ঋণ কেলেংকারির ঘটনায় করা ১১ মামলায় হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামকে জামিন দেয়ায় ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জহুরুল হককে তলব করেছে হাইকোর্ট। আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজির হয়ে তাকে এ জামিন প্রদানের পক্ষে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া কেরানীগঞ্জের শিশু পরাগ অপহরণ মামলার ৫ আসামিকে জামিন দেয়ায় ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মজিদকেও তলব করেছে আদালত। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি তাকেও আদালতে হাজির হয়ে এ বিষয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে হবে। একইদিন পিপি এডভোকেট খোন্দকার আব্দুল মান্নানকেও তলব করেছে আদালত। এক ফৌজদারি আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি মাহমুদুল হকের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বুধবার এই আদেশ দেন।
এছাড়া পরাগ অপহরণ মামলার আসামি আমিনুল হক ওরফে জুয়েল মোল্লা, আলফাজ হোসেন, মামুন মিয়া, রিজভী আহমেদ ও আবুল কাশেমের জামিন কেন বাতিল করা হবে না তাও জানতে চেয়েছে আদালত। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্টদেরকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে এ মামলার নথি তলব করা হয়েছে।
শিশু পরাগ মণ্ডল অপহরণ মামলার ৫ আসামি জামিনে মুক্তির ঘটনায় গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আবদুল মজিদের আদালত থেকে বিভিন্ন সময়ে পাঁচজন আসামি জামিন পেয়েছেন। মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই মামলায় প্রথমে অর্থাত্ ২ জানুয়ারি জামিন পান আসামি আবুল কাশেম। এরপর ১৫ জানুয়ারি পরাগ অপহরণের অন্যতম পরিকল্পনাকারী যুবলীগের নেতা আমিনুল হক ওরফে জুয়েল মোল্লা, আলফাজ হোসেন ২৩ জানুয়ারি, রিজভী আহম্মেদ ২৮ জানুয়ারি এবং ৭ ফেব্রুয়ারি মামুন মিয়া জামিন পান। আসামিদের জামিন বাতিল চেয়ে গতকাল হাইকোর্টে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ (ক) এবং ৪৩৯ ধারায় আবেদন করেন সাপ্তাহিক সপ্তবর্ণ পত্রিকার সম্পাদক নাজিম আহমেদ। আবেদনকারীর পক্ষে এডভোকেট ইউনূস আলী আকন্দ ও রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল (ডিএজি) এডভোকেট অমিত তালুকদার শুনানি করেন।
শুনানিতে অমিত তালুকদার বলেন, জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মজিদ পরাগ অপহরণের মামলার ৫ আসামিকে জামিন দিয়েছেন। অথচ এই অপহরণের ঘটনা ছিলো সারাদেশে আলোচিত। অপহরণের প্রধান হোতা জুয়েল মোল্লাকে ধরা যাচ্ছিল না। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসামিকে গ্রেফতার করে। আসামিদের ১৬১ ধারায় জবানবন্দি রয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় ৫ আসামিকে জামিন দেয়া ঠিক হয়নি। এতে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হবে। এই জামিন আদেশ অস্বাভাবিক। এই আদেশ বাতিল করা হোক। এ পর্যায়ে আদালত আইন কর্মকর্তার কাছে জানতে চান যে কোন্ (যুক্তি) গ্রাউন্ডে আসামিদের জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে? জবাবে অমিত তালুকদার বলেন, আমি আজ (বুধবার) ওই আদালতের বিচারকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাকে বলেছেন, এজাহারের আসামিদের নাম না থাকায় জামিন দেয়া হয়েছে। আদালত বলেন, এই মামলার অপরাধ আমলযোগ্য। এজাহারে নাম না থাকলেই কি জামিন দেয়াটা ঠিক হয়েছে?
তখন আবেদনকারীর কৌঁসুলি ইউনূস আলী আকন্দ বলেন, দুই বোতল ফেনসিডিল আটকের মামলায় নিম্ন আদালতে জামিন দেয় না। জামিনের জন্য হাইকোর্টে আসতে হয়। অথচ এই চাঞ্চল্যকর মামলায় নিম্ন আদালত ৫ আসামিকে জামিন দিয়ে দিয়েছে। কয়েকদিন আগে ১১ মামলায় হলমার্কের চেয়ারম্যানকে জামিন দিয়েছে। আদালত বলেন, কিভাবে চলবে এই দেশ? এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারককে তলব করার বিষয়ে আইনজীবীদের মতামত জানতে চায় আদালত। জবাবে ডিএজি অমিত তালুকদার বলেন, নথি তলবের পাশাপাশি বিচারককে তলব করা উচিত। আদালত ডিএজির কাছে জানতে চায়, হলমার্কের চেয়ারম্যানকে ১১ মামলায় কোন্ আদালত জামিন দিয়েছে? জবাবে ডিএজি বলেন, ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জহুরুল হক। জামিনের ঘটনায় দুটি আদালতের বিচারককেই তলব করা দরকার। কারণ হাইকোর্টের নির্দেশে আসামিদের গ্রেফতার করার পর এক মাসের মধ্যেই নিম্ন আদালত জামিন দিয়েছে। অথচ তাদেরকে গ্রেফতার করতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এ পর্যায়ে আদালত হলমার্কের চেয়ারম্যানের জামিনের বিষয়ে দুদক কৌঁসুলির বক্তব্য জানতে চান। দুদক কৌঁসুলি এডভোকেট খুরশীদ আলম খান বলেন, এজাহারে আসামি জেসমিন ইসলামের নাম আছে। তিনি ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অথচ ঋণ প্রদানের শর্তে তাকে জামিন দিয়েছে আদালত। তখন হাইকোর্ট বলেন, ঋণ প্রদানে সম্মত হওয়ার অর্থ যে সে তার অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে। এজন্য আমরা (বিচারক) হলমার্ক ও পরাগ অপহরণ মামলার বিচারকদের তলব করতে চাচ্ছি। কিন্তু তলব আদেশ দিলে তো তারা আপিল বিভাগে যাবে আদেশ স্থগিত করতে। তখন ইউনূস আলী বলেন, আড়াই হাজার কোটি টাকার মামলা। এই পরিমাণ টাকা দিয়ে একটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যায়। আসামিদেরকে তো ১০০ বছর জেলে রাখা উচিত। হাইকোর্টের উচিত হবে বিচারকদের তলব করা। খুরশীদ আলম খান বলেন, জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ পদটি অনেক বড়। তিনি যদি ম্যাকানিক্যাল কোন আদেশ দেন সেটা পর্যালোচনার অধিকার হাইকোর্টের রয়েছে। হাইকোর্টের উচিত হবে দুজনকে তলব করে এ জামিন বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া। পরে আদালত উভয় বিচারককে তলব করে আদেশ দেন।
গত বছরের ১১ নভেম্বর সকাল সোয়া সাতটার দিকে স্কুলে যাওয়ার পথে কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা পশ্চিমপাড়ার বাড়ির অদূরে গাড়িতে ওঠার সময় ছয় বছরের পরাগকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তার মা, বোন ও গাড়িচালককে গুলি করে তারা। অপহরণের ৬৪ ঘণ্টা পর ১৩ নভেম্বর রাত ১২টার দিকে কেরানীগঞ্জের আটিবাজার এলাকায় অচেতন অবস্থায় পরাগকে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ১১ মামলায় হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামকে জামিন দেন ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জহুরুল হক। জামিন বাতিল চেয়ে করা আবেদনের প্রেক্ষিতে সোমবার হাইকোর্ট রুল জারি করে এবং মামলার নথি তলব করে।
