সংবাদপত্র ও মার্কিন নীতি

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২৩:০৫
ইংরেজি দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজারভার’কে তালাবন্ধ করতে পেরে মহাখুশি নুরুল আমিন সরকার। এটা মুসলিম লীগ পার্টির জন্য ছিল জয়। কারণ সামনে প্রাদেশিক নির্বাচন। তাই এ খুশির ঢেউ আরব সাগর ছাপিয়ে করাচির লীগ সমর্থক কাগজগুলোকে স্পর্শ করেছে, বিশেষ করে লীগপন্থি; শাসকপন্থি দৈনিক ‘ডন’ পত্রিকাকে। তারা রাজনৈতিক ইতিহাসের এ সত্য উপলব্ধি করতে পারেনি যে, ‘রাজনৈতিক দমননীতি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।’ কথাটা অবশ্য কিঞ্চিত্ বুঝেছিলেন মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান। তবে কিছুটা পরে। দেশ তৈরি, পরিবেশ তৈরি-শুধু দরকার একটি অগ্নিকণা। সেটাও জুগিয়ে নিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন তার বক্তৃতায়। এখন তাই একুশের কর্মসূচি সফল করার জন্য চলছে নীরব প্রস্তুতি পর্ব। ‘নীরব’ বলছি এ কারণে যে, একুশকে সফল করতে নেপথ্য কাজগুলো যথাযথভাবে শেষ করাটাই ছিল জরুরি। তাই মিছিলটি নিয়ে ততটা মাথা ঘামাচ্ছেন না ছাত্রযুব নেতারা। এখন সব চোখ একুশের দিকে, ঢাকার বাইরে সবার চোখ একুশে ফেব্রুয়ারির ঢাকার দিকে। কেমন হবে সে সমাপন? এ প্রশ্ন সবার মনে। ঢাকার যুবলীগ হয়ে ওঠে এ আয়োজনের অন্যতম প্রধান কারিগর। এদের নেপথ্যে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি। কারিগর ছাত্রলীগসহ বাংলা সমর্থক ছোট-খাট দল বা সংগঠনগুলো। পতাকা দিবস যতটা না ঢাকায় তারচে’ বেশী সফল নারায়ণগঞ্জে এবং অন্যভাবে প্রদেশের একাধিক জেলায়। আসলে পতাকা দিবস নয়, ঐ উদ্যোগ ছিল একুশের জন্য প্রস্তুতি তত্পরতা যাকে বলে জনসংযোগ। এসব আয়োজনে নেপথ্যে থেকেও ঢাকা ও প্রদেশের অন্যত্র যোগাযোগ রেখেছে কমিউনিস্ট পার্টি। তাদের ১১ ফেব্রুয়ারি তারিখের সার্কুলারে আন্দোলনের বিচার ব্যাখ্যা ও পরামর্শ থেকে তা বোঝা যায়। এরাই প্রথম ‘সফল প্রাদেশিক ভাষার সমমর্যাদা দানের’ বিষয়টি তুলে ধরেন গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার শর্ত হিসাবে। সেই সঙ্গে সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জনগণ এবং কৃষক ও শ্রমজীবী শ্রেণীর সঙ্গে এ আন্দোলনকে যুক্ত করা যাতে এর ভিত শক্তিশালী হয় এবং শাসক শ্রেণীর আঘাত প্রতিরোধ করতে পারে। ভাষা আন্দোলনের শেষদিকে এ বিষয়টির গুরুত্ব নেতৃস্থানীয় দু’-একজন উপলব্ধি করলেও তার পরিপূর্ণ ফসল ঘরে তোলা যায়নি। সর্বোপরি তাদের বক্তব্য শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। কারণ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উস্কানি আন্দোলনের ক্ষতি করতে পারে। একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ঘোষিত কর্মসূচির ভিত্তিতে সফল করে তুলতে সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর ভূমিকা ছিল খুবই ইতিবাচক। তাতে ঘটেছিল আবেগ ও যুক্তির সমন্বয়। সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’ ও ‘সৈনিক’ এদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘ইত্তেফাক’ বিশেষ করে এর সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ‘মুসাফির’ কলাম যুক্তিতথ্যে শাণিত বক্তব্য উপস্থাপন করে ভাষার দাবিকে শক্তিশালী করেছে। মুসলিম লীগ সরকারের অনাচার, দুঃশাসন ও দুর্নীতির দিকগুলো বিশেষভাবে ঐ কলামে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কথা বলতে গিয়ে অবজারভারের ঘা পাওয়ার কারণ ছিল তাদের অদূরদর্শী ভুলে ইসলামের তৃতীয় খলিফার উদাহরণ টানা। সরকার কালা- কানুনের সদ্ব্যবহার যেখানে পারে, যেভাবে পারে করেছে। এর বিরুদ্ধে সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ও লিখেছে। লিখেছে সাপ্তাহিক ‘নওবেলাল’ যদিও সিলেট থেকে প্রকাশিত। পাকিস্তান সরকার শুরু থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে কঠিন গাঁটছড়া বেঁধে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শিবিরভুক্ত হয়ে যায়। এ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ততটা প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও পূর্ববঙ্গের প্রগতিশীল জনমত ছিল এর বিরুদ্ধে যেমন ঘরে তেমন বাইরে। অর্থাত্ অভ্যন্তরীণ ও বিশ্বরাজনীতি উভয় দিকে। হয়তো একারণেই ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি পূর্ববঙ্গকে অনেকটাই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছে। ভাষা-আন্দোলনের দাবি-দাওয়া ও অধিকার নিয়ে ইঙ্গ-মার্কিন, বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা কেমন ছিল তা নিয়ে এখনো কারো কারো কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা রয়েছে। ক’দিন আগে সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান এ প্রশ্ন তুলেছিলেন। আমি আমার মতো করে জবাব দিয়েছি। আমার ধারণা, পূর্ববঙ্গে বিশেষত ঢাকায় প্রগতিশীল রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা প্রকাশ বেশ কিছুটা স্পষ্ট হতে থাকার কারণে ঢাকা মার্কিন প্রশাসনের সুনজরে থাকার কথা নয় এবং তা যে ছিল না ১৯৫৩-৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী জয় এবং ফজলুল হক মন্ত্রিসভা গঠনের পর তাদের প্রতিক্রিয়া ও তত্পরতা থেকে বোঝা যায়। হক মন্ত্রিসভা বাতিলের ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেলও যে যুক্ত ছিলেন তাতে তো কোনো রাখ-ঢাক ছিল না। হক সাহেব তাদের পাকাধানে মই দেননি। এমনকি নামি-দামি মার্কিনী সংবাদপত্র ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ ছিল সরাসরি সেই ষড়যন্ত্রে যুক্ত। তাই সাংবাদিক জেমস কালাহানের অসত্যাশ্রয়ী তির্যক রিপোর্ট মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক ও তার মন্ত্রিসভাকে বিদ্ধ করেছিল। পরিণামে মন্ত্রিসভা বাতিল ও পূর্ববঙ্গে কেন্দ্রের শাসন জারি। পূর্ববঙ্গের রাজনীতি নিয়ে ষড়যন্ত্র তাই গোড়া থেকে শুরু। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি তার উপলক্ষ মাত্র। সেই উপলক্ষে ১৯৫২’র ফেব্রুয়ারিতে পৌঁছে প্রগতিশীলদের অগ্রচারীর ভূমিকা ওয়াশিংটনের পছন্দ হওয়ার কথা নয়। যদিও আমরা জানি আওয়ামী মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্র তখন মার্কিনপন্থি—লক্ষণীয়ভাবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খন্দকার মোস্তাক বা আতাউর রহমান খান প্রমুখ। হয়ত তাই একুশের প্রেক্ষাপটে বায়ান্নতে মার্কিনীদের ভূমিকা সরাসরি প্রকাশ্যে বিরোধিতার নয়, নীতিটা বোধহয় ছিল পর্যবেক্ষণের- ওই যে বলে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’। লেখক:ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক