বহুল আলোচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিল-২০১৩ এর ওপর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির রিপোর্ট গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। রিপোর্টে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের আপিল করার সুযোগ রহিত করা হয়েছে। আগামী রবিবার জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হবে। আর বিলটি পাস হলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের যেকোনো রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে রাষ্ট্রপক্ষ। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ, বাদী ও বিবাদীপক্ষ শুধু আপিল করতে পারবে। এছাড়া ৩০ দিনের মধ্যে আপিল এবং ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন আইনটি ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর হবে বলে বলা হয়েছে।
ডেপুটি স্পীকার কর্নেল (অব.) শওকত আলীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরুতেই রিপোর্টটি সংসদে পেশ করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া ।
মূল বিলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিলের যে সুযোগ রাখা হয়েছিল, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তা বাদ দিয়েছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ২১ (২) উপধারায় বলা হয়েছে, সরকার অথবা বাদী-বিবাদী পক্ষ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের খালাস কিংবা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে। এছাড়া কমিটি ২০০৯ সালের যেদিন থেকে আইনটি সংশোধন হয়েছিল, সেদিন থেকে কার্যকর করতে বলেছে। রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুপারিশ করেছে স্থায়ী কমিটি।
সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিলের সুযোগ রহিত করার কারণ সম্পর্কে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু বলেন, রায়ের বিরুদ্ধে যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিলের সুযোগ রাখার যে প্রস্তাব করা হয়েছিলো তা পাস হলে যেকোনো মামলার রায়ের বিরুদ্ধে হাজার হাজার আপিল হতে পারত। এতে পুরো বিচার-প্রক্রিয়া বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ার আশংকা ছিলো। সেজন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মূল বিলে থাকা এ বিধানটি বাতিল করার প্রস্তাব করেছে। এছাড়া ২১ (৫) উপধারা অনুযায়ী আপিল করার সময়ই আপিলকারীকে সমুদয় দলিল, দস্তাবেজ, ডকুমেন্ট সর্বোচ্চ আদালতে দাখিল করার বাধ্যবাধকতা আনা হয়েছে।
এদিকে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এডভোকেট আনিসুল হক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিল করার প্রস্তাব বাদ দেয়াকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। প্রসঙ্গত আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ শুরুতে বলেছিলেন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিলের অধিকার থাকবে। যদিও সংসদে উত্থাপিত আইন মন্ত্রণালয়ের বিলে সরকার, বাদী ও তথ্যদাতাকে আপিলের অধিকার দেয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাব হুবুহু অনুমোদন দিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বিলে পরোক্ষভাবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিলের অধিকার রেখে দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এডভোকেট আনিসুল বলেন, তথ্য দাতাই একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি। এই বিলে “যে কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি” এই শব্দকটি রাখলে প্রচুর পক্ষ দাঁড়িয়ে যেত। এতে আপিল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হতো। তিনি বলেন, এই প্রস্তাবটি বাদ দিয়ে সংসদীয় কমিটি অত্যন্ত সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিয়েছে।
মূল বিলের ২১ (৪) উপধারায় উল্লেখ ছিল, আপিল আবেদন দাখিলের ৪৫ দিনের মধ্যে আপিল বিভাগকে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে প্রয়োজনে আরও ১৫ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, বিলে আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ৪৫ দিন সময়ের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক নয়। সে কারণে উক্ত সময়সীমা বৃদ্ধি করে ৬০ দিনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ যুদ্ধাপরাধী আবদুল কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। ৬টি অভিযোগের মধ্যে একটিতে কাদের মোল্লাকে খালাস দেয়া হয়।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সব নাগরিককে আইনের সমান আশ্রয় লাভের যে অধিকার দেয়া হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ক্ষেত্রে ২১ (১) ধারায় তা প্রতিফলিত হয়নি। সেজন্য ট্রাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে আইনে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কারণে ২১ (২) ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
দণ্ডিত ব্যক্তির আপিলের জন্য ২১ (১) উপধারায় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তি দ্রুত বিচার লাভের অধিকারী। এ কারণে সংশোধনীতে আপিল নিষ্পত্তির মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন প্রণীত হয়। এ আইনের অধীনে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, ২০০৯ প্রথম দফায় সংশোধন করা হয়। ওই সংশোধনীতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিলের সুযোগ ছিল না। বুধবার সংসদে উত্থাপিত আইনের সংশোধনীতে উভয়পক্ষের আপিলের সমান সুযোগ রাখা হয়েছে।
