ভালোবাসার ফাগুন বিদ্রোহের আগুন ঝরালো প্রজন্ম চত্বরে। রাজধানীতে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব গতকাল বসন্তের প্রথম দিনটিতে নতুন প্রেরণা জ্বেলে দিয়েছিল তরুণ প্রাণে। পয়লা ফাগুনের যে দিনটিতে তরুণরা ভালোবাসার আনন্দে মেতে ওঠে সেই দিনটিতেও তারা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি থেকে সরে আসেনি একচুলও। চলছে ক্লান্তিহীন প্রতিবাদ। এ প্রজন্মের কাছে শাহবাগ আন্দোলন হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়। যুদ্ধে জয় না ছিনিয়ে তো বাঙালি ঘরে ফেরে না। তখন কীসের আনন্দ উদযাপন! তাই তরুণরা শরীরে ফাগুনের রং জড়ালেও হূদয়জুড়ে ছিল প্রতিবাদের অনল। আনন্দের দিনটিতে তাই প্রজন্ম চত্বর মঞ্চের প্রতিবাদে আরো তীব্রতা ছড়ালো।
কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে/ নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময় — ফাগুনের প্রথম দিনটিতে দু’টি খবর প্রজন্ম চত্বরে বিজয়ের ঘ্রাণ এনে দিয়েছিল। জাতীয় সংসদে আইন পাস করা হয়েছে যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনালে যে কোন সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আপিল করার অধিকার। অপরটি জাতীয় প্রেসক্লাব যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল কাদের মোল্ল¬া ও অভিযুক্ত মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের সদস্য পদ বাতিল করার ঘোষণা।
বুধবার সকাল থেকেই প্রজন্ম চত্বর বাসন্তি রঙে মেতে উঠেছিল। রাস্তায় বিভিন্ন প্রতিবাদী আলপনাগুলোও রাঙিয়ে তোলা হয়েছিল হলুদ, লাল গাঁদা ফুলে। এসব নানা আয়োজনের মধ্যদিয়েই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের শপথ কেবল দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের ঢেউয়ে এখন সারাদেশ আন্দোলিত, উদ্বেলিত। নানাভাবে সংহতি প্রকাশ করছে সর্বস্তরের মানুষ। কেউ কবিতায়, কেউ গানে, কেউ শ্লোগানে, কেউ দীর্ঘ পোস্টারে বিচারের দাবি জানিয়ে স্বাক্ষর করে তার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কয়েক তরুণ সারা শরীরে বাংলাদেশের পতাকার সবুজ রং মেখে লিখে এনেছেন ‘মা আমি শাহবাগে’। এইভাবেই মায়ের লক্ষ লক্ষ সন্তান এসে জড়ো হচ্ছেন শাহবাগ আন্দোলনে— যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে এক হয়েছিলেন দেশের তরুণ প্রজন্ম। গতকাল তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক কবি বেলাল মোহাম্মদ বলেন, শুধু যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করলেই হবে না। যেসব রাজাকার মারা গেছে তাদের নামে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব পাস করতে হবে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে আমরা সরে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশ হয়ে পড়েছিল দ্বিতীয় পাকিস্তান। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম। আজ ৪২ বছর পর আবার এ শ্লোগান তরুণ প্রজন্মের মুখে শুনছি। এ রকম একটা জাগরণ আমাদের কাঙ্ক্ষিত ছিল।
সুরে সুরে দ্রোহ ছড়ালেন কর্মীরাঃ ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ — ফাগুন সবসময় প্রেরণা হয়ে এসেছে বাঙালি জাতির জীবনে। এবারও তাই এলো। ফাগুনের রং দ্বিগুণ প্রতিবাদ হয়ে আগুন ঝরালো শাহবাগ আন্দোলনে। প্রজন্ম চত্বরে ফাগুনের প্রথম দিনটিতে সাংস্কৃতিক কর্মীরা এসে যোগ দিয়েছেন। সবার স্মৃতিতে ফিরে এলো একাত্তর। এই সাংস্কৃতিক কর্মীদের কার্যক্রম ছিল মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট যা অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করত। হাসিমুখে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জোগাতো। গতকাল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই যোদ্ধারা আবারো এসে দাঁড়ালেন তরুণদের কাতারে। বললেন, এ মুক্তিযুদ্ধ তোমাদের। গতকাল তাদের গান, কবিতার সুতীক্ষ্ম পংক্তিমালা লক্ষ মানুষের হূদয়ে ছড়ালো নতুন প্রত্যয়। বিকাল তিনটার পর থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মীরা দলে দলে আসতে শুরু করেন প্রজন্ম চত্বরে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করে গেছেন তরুণদের এ আন্দোলনে। সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী তিমির নন্দী, মনোরঞ্জন ঘোষাল, ফকির আলমগীর। এছাড়া ছায়ানট, উত্তরায়ণ, শ্রুতিঘর, ঋষিজ, আনন্দন প্রভৃতি সংগঠনের শিল্পীরা সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করে সংহতি প্রকাশ করেন। আবৃত্তি করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, আহকামউল্লাহ, রফিকুল ইসলাম, রেজীনা ওয়ালী লীনা প্রমুখ।
মঞ্চ অনেক দাবি একটাইঃ গত পাঁচ তারিখে ‘শাহবাগ আন্দোলনে’ দ্রোহের যে আগুন তরুণরা জ্বালিয়েছিলেন তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের নানা প্রান্তে। গণজাগরণের মূল মঞ্চের বাইরেও পৃথক পৃথক আয়োজনে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তরুণরা। মূল মঞ্চে সক্রিয় আছে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। জাতীয় জাদুঘরের সামনে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পোস্টার সাটিয়ে শ্লোগানে ও গানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করছেন আন্দোলনরতরা। জাদুঘরের উত্তর গেটে সমবেত হয়ে শ্লোগান দেন ছাত্রমৈত্রীর নেতা-কর্মীরা। গণগ্রন্থাগারের সামনে ছাত্রলীগের মঞ্চ থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্ররা মিলে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। চারুকলার দক্ষিণ ফটকে ‘প্রাগৈতিহাসিক’ নাটক মঞ্চস্থ করে তীরন্দাজ। তীরন্দাজ দুপুর থেকেই গান, শ্লোগান ও বাদ্য বাজিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দাবি করে। চারুকলার মূল ফটকে সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। বাজানো হয় জাগরণের গান। গণগ্রন্থাগারের বিপরীত রাস্তায় খণ্ড খণ্ড হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার দাবিতে শ্লোগান-গান পরিবেশন করেন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ, তেজগাও কলেজ, ঢাকা কমার্স কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
শহীদ জননীর প্রতিকৃতি:শাহবাগে চলমান আন্দোলনে শুরু থেকেই পোস্টারে-গানে বিভিন্ন সংগঠন স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে। গোটা আন্দোলনেই প্রেরণা জুগিয়েছেন শহীদ জননী। গতকাল জাহানারা ইমামের একটি প্রতিকৃতি প্রজন্ম চত্বরে স্থাপন করেন আন্দোলনরতরা। সন্ধ্যা সাতটায় এ প্রতিকৃতি উন্মোচন করা হয়। এ সময় শাহবাগে উপস্থিত সকল জনতা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। মঙ্গলবারের নীরবতা কর্মসূচির পর দ্বিতীয়বারের মতো এ কর্মসূচি পালন করলেন তারা।
বারডেম হাসপাতালের দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে স্থাপন করা হয়েছে প্রতিকৃতিটি। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মাহমুদুল হক মুন্সী বাঁধন জানান, প্রতিকৃতিটির উচ্চতা ৫০ ফুট, প্রস্থ ৩৫ ফুট। জাহানারা ইমাম রাজাকারদের বিচারের দাবির আন্দোলনে অগ্রপথিক। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সংগ্রাম করেছেন। এ প্রতিকৃতি আমাদের আন্দোলনে আরো বেশি প্রেরণা, সাহস, শক্তি ও নির্দেশনা জোগাবে।
ফাঁসির রায় নিয়েই বাড়ি ফিরব:আজিজ সুপার মার্কেট থেকে শাহবাহের প্রজন্ম চত্বর পর্যন্ত রাস্তায় রাখা দীর্ঘ পোস্টারে স্বাক্ষর করে বিচারের দাবি জানিয়ে সর্বস্তরের মানুষ গতকাল সংহতি প্রকাশ করেন। সেই সংহতি প্রকাশে উঠে এসেছে তাদের হূদয়ের আকুতি, প্রাণের দাবি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। সেই পোস্টারে ইমন লিখেছেন, ‘মা বলেছে, ফাঁসির রায় নিয়েই বাড়ি ফিরতে হবে’, নয়ন লিখেছেন, ‘তরুণ প্রজন্মকে আর রাজাকার দেখাতে চাই না’, নঈম লিখেছেন, ‘এক দফা এক দাবি, সব রাজাকার ফাঁসিতে ঝুঁলবি’, ‘রাজাকারের বংশ, করব এবার ধ্বংস’, আমজাদ লিখেছেন, ‘সোনার মাটি সোনার দেশ, ‘রাজাকার তোরে করব শেষ’। সেই স্বাক্ষর পোস্টারে একজন মা লিখেছেন, আমি শুধু আমার ছেলের এই প্রশ্নের সম্মুখিন হতে চাই না যে, ‘তোমাদের চোখের সামনে কিভাবে ওরা বেঁচে গেল’।
সংহতি বাড়ছেই:যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংহতি বাড়ছেই। গতকালও অনেকেই সংহতি প্রকাশ করেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন বসন্ত উত্সবের শোভাযাত্রা নিয়ে শাহবাগে এসে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্ব কলাকেন্দ্র, ঢাকা ওয়েস্টার্ন কলেজ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফিল্ম এন্ড মিডিয়া বিভাগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
গতকাল প্রজন্ম চত্বরে এসে আরো সংহতি প্রকাশ করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি’র সভাপতি আসম আব্দুর রব, নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আহাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা। এর মধ্যে রয়েছেন ক্রাক প্লাটুনের ফতেহ আলী চৌধুরী, আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন বীরপ্রতীক; হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক; ক্যাপ্টেন সাহাব বীরউত্তম; ক্যাপ্টেন আকরাম বীরউত্তম; ক্যাপ্টেন সাত্তার বীরপ্রতীক; ক্যাপ্টেন লিয়াকত বীরউত্তম; মেজর (অব.) ডা. আকতার আহমেদ বীরপ্রতীক; আক্কু চৌধুরী, মেজর জেনালে (অব.) জামিল বীরপ্রতীক প্রমুখ।
এ সময় উপস্থিত হাজারো জনতা করতালি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগত জানান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর করে তোলেন ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই’।
এদিকে গতকাল প্রজন্ম চত্বরে আসা এক শিক্ষার্থী বাহার বলেন, এবার রাজাকারের ফাঁসির দাবি জানানোর মধ্যে দিয়ে বসন্ত উত্সব উদযাপন করছি। এ এক অন্যরকম অনুভূতি।
একই রকম অনুভূতির কথা জানালেন আরেক শিক্ষার্থী কবির। তিনি বলেন, সেই সকালের দিকে বেড়িয়েছি বন্ধুদের সাথে। শ্লোগানে শ্লোগানে গলা মিলিয়েছি। রাজাকারদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ করতে পারিনি, কিন্তু তাদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করতে পারছি, এটাও কি কম?
স্বাগত জানালেন আন্দোলনরতরা:আন্তর্জাতিক মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধন বিল সংসদীয় কমিটিতে পাস এবং জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের সদস্য পদ জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে বাতিল করায় স্বাগত জানানো হয়েছে। গতকাল রাতে গণজাগরণ মঞ্চে বলা হয়-প্রেসক্লাব যুদ্ধাপরাধীদের সদস্যপদ বাতিল করায় অভিনন্দন। সংসদীয় কমিটি ট্রাইব্যুনাল সংশোধন বিল পাস করেছে। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন। সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিসহ সকল দাবি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাব না।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা: ১৯৮২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হন ছাত্র মৈত্রীর নেতা রুপম। গতকাল তার প্রতি শ্রদ্ধা জানায় গণজাগরণ মঞ্চ। দুপুরে এক ঘোষণায়, রুপমের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এর আগে সকালে জাগরণ মঞ্চের সংগঠকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি দল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে রুপমের প্রতি ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
