ঢাকা-খুলনা স্টিমার সার্ভিস বন্ধ রয়েছে দুই বছর

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৫২
কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ও সদিচ্ছার অভাবে খুলনা-ঢাকা রুটে স্টিমার সার্ভিস পুনরায় চালুর উদ্যোগ থমকে আছে। দীর্ঘ দুই বছর এই রুটে ঐতিহ্যবাহী স্টিমার সার্ভিস বন্ধ। রামপাল-ঘোসিয়াখালী চ্যানেলে নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার ‘অজুহাতে’ খুলনা-ঢাকা রুটে স্টিমার চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। পলি অপসারণ বা নদী খননের মাধ্যমে পুনরায় স্টিমার সার্ভিস চালুর চেষ্টাও নেই কর্তৃপক্ষের। এমনকি বিকল্প রুট হিসাবে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে স্টিমার সার্ভিস পুনরায় চালুর জন্য বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃক গঠিত উচ্চপর্যায়ের সমীক্ষা দলের ইতিবাচক মতামত থাকা সত্ত্বেও অজানা কারণে চালু করা হচ্ছে না জনপ্রিয় এই স্টিমার সার্ভিস। স্টিমার সার্ভিস স্থায়ীভাবে বন্ধ হলে বিআইডব্লিটিসি’র প্রায় ২শ’ কোটি টাকার সম্পদ লুটপাট করা সহজ হবে বলেই এটি চালু করা হচ্ছে না—এমন অভিযোগ রয়েছে। স্টিমার সার্ভিস চালুর দাবি জানিয়েছেন খুলনা অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। নৌপথে আরামদায়ক ভ্রমণ, নিরাপদে ও কম খরচে মালামাল বহনসহ যাত্রীদের চলাচলের জন্য ব্রিটিশ আমলে চালু করা হয় খুলনা-ঢাকা স্টিমার সার্ভিস। সে সময় সুন্দরবনের ভিতর দিয়েই চলাচল করতো এই পরিবহন। ধীরে ধীরে স্টিমার সার্ভিস জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মংলা হয়ে রামপাল-ঘোসিয়াখালী চ্যানেল চালু হলে এ পথেই চলাচল করতে শুরু করে স্টিমার ‘গাজী’, ‘অস্ট্রিচ’, ‘মাসুদ’, ‘টার্ন’, ‘লেপচা’ ও ‘কিউই’। তবে একদিকে উন্নত সড়ক যোগাযোগ স্থাপন ও অন্যদিকে নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাসের কারণে একের পর এক বন্ধ হয়ে যায় স্টিমার সার্ভিস। সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৮ এপ্রিল রামপাল-ঘোসিয়াখালী চ্যানেলে নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে খুলনা-ঢাকা স্টিমার সার্ভিসের চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। ২০০২ সাল থেকে খুলনা-ঢাকা রুটে স্টিমার সার্ভিস বন্ধ করতে লোকসানের বোঝা তুলে দেয়া হয় খুলনা বিভাগীয় বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে। প্রথমে মংলা বন্দরের সরকারি বার্জ, ফ্লাট ও কার্গো ব্যক্তি মালিকানায় ভাড়ায় দিয়ে তার আয় যুক্ত করা হয় কেন্দ্রীয় অফিসে। দ্বিতীয়বার খুলনা বিআইডব্লিউটিসি থেকে কেটে নেয়া হয় বড় মাছুয়া, চরখালী ও হুলারহাট স্টেশন। উক্ত তিনটি স্টেশনের আয় দেখানো হয় বরিশাল বিআইডব্লিউটিসি’র খাতে। মংলা-রামপাল-ঘোসিয়াখালী চ্যানেলে পলিমাটি জমে নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় বিআইডব্লিউটিসি ২০১০ সালের ৫ আগস্ট সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে খুলনা-মংলা-ঢাকা স্টিমার সার্ভিস বন্ধ করার ইঙ্গিত দেয়। এরপর অনিয়মিতভাবে ঢাকা-খুলনা রুটে চলাচল করতে থাকে স্টিমার। অনিয়মিতভাবে চলাচলের কারণে স্টিমারের পরিবর্তে এ অঞ্চলের যাত্রীরা চলাচলের মাধ্যম হিসাবে বিকল্প পথ বেছে নেয়। ফলে লোকসানের কবলে পড়ে স্টিমার সার্ভিস। কর্তৃপক্ষ এই লোকসান ও নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে নদী পুনঃখনন বা পলি অপসারণ না করে ২০১১ সালের ১৮ এপ্রিল খুলনা-ঢাকা রুটে স্টিমার সার্ভিস বন্ধ করে দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয় এ অঞ্চলের মানুষ। খুলনাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ৭ নভেম্বর পূর্বের রুট (বড় মাছুয়া-বগি ও জয়মনিরগোল) দিয়ে স্টিমার চলাচলের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে তিন সদস্যের একটি সমীক্ষা টিম গঠন করা হয়। এই সমীক্ষা টিম গত ১২ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে (বড় মাছুয়া-বগি ও জয়মনিরগোল) নৌপথে খুলনা-ঢাকা রুটে স্টিমার সার্ভিস চালু করার পক্ষে মত প্রদান করে। বলা হয়, এই রুট যথেষ্ট প্রশস্ত, গভীর ও নৌ-চলাচলের সহায়ক। সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে স্টিমার সার্ভিস চালু হলে পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে। মালামাল পরিবহনও বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। বিআইডব্লিউটিসি’র খুলনা অঞ্চলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বেদখলের হাত থেকেও রক্ষা করা সম্ভব হবে। তবে এই রুটে ২৮ কিলোমিটার পথ বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত ৪১০ লিটার জ্বালানির প্রয়োজন পড়বে। কিন্তু সমীক্ষা টিম ইতিবাচক মতামত দিলেও এখনো চালু হয়নি স্টিমার সার্ভিস। অভিযোগ, বিআইডব্লিউটিসি’র উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা খুলনা-ঢাকা রুটে স্টিমার সার্ভিস স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই রুটে স্টিমার সার্ভিস চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে এ অঞ্চলের বিআইডব্লিউটিসি’র প্রায় ২শ’ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লুটপাট সহজ হবে। সমপ্রতি নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান ও বিআইডব্লিউটিসি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মংলা-ঘোষিয়াখালী চ্যানেল পরিদর্শন করেছেন। নৌ-পরিবহন মন্ত্রী বলেন, অতিসত্বর নদী খনন করে চ্যানেল চালু করা হবে।