দেশে বিনিয়োগ প্রস্তাবের প্রায় অর্ধেকই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। দেশি এবং বিদেশি মিলে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধন করা হয় তার মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ ভাগ প্রস্তাব আলোর মুখ দেখে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস, বিদ্যুত্সহ অবকাঠামোগত সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নানা মনস্তাত্ত্বিক বাধার কারণে ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ বিনিয়োগ প্রস্তাব শুধু নিবন্ধনেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে বিনিয়োগ বোর্ড এর সাথে একমত নয়। সংস্থাটি মনে করে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কিছু দ্বৈত কর নীতির কারণে অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে উত্সাহ হারিয়ে ফেলেন। বিনিয়োগ বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট ১৯৫৫টি দেশি- বিদেশি প্রকল্প নিবন্ধন হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় প্রকল্পের সংখ্যা ১৭৩৫টি, আর দেশি-বিদেশি যৌথ উদ্যোগের প্রকল্পের সংখ্যা ২২০টি। এর মধ্যে দেশীয় উদ্যোক্তারা ১৭৩৫টি প্রকল্পের অধীনে ৫৩ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন, আর যৌথ উদ্যোগে ২২০টি প্রকল্পের অধীনে ৩৪ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা বলা হয়। বিনিয়োগ বোর্ড নিবন্ধিত প্রকল্পের হিসাব রাখলেও কি পরিমাণ প্রস্তাব বাস্তবে কার্যকর হয়েছে তার হিসাব রাখে না। তবে বোর্ডের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, সাধারণত মোট প্রস্তাবের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় বলে আমরা ধরে নেই।
এদিকে, চলতি অর্থবছরের (২০১২-১৩) প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিনিয়োগ বোর্ডে মোট ৮৪০টি প্রকল্প নিবন্ধন করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের বিপরীতে মোট ৪০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। তবে এ সময়ে বিনিয়োগ নিবন্ধনের হার কিছুটা কমেছে।
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, নিবন্ধন করার পরও তা বাস্তবে কার্যকর না হওয়ার পেছনে মূলত অবকাঠামোই দায়ী। নতুন গ্যাস লাইন এবং বিদ্যুত্ সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেকে বিনিয়োগে উত্সাহিত হন না। বাংলাদেশে বিনিয়োগের বড় খাত বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট জাহাঙ্গীর আলামীন বলেন, বিনিয়োগের প্রধান সমস্যা হচ্ছে অবকাঠামোসহ গ্যাস এবং বিদ্যুত্ খাত। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার। তিনি বলেন, কোন বিনিয়াগকারী ব্যাংক ঋণ নিতে পারলেও গ্যাস এবং বিদ্যুতের অভাবে কারখানা চালু করতে পারেন না। তিনি বলেন, গ্যাস এবং বিদ্যুত্ হচ্ছে শরীরের রক্তের মতো। কারখানা চালাতে হলে গ্যাস-বিদ্যুত্ লাগবে। বিটিএমএ প্রেসিডেন্টের মতে, এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি তৈরি করতে হবে। কারণ এ সমস্যা থেকে উত্তরণে কোন শর্টকাট পথ নেই।
তবে বিনিয়োগ বোর্ডের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বৈত শুল্কনীতির কারণে অনেকে বিনিয়োগ করতে পারছেন না। তৈরি পণ্য (ফিনিশড গুডস), মধ্যবর্তী পণ্য (ইন্টারমিডিয়েটস গুডস) এবং কাঁচামালের শুল্কে কার্যকর তারতম্য না থাকায় অনেকে বিনিয়োগে নিরুত্সাহিত হচ্ছেন। যেমন ‘ক’ নামক পণ্যটির আমদানি শুল্ক যদি ২৫ শতাংশ হয়, তাহলে ওই পণ্য যদি মধ্যবর্তী হিসেবে নিয়ে আসা হয় তার শুল্ক কমার কথা। কিন্তু এনবিআর অনেক ক্ষেত্রে তা না করে শুল্ক একইরকম রেখেছে। এতে করে দেশে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি সুরাহা করার জন্য বিনিয়োগ বোর্ড খুব শিগগির এনবিআরের কাছে প্রস্তাব দেবে। এছাড়া মনস্তাত্ত্বিক কারণে অনেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উত্সাহিত হন না। যেমন পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায় বিনিয়োগ অনেক ব্যয়সম্পন্ন হলেও পর্যটন পরিবেশের কারণে অনেকে সেখানে বিনিয়োগে উত্সাহিত হচ্ছেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যবসা স্থাপন কষ্টসাধ্য হলেও পরিবেশের কারণে অনেকে সেখানে বিনিয়োগ করছেন। বিনিয়োগ বোর্ডের মতে, বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশও দায়ী।
নিবন্ধন পরিস্থিতি:১৯৯১-২০১২
বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাবমতে ১৯৯১-৯২ অর্থবছর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দেশি- বিদেশি মিলিয়ে মোট ৩৪ হাজার ৩৯৬টি প্রকল্প নিবন্ধন হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় প্রকল্পের সংখ্যা ৩১ হাজার ৬০২টি। যার বিপরীতে মোট তিন লাখ সাড়ে ২১ হাজার কোটি টাকা। আর দেশি এবং বিদেশি মিলে যৌথ ২ হাজর ৭৯৪টি প্রকল্পে মোট দুই লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। দেশি- বিদেশি এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মোট ৬২ লাখ তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা।
তবে বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলোর বিপরীতে কি পরিমাণ প্রস্তাব আলোর মুখ দেখে সে হিসাব কেউ রাখে না। এমনকি বিনিয়োগ বোর্ডেও এ হিসাব নেই।
