একাদশ-দ্বদাশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘সুফিয়া কামাল’ রচিত ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং ছাত্রছাত্রীরা প্রবন্ধের মূলভাব অনুধাবন করতে পারে সেভাবেই তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে প্রবন্ধটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন বাংলা বিভাগের শিক্ষক কামাল মুহম্মদ।
কবি সম্পর্কে ধারণা:
বাংলাদেশের বিশিষ্ট মহিলা কবি ও নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত্ বেগম সুফিয়া কামাল। রোকেয়া সাখাওয়াত্ হোসেনের মতো তিনিও নারীদেরকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য কাজ করেছেন। কেননা তখনো বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীদেরকে গৃহবন্দি হয়েই থাকতে হতো। স্কুল কলেজে পড়ার তেমন সুযোগ ছিল না তত্কালীন নারীদের। পরিবারে বাংলা ভাষার অনুপ্রবেশ ছিল এক রকম নিষিদ্ধ। সেই বিরুদ্ধ সময়ে সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো সুযোগ পাননি। পারিবারিক উত্থান পতনের মধ্যে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। এবং তিনি নিজেকে পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত করেছেন। বেগম সুফিয়া কামালের পরিচিতি শুধু এক জন নারী নেত্রি হিসেবেই নয়,আমরা তাকে একজন বাংলার আদর্শ জননীরূপেও ভাস্বর হতে দেখি। তিনি বিভিন্নভাবে নারীদের অধিকার আদায়ের দাবিতে আজন্মই ছিলেন সোচ্চার। আমরা তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কীর্তির মধ্যে দেখি— সাঁজের মায়া, মায়াকাজল, কেয়ার কাটা, ইত্যাদি। এ ছাড়া তিনি গল্প, ভ্রমণ কাহিনি, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধও লিখেছেন।
বেগম সুফিয়া কামাল অনেক পদক ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে—
বাংলা একাডেমী, একুশে পদক ও নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কার।
সুফিয়া কামাল ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই বিশিষ্ট কবি।
তাহারেই পড়ে মনে
সুফিয়া কামাল
‘হে কবি,নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়,
বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?
কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি
দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি?
বাতাবি নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?
দখিনা সমির তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?’
শ্রেণিশিক্ষা: ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাটি বেগম সুফিয়া কামালের উদাত্ত পৃথিবী কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। কবিতাটি প্রথম ছাপা হয় মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। এ কবিতাটিতে কবির ব্যক্তি অনুভূতি ও প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কবি বেদনার্ত। শোকে কাতর। তাই কবির গুনোমুগ্ধ ভক্ত কবিকে প্রশ্ন করছে, ‘হে কবি, নীরব কেন? ফাগুন যে এসেছে ধরায়/বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়? কবির উদাসীনতায় প্রকৃতির রূপ যেন যথার্থ বিকশিত হচ্ছে না। ফাগুনে আমের বনে মুকুল এসেছে, বাতাবী নেবুর ফুল ফোটেছে। আর দখিনা বাতাসে মন ক্রমেই চঞ্চল হচ্ছে, কিন্তু তার পরও কবির কোনো ভাবান্তর নেই। সে নিশ্চুপ, এই বিষয়টি প্রকৃতিকে কষ্ট দিচ্ছে। আর ভক্তের উত্তরে কবি বলছেন, ‘আমারে গাহিতে গান বসন্তরে আনিতে বরিয়া/রহেনি, সে ভুলেনিতো, এসেছে তা ফাগুনে স্মরিয়া;’ প্রকৃতির নিয়ম যেন অমোঘ সত্য। সে কারো জন্য থেমে থাকে না। আপন নিয়মেই চলমান। যে কারণে কবির মনে বিরহ থাকলেও প্রকৃতির সাজ থেমে নেই। ফুলে ফুলে নতুন পাতায় শীতের শেষে বসন্তের আগমনে বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা পল্লবিত হয়ে ওঠেছে। তাই কবিও স্বীকার করে ভক্তের উত্তরে বলছেন, ‘বৃথা কেন? ফাগুন বেলায় ফুল কি ফোটেনি শাখে?’ আমরা কবি সুফিয়া কামালের আর একটি বড় বৈশিষ্ট দেখি এর নাটকীয়তায়, গঠনরীতির দিক থেকে এ কবিতাটি সংলাপধর্মী। আমরা এখানে কবির অন্তর্গত বেদনার সাথে প্রকৃতির বৈচিত্রময় খেয়ালের ইঙ্গিত ফোটে ওঠতে দেখি। যেমন- নিজের জীবনের চিত্র ও মনের ভাবকে বাঙ্ময় করতে গিয়ে শেষ স্তবকে তিনি উচ্চারণ করছেন, ‘ কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী/গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্ত্মের পথে রিক্ত হস্তে!/তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারিনা কোন মতে।’
