লুকোচুরি লুকোচুরি অল্প

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪৯
প্রেম মানে লুকোচুরির গল্প। প্রেম কোনো বাধা মানে না, এমনকি সামাজিক অবস্থানেরও পরোয়া করে না। দুটি মনের ভাবনাগুলো যখন বাঁধা পড়ে, তখন সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে যেতে চায় দুটি হূদয়। সবার প্রেম সব সময় সফল হয় না। মনের মানুষকে একান্তভাবে পেয়ে কেউ যেমন বিজয়ীর হাসি হাসে, তেমনি প্রিয়তম বা প্রিয়তমাকে হারিয়ে বেদনার সাগরে কেউ ভাসেন। হিন্দি সিনেমার জগতে তারকাদের পর্দার বাইরে বাস্তব জীবনে প্রেমের ঘটনাগুলো যুগে যুগে ঝড় তুলেছে, আলোড়িত করেছে দর্শকদের। পর্দার প্রেমের চেয়েও নাটকীয়তাপূর্ণ আবেগময় এবং চমক লাগানো বলিউড তারকাদের প্রেমের বিষয় তুলে ধরেছেন রেজাউল করিম খোকন একটানা বেশ ক’বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর গত বছরের শেষ দিকে অবশেষে গাঁটছড়া বেঁধেছেন কারিনা কাপুর-সাইফ আলি খান। তাদের দুজনের রোমান্স নিয়ে দর্শকমনে কৌতূহল সৃষ্টি হলেও পর্দাজুটি হিসেবে তারা সব ছবিতেই চরমভাবেই ফ্লপ। সাইফ-কারিনা জুটির কোনো ছবিই সফলতা অর্জন করতে পারেনি। সাইফ এর আগে তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় নায়িকা অমৃতা সিংকে বিয়ে করেছিলেন। সেটাও ছিল প্রেমের বিয়ে। কিন্তু দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। সাইফ-অমৃতার বিচ্ছেদ ঘটে যাওয়ার বেশ কয়েকদিন পর সাইফ তার সহশিল্পী কারিনা কাপুরের প্রেমে পড়েন। কারিনা সাইফের চেয়ে দশ বছরের ছোট হলেও তাদের প্রেম গাঢ় হতে বেশি সময় লাগেনি। কারিনা এর আগে বলিউডের আরেক তরুণ নায়ক শহিদ কাপুরের সঙ্গে গভীর প্রণয়ে জড়িয়েছিলেন। তাদের রোমান্সও বলিউডে ঝড় তুলেছিল একসময়। কিন্তু হঠাত্ একসময় কারিনা তার চেয়ে বয়সে বেশ কয়েক বছরের ছোট প্রেমিক শহিদ কাপুরের কাছ থেকে সরে এসে সবাইকে অবাক করেছিলেন। সাইফের সঙ্গে কারিনার বিয়ের পর প্রাক্তন প্রেমিক হিসেবে শহিদ কাপুরের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি সিনেমার ব্যর্থ প্রেমিকদের মতো অনেকটা ভারাক্রান্ত হূদয়ে বলেছিলেন, ‘আমি কামনা করছি কারিনার দাম্পত্য জীবন সুখের হোক সফল হোক।’ যখন তিনি একথাগুলো বলছিলেন তখন তার কণ্ঠে বেদনার সুরে ঝরে পড়ছিল। বলিউডে বিখ্যাত জনপ্রিয় তারকাদের প্রেম রোমান্সের বেশির ভাগ ঘটনাই এমনই নাটকীয় উপাদানে পরিপূর্ণ। বলিউড তারকাদের সব প্রেমই সফলতায় পরিণতি লাভ করে না। এখানে ব্যর্থ প্রেমের অনেক অনেক উদাহরণও রয়েছে। হিট হতে আসে প্রেম, ফ্লপে যায় চলে—বলিউডে এমন কথা চালু রয়েছে বহুদিন ধরে। তারপরেও সেলিব্রেটিদের প্রেমের গতিতে যেন ছেদ পড়েনি। তারা চুটিয়ে প্রেম করে যাচ্ছেন সুযোগ পেলে। অতীতে পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বলিউড সেলিব্রেটিরাও প্রেমের অনেক নাটক করেছেন পর্দার বাইরে বাস্তব জীবনে। সেই সময়ে মিডিয়া ততটা সক্রিয় এবং স্মার্ট ছিল না। তারপরেও তখনকার দিনে হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি তারকাদের প্রেম-রোমান্স রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। পঞ্চাশ দশকে হিন্দি চলচ্চিত্রের সুপারস্টার রাজকাপুর-নার্গিস পর্দায় প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি হিসেবে রীতিমতো ক্রেজ সৃষ্টি করেছিলেন। একসঙ্গে ক্যামেরার সামনে রোমান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে রাজকাপুর-নার্গিস পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। রাজকাপুর বিবাহিত হলেও সুন্দরী অভিনেত্রী নার্গিস তার সঙ্গে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে রাজকাপুরের সংসারে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল। নার্গিস এ নিয়ে মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ছবিতে অভিনয়ের সময় শুটিংয়ে ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। তখন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নার্গিসকে রক্ষা করেছিলেন তখনকার দিনের তরুণ নায়ক সুনীল দত্ত। বয়সে কিছুটা ছোট হলেও নার্গিস সুনীল দত্তের সাহসিকতায় এবং তার প্রতি কেয়ারনেসের কারণে মুগ্ধ হয়ে সুনীলের প্রেমে পড়ে যান নাটকীয়ভাবে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে নার্গিস-সুনীলের প্রেম পরিণয়ে গড়িয়েছিল। পঞ্চাশের দশকে হিন্দি সিনেমার মহানায়ক দিলীপ কুমার তার বহু সাড়া জাগানো ছবির পর্দা অপরূপা সুন্দরী অভিনেত্রী মধুবালার সঙ্গে প্রেমে পড়েছিলেন। দিলীপ কুমার-মধুবালা জুটির অমর প্রেম কাহিনী আজও সবার মুখে মুখে ফেরে। তাদের অভিনীত ‘মুঘল এ আজম’ ছবিটি হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সর্বকালের সর্বসেরা একটি কালজয়ী প্রেমের ছবি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। শাহজাদা সেলিম ও আনারকলির অমর অমর প্রেম গাঁথা রুপালি পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে দিলীপ কুমার-মধুবালা জুটি অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছিলেন। দিলীপ কুমার-মধুবালার প্রতি এতটাই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে তাকে বিয়ে করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিলেন। কিন্তু পেশাগত ও পারিবারিক জটিলতার কারণে তারা দুজন পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যান। দিলীপ কুমার তখন হঠাত্ করে তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট উঠতি সুন্দরী নায়িকা সায়রা বানুকে বিয়ে করেন। দিলীপ কুমারকে হারিয়ে মধুবালা অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়েন। বিরহকাতর মধুবালার অভিনয় জীবনও বিপর্যস্ত হয়। গায়ক অভিনেতা কিশোর কুমারকে বিয়ে করে দিলীপ কুমারের প্রেম ভুলতে চেয়েছিলেন হিন্দি সিনেমার এই কিংবদন্তি সুন্দরী অভিনেত্রী। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রণা তাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছিল। এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন মধুবালা। করুণ পরিণতি হয় তার জীবনের। সে সময়ে হিন্দি সিনেমার জগতে আরেক সুন্দরী মেধাবী অভিনেত্রী মীনা কুমারী তখনকার জনপ্রিয় নায়ক রাজেন্দ্র কুমারের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলেন। পরবর্তীতে উঠতি নায়ক ধর্মেন্দ্রকে মনে ধরেছিল। কিন্তু তাকে একান্তভাবে চেয়েও পাননি। মনের দুঃখে মদ্যপানে আসক্ত হয়েছিলেন মীনা কুমারী। অতিরিক্ত মধ্যপান আর জীবনের প্রতি অবহেলা তার মৃত্যু ডেকে এনেছিল। হিন্দি চলচ্চিত্রের হার্ট থ্রব নায়ক হিসেবে ঝড় তুলেছিলেন দেব আনন্দ। সুন্দরী নায়িকা সুরাইয়ার সঙ্গে দেব আনন্দের পর্দার বাইরে বাস্তবে প্রেম জমে উঠেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেব আনন্দ-সুরাইয়ার প্রেম সফলতা লাভ করেনি। ষাটের দশকের সুন্দরী নায়িকা নূতনের সঙ্গে দেব আনন্দের প্রেম পল্লবিত হলেও একসময়ে তা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল প্রতিকূল পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে। এরপর হিন্দি সিনেমায় রোমিও নায়ক হিসেবে আলোড়ন তুলেছিলেন ঋষি কাপুর। ‘ববি’ ছবিতে টিনএজ নায়িকা ডিম্পল কাপাডিয়ার সঙ্গে ঋষির পর্দা রসায়ন দর্শকদের চমকিত করেছিল। ঋষির প্রতি ডিম্পল অনেকটা দুর্বল হলেও নাটকীয়ভাবে তখনকার সুপারস্টার রাজেশ খান্নার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় তার। ওদিকে ঋষি কাপুরও একসময় তার বহু সিনেমার পর্দা প্রেমিকা নিতু সিংকে বিয়ে করেন। হিন্দি সিনেমার জগতের জনপ্রিয় তারকারা পর্দার বাইরে বাস্তব জীবনে প্রেম-রোমান্স বিয়ের ক্ষেত্রে অনেক নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছেন। যা জমজমাট প্রেমের ছবির চিত্রনাট্যকেও হার মানিয়েছে। বিবাহিত হয়েও অনেক জনপ্রিয় অভিনেতা প্রেমে জড়িয়ে পড়েছেন পর্দা জগতের সুন্দরী নায়িকার সঙ্গে। হিন্দি সিনেমার হি ম্যান হিরো ধর্মেন্দ্র বিবাহিত এবং সন্তানের বাবা হয়েও জনপ্রিয় নায়িকা হেমা মালিনীর সঙ্গে প্রেম করেছেন। অবশেষে তাকে বিয়ে করেছেন। শতাব্দীর সেরা সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন একসময় অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়িকে প্রেম করেই বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের আগে জয়ার সঙ্গে খুব বেশিদিন প্রেম করেননি অমিতাভ। অল্প দিনের প্রেম দ্রুতই পরিণয়ে গড়িয়েছিল। জয়ার সঙ্গে চমত্কার সুখী দাম্পত্য জীবন কাটালেও এক সময় অমিতাভ বচ্চন সুন্দরী অভিনেত্রী রেখার প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করেছিলেন। রেখাকে পেতে অমিতাভ স্ত্রী জয়াকেও উপেক্ষা করতে শুরু করেছিলেন। পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া বলিউডের ‘সিলসিলা’ ছবির প্রধান তারকা ছিলেন অমিতাভ বচ্চন, জয়া ভাদুড়ি ও রেখা তিনজনই। রুপালি পর্দায় তুলে ধরা ঘটনাগুলো তাদের বাস্তব জীবনের প্রতিফলন ছিল। বলিউড সেলিব্রেটিদের প্রেম-রোমান্সের নাটকীয় ঘটনাগুলো যুগে যুগে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। নিজেদের ব্যক্তিজীবনের এসব ঘটনা আড়ালের জন্য বরাবরই তারকারা নানা লুকোচুরি খেলেন প্রায়ই। কিন্তু বলিউড তারকারা বরাবরই প্রেম-রোমান্সের লুকোচুরি খেলা খেলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছেন। লুকিয়ে রাখা যায়নি তাদের অফ স্ক্রিন রোমান্সের গল্প। সাধারণ মানুষও এ বিষয়ে একটু বেশি অনুসন্ধিত্সু থাকে সব সময়ে। ফলে বলিউড তারকাদের প্রেম-রোমান্স নিয়ে লুকোচুরি খেলা এক সময়ে ধরা পড়ে গেছে। এভাবেই চলছে প্রেম-ভালোবাসার অধ্যায় এবং লুকোচুরি খেলা।