‘নারী নির্যাতনের ঘটনায় নীরবতা আর না’ শীর্ষক এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে সারাদেশের লাখো লাখো মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং বা উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি’ শিরোনামে নারী নির্যাতনবিরোধী নানা কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচিতে বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ২০ লাখেরও অধিক নারী-পুরুষ সংহতি প্রকাশ করেন। কর্মসূচিতে অংশ নেয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঘরে-বাইরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন।
রাজধানীর ৫৪টি এলাকাসহ সারাদেশের ৬৪টি জেলায় একসঙ্গে মানববন্ধন, র্যালি ও স্বাক্ষরতা অভিযান সম্পন্ন হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এ কর্মসূচির আয়োজন করে। গতকাল দুপুর ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত রাজধানীর মহাখালীর জলখাবার মোড়, গুলশান-১ গোলচক্কর, শুটিং ক্লাব, তেজগাঁওয়ের শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ সরণিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে ব্র্যাকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের জনগণ অংশ নেয়। এসময় বিশিষ্টজনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজ ও ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহম্মদ এ. (রুমী) আলী, গ্রুপ এর সিএফও এস এন কৈরী, সিনিয়র পরিচালক আসিফ সালেহ, বাবর কবির, মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচির পরিচালক ড. ফস্টিনা পেরেরাসহ প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা। এছাড়া সারাদেশে ব্র্যাকের ৪৬০টি অফিসের কর্মী ও ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে।
এদিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কর্মজীবী নারী, কারিতাস, রামরু, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, স্বাস্থ্য সেবাকর্মী সংঘ ও রূপায়ণসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করে। এ সময় বক্তারা বলেন, ঘরে-বাইরে সব জায়গায় নারীরা আক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও নারীরা নিরাপদ নয়। ২০১২ সালের পুলিশ সদর দপ্তরের এক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় মামলা হচ্ছে ৫৪টি, যার মধ্যে ১০টিই ধর্ষণের। এর বাইরেও অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যার খবর জানা যায় না। আর এর কারণ হিসাবে দেশে আইনের শাসনের অভাব, দলীয় রাজনীতির আগ্রাসন, প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ও অনিয়মকে দায়ী করা হয়। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, শতকরা ৬০-৭০ জন নারী তার জীবদ্দশায় অন্তত একবার সহিংসতার শিকার হন।
কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি অপরাধের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত পুলিশ ও ডাক্তারসহ সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তারা আরো বলেন, আমরা নারীর প্রতি সংঘটিত সকল প্রকার সহিংসতাকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে চাই। আমরা মনে করি, যতদিন পর্যন্ত না দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির নিশ্চয়তা বিধান না করা যাবে ততদিন পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে না। দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় এবং প্রয়োজনে আইনের সংশোধন করে হলেও অপরাধীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান নারী নেত্রীরা। এই সহিংসতার মূলে যে মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কৃতি কাজ করে তা পরিবর্তনের জন্য তারা দীর্ঘমেয়াদী কাজ করার আহবান জানান।
নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হবে
জিআইএস (জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম) প্রকল্পের অধীনে ডিজিটাল ম্যাপ তৈরির পাশাপাশি হালনাগাদ গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধন ব্যবস্থার নমুনা (স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম-এসভিআরএস) তথ্য এবং নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কিত ধারাবাহিক তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। জিআইএস ব্যবহার করে কম সময়ে আরো নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্টাটিস্টিকসকে (বিবিএস) উপযোগী করে তুলতে পাঁচ বছর মেয়াদী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ১৬ কোটি টাকার এ প্রকল্প জুন ২০১৭-এর মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ১১ কোটি টাকা প্রদান করবে।
“স্ট্রেংদেনিং দ্যা ক্যাপাসিটি অব বিবিএস ইন পপুলেশন অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক ডাটা কালেকশন ইউজিং জিআইএস” নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে গতকাল এক প্রারম্ভিক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে এসব তথ্য জানানো হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার, বীর উত্তম অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এইচ এন আশিকুর রহমান এমপি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. নজিবুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. সামছুল আলম এবং বিবিএস মহাপরিচালক গোলাম মোস্তফা কামাল উপস্থিত ছিলেন।
