ফণী আতঙ্কে উপকূলে লাখো মানুষ ঘূর্ণীঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা সঙ্গে যতটুকু সম্ভব সহায়-সম্বল নিয়েছেন। গবাদিপশুও সঙ্গে নিয়েছেন অনেকে। স্থানীয় প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, আশ্রয়গ্রহণকারীদের জন্য পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
খুলনা অফিস:ঘূর্ণিঝড় ফণী আতঙ্কে খুলনার উপকূলীয় এলাকার তিন লক্ষাধিক মানুষ সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টার পর থেকেই জেলার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন এলাকার মানুষ সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে যাওয়া শুরু করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩২৫টি সাইক্লোন শেল্টার পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
খুলনা জেলা প্রশাসক মো. হেলাল হোসেন জানান, খুলনার উপকূলীয় এলাকায় ছয় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। এরমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ তিন লাখ মানুষকে সাইক্লোন শেল্টারে নিয়ে আসা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
ঘূর্ণিঝড়ের সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে কয়রার বাগালী ইউনিয়নের হোগলা, কয়রা ইউনিয়নের গোবরা, ঘাটাখালী, হরিণখোলা, উত্তর বেদকাশীর গাজীপাড়া, বিনাপানি, গাব্বুনিয়া, দক্ষিণ বেদকাশির জোড়শিং, চোরামুখা, আংটিহারা, গোলখালী, খাশিটানা, মহেশ্বরীপুরের সরদারঘাট, পাইকগাছা উপজেলার শিবসা পাড়ের গড়ইখালী ইউনিয়নের গড়ইখালী, দাকোপের বাণিশান্তা, বাজুয়া, কামারখোলা, সুতারখালী, কালাবগী, নলিয়ান, জেলেখালী, জয়নগর, গুনারী এবং বটিয়াঘাটা উপজেলার শিয়ালীডাঙ্গা এলাকা।
সরেজমিনে দাকোপের পানখালি ও ঝপঝপিয়া নদীর আশ-পাশের কয়েকটি এলাকায় দেখা গেছে, সকাল ১০টার পর থেকেই মানুষ প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে আসছে। শেল্টারগুলোতে মজুত করা হচ্ছে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্বেচ্ছাসেবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য সহযোগিতা করছেন।
সিপিপি’র উপজেলা কমান্ডার দেবাশীষ ঢালী বলেন, আমরা দাকোপ উপজেলায় ১ হাজার ৩৬৫ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছি। ইতোমধ্যে অনেক মানুষকেই সাইক্লোন শেল্টারে নিয়ে গেছি।
কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির টিম লিডার মো. মশিউর রহমান বলেন, সকালে আবহাওয়া ভালো থাকায় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছিল না। তবে দুপুরে আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করলে তারা সাইক্লোন শেল্টারে যাওয়া শুরু করে।
জেলা ঘূর্ণিঝড় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সদস্য ও ত্রাণ শাখার প্রধান সহকারী শাহানা বেগম বলেন, খুলনার কয়রা উপজেলার ১১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫০ হাজার পরিবার, দাকোপের ৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫০ হাজার পরিবার, পাইকগাছার ৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১০ হাজার ও বটিয়াঘাটা উপজেলার ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার পরিবারকে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
সাতক্ষীরা: ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে সাতক্ষীরায় শুক্রবার সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। সকাল থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। তবে দুপুরের পরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির সঙ্গে হালকা বাতাস ছিল। ফণীর সম্ভাব্য আঘাতের আশঙ্কায় জেলার উপকূলীয় এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়।
সুন্দরবন সংলগ্ন দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, ফণীর আঘাতের আশঙ্কায় তার ইউনিয়নের ১৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে নদী ভাঙনকবলিত এলাকার প্রায় ২৫০০ লোককে নেয়া হয়েছে। অন্যদের নিরাপদ আশ্রয় থাকতে বলা হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের মেম্বার আশাশুনির বিছট গ্রামের মো. আব্দুল হাকিম মোড়ল জানান, পাউবো বিভাগ-২ এর আওতাধীন ৭/২ নম্বর পোল্ডারের বিছট গ্রামের নদী ভাঙন দীর্ঘদিনের। খোলপেটুয়া নদীর অব্যহত ভাঙনে বিছট গ্রামের প্রায় এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে গ্রামের দুইটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসাসহ অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। গৃহহারা হয়েছে অনেক পরিবার। ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়া বইলে এই ঝুকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আতঙ্কে রয়েছে এই গ্রামের মানুষ।
জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ঘূর্ণিঝড় ফণীর সম্ভাব্য আঘাতের আশঙ্কায় জেলার ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা শ্যামনগর ও আশাশুনির ১০ হাজার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ১৩৭টি সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল কলেজ মাদ্রাসা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন খুলে রাখা হয়েছে। আশ্রয়গ্রহণকারীদের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোট ১১৬টি মেডিকেল টিম এখন মাঠে রয়েছে।
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী): ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে শুক্রবার বিধ্বস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চারটি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তবে ভাটায় আবার পানি নেমে যাওয়ায় তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কিন্তু রাতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় এলাকার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রশাসনের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসহ সব জায়গার লোকজনকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হচ্ছে।
চালিতাবুনিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, ‘প্রাকৃতিক বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড় ও অব্যাহত নদী ভাঙনের কারণে চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি পয়েন্টের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ দীর্ঘদিন ধরে বিধ্বস্ত হয়ে আছে। কিন্তু এই বেড়িবাঁধ মেরামত না করায় এই এলাকার মানুষের মধ্যে দুর্যোগের ঝুঁকি অনেক বেশি। সর্বশেষ এই ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে জেয়ারের পানি বেড়ে ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকেছে। তাই আমরা লোকজনদের নিরাপদে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছি। এ ছাড়া অনেকে আবার পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।’
চরমোন্তাজ ইউপি চেয়ারম্যান হানিফ মিয়া বলেন, ‘চরআন্ডার ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকেছিল। আবার ভাটায় নেমে গেছে।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে) তপন কুমার ঘোষ বলেন, ‘প্রচুর লোকজন সাইক্লোন শেল্টারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান বলেন, ‘উপজেলার ৫৪টি আশ্রয় কেন্দ্র খুলে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। লোকজন আশ্রয় কেন্দ্রে উঠছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকদের নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে।’
বাগেরহাট: উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে জনসংখ্যার তুলনায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম। প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস এই জেলায়। সেই তুলনায় এখানে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা মাত্র ২৩৪টি। এসব ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা ২ লাখ ২৬ হাজার মানুষের।
শরণখোলা উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন আকন বলেন, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় সিডরে শুধুমাত্র সুন্দরবন সংলগ্ন শরণখোলায় সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। তাই এখানকার মানুষ ঝড়ের পূর্বাভাস পেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তবে উপজেলার মানুষের আশ্রয়ের জন্য যে পরিমাণ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন তা নেই।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলায় মোট ২৩৪টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এর ধারণক্ষমতা রয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার। জেলার সাইক্লোন শেল্টারগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপদ্রুত এলাকার মানুষদের আশ্রয় নিতে তেমন সমস্যা হবে না বলে মনে করছেন এই কর্মকর্তা।
