শাহবাগের গণজাগরণে জেগেছে বাংলাদেশ। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে দেশের সর্বস্তরের জনগণ এক কাতারে শামিল হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তরুণরা। ১০ দিন পেরিয়ে আজ ১১তম দিনেও দাবির পক্ষে অবিরাম শ্লোগান তুলছে হাজারো কণ্ঠে। যে কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে দেশের কোটি কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা। আন্দোলনের সূচনা, মানুষের সাড়া, সাফল্য, আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যত্ নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে কথা বলেছেন প্রজন্ম চত্বরের সংগঠকরা, গণজাগরণের সারথিরা। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মাহবুব রনি।
আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায় জানার পর হতভম্ব ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি। প্রতিবাদ জানাতে মাঠে নেমে কর্মসূচি পালনের তাগিদ অনুভব করি। সাথে সাথেই বন্ধু-পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ শুরু করি। ফেসবুকে একটি ইভেন্ট তৈরি করা হলো। সাড়া পড়ে অভূতপূর্ব। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে গণজাগরণ। আমরা আন্দোলনটির সূচনা করেছি মাত্র। এখন এর শক্তি জনতা। জনগণের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের সাহস জোগাচ্ছে। যতদিন মানুষ সমর্থন দিবে ততদিন প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলন চলবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে। শাহবাগের গণজাগরণের অন্যতম সংগঠক, ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার বললেন এ কথা।
কিভাবে শুরু করলেন আন্দোলন, এমন প্রশ্নের জবাবে ইমরান বলেন, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায়ের সংবাদ পাই ১২টার পর পরই। এরপরই প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নেই। ফেইসবুকে ইভেন্ট খুলে ও মোবাইলে ফোন করে বন্ধু-পরিচিতদের শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আসতে বলি। প্রথমে সেখানে একটি সমাবেশ ও মিছিল করার পরিকল্পনা ছিল। পরে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়লে সন্ধ্যায় সড়ক অবরোধ করে শাহবাগে বসে পড়ি। সেই শুরু। প্রথমে আড়াইশ’ মানুষ শাহবাগে বসি। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি মহাসমাবেশে পরিণত হয়।
প্রথমে কি মানুষের এত সাড়া পাবেন বলে আশা করেছিলেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইমরান বলেন, মানুষের এত সাড়া পাবো তা ভাবিনি। বিপুল পরিমাণ জনতার অংশগ্রহণ আমাদের উত্সাহী করে তুলে। এ জনসে াত ধরে রাখাটাই চ্যালেঞ্জ ছিল। কেননা সবাই যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে এখানে সমবেত হয়েছে, কর্মসূচিতে তার প্রতিফলন থাকা জরুরি ছিল। সেই কাজটিও জনতাই করেছে। আমরা সমন্বয় করেছি মাত্র।
আন্দোলন থেকে আপনাদের আকাঙ্ক্ষা কী, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এ দেশের মানুষের রক্তের সাথে মিশে আছে। বিশেষ একটি শ্রেণি এর ব্যতিক্রম। সেই চেতনাকে ধারণ করে রাজপথে প্রতিবাদ জানানো আমাদের একটি বড় প্রাপ্তি। প্রাথমিকভাবে সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি নিশ্চিত হলে আমরা আমাদের আন্দোলনের প্রধানতম সাফল্য বলে মনে করবো। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধী ও জামায়াত-শিবিবের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে বাদী-বিবাদীর আপিলের সমান সুযোগ রাখা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, পঁচাত্তরের পর ছেড়ে দেয়া সকল যুদ্ধাপরাধীকে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করা, জামায়াতের ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বর্জন করা, গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়া জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেয়া হলেই আমাদের আন্দোলনের চূড়ান্ত সফলতা আসবে।
আন্দোলন কতদিন চলবে, এমন প্রশ্নের জবাবে ইমরান এইচ সরকার বলেন, শাহবাগের এ প্রজন্ম চত্বর সত্যিকার অর্থেই গণজাগরণ। যতদিন মানুষ এতে সমর্থন দিবে ততদিনই চলবে। আমরা আন্দোলনের সূচনা করেছি। এর নিয়ন্ত্রণ এখন জনগণের হাতে। তারাই ঠিক করবেন শাহবাগে কতদিন এবং কিভাবে আন্দোলন চলবে। আমরা শুধু সমন্বয় করছি। তবে শাহবাগের অবস্থান কর্মসূচি একসময় থেমে গেলেও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের সংগ্রাম চলবেই।
আন্দোলন কিভাবে সংগঠিত করলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব মাহমুদুল হক মুন্সী বাঁধন বলেন, কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন ফাঁসির শাস্তি দিলে দুপুর সোয়া বারোটার দিকে একটি স্ট্যাটাস দিই ফেইসবুকে। সাড়ে ১২টার দিকে আমি একটি ইভেন্ট খুলি এবং ইমরানকে জানাই। বিকাল তিনটায় আমাদের নেটওয়ার্কের উদ্যোগে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমাবেশ ও মিছিল করার কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করি; কিন্তু মানুষের উপস্থিতি দেখে বিকালে মানববন্ধনও করি। সন্ধ্যায় টিএসসির রাজু ভাস্কর্য থেকে একটি মশাল মিছিল নিয়ে এসে আমাদের সাথে যোগ দেয় জাতীয় স্বার্থে ব্লগার অনলাইন এক্টিভিস্ট। এরপর আমরা শাহবাগে বসে পড়ি। সড়ক অবরোধ করি। তখন হাজার দেড়েক মানুষ ছিল আমাদের সাথে। এরপরের ঘটনা ইতিহাস। সর্বস্তরের জনগণকে সাথে নিয়ে ‘প্রজন্ম চত্বরে গণজাগরণ’ চলছে।
ব্লগে প্রতিবাদ ছেড়ে রাজপথে কেন, প্রশ্নের উত্তরে বাঁধন বললেন, ব্লগে আমরা গত কয়েক বছর ধরেই প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি। এ ইস্যুতে রাজপথে নামার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। তাই রাজপথে। এর আগেও জাতীয় ক্রিকেট দলের পাকিস্তান সফরে যাওয়ার পরিকল্পনাসহ বেশ কিছু ঘটনায় আমরা রাজপথে নেমেছিলাম। আর ৪২ বছরের ঋণ আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে। সেই ঋণমুক্তির জন্যই এ আন্দোলন।
কোন গন্তব্যে গিয়ে রাজপথের আন্দোলন থামবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের ছয়টি সুনির্দিষ্ট দাবি রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি এখনই বাস্তবায়ন করতে হবে। সকল রাজাকারের এখনই ফাঁসির রায় দিতে হবে। বাকিগুলো সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। জামায়াতের প্রতিষ্ঠান বয়কট করতে পারলে তাদের শক্তিও কমবে। এটি যত দ্রুত সম্ভব জনগণকে সাথে নিয়ে বাস্তবায়ন করতে আমরা কাজ করবো। আর রাজপথের বাইরে অনলাইনে আমাদের সংগ্রাম অবিরতভাবে চলবে।
ব্লগার মাহবুব রশিদ বলেন, এ আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য সত্যিকারের অর্থেই গণজাগরণ। তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এটি এগুচ্ছে। সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে।
ব্লগার এস এ অরণ্য বলেন, আন্দোলনে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া প্রমাণ করে আমরা কতটুকু সঠিক। আন্দোলন মানুষকে সাথে নিয়েই চলবে।
