ডায়াবেটিস নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত এখন। শরীরকে আক্রমণ করে ধীরে ধীরে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস তরুণদের মধ্যে বেশি, তবে বেশ বিরল। প্রচণ্ড পিপাসা ও বারবার প্রস্রাব উপসর্গ থাকতে পারে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস হলে উপসর্গ নাও থাকতে পারে। এজন্যই রোগীরা চেকআপ করতে দেরী করে ফেলতে পারেন। যার ফলে ইতিমধ্যে হয়ত জটিলতার সূচনা হয়ে গেছে। কারো ডায়াবেটিস আছে কিনা তা জানার সবচেয়ে নিশ্চিত উপায় হলো রক্তের গ্লুকোজ মেপে দেখা। রক্তের গ্লুকোজ মেপে দেখা না হলে ডায়াবেটিস রোগীর আহার ও পানীয় পান ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য রক্তের নিরাপদ গ্লুকোজ সীমা বড় মাপের নয়। এইচবিএ-১সি মান ৭%-এর উপর হলেই বিপদ ছোঁয়ার অবস্থা হয়। আর ৮ ঘন্টা উপবাসের পর ১৩০ মিলিগ্রামের উপর বা ৭০ মিলিগ্রামের নিচে হলে, আর অন্য সময় ১৮০ মিলিগ্রামের উপর হলে অবস্থা বিপদসীমার মধ্যে।
জটিল মনে হতে পারে শুনতে, নিরাপদ সীমা এত সীমিত, সেক্ষেত্রে রক্তের গ্লুকোজমান মনিটর করা এবং ব্যবস্থাপনা করা খুবই প্রয়োজন যদি জটিল সমস্যাগুলো এড়াতে হয়। কেবল প্রতিদিন রক্তের গ্লুকোজ মেপে দেখা নয়, কয়েক ঘন্টা পর পরও তা মেপে দেখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রক্তে গ্লুকোজ মান উঁচুতে
উঠলে শরীরে রাসায়নিক বিক্রিয়া বেচাল হয়ে পড়ে, কখনো তত্ক্ষণাত্ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। আবার রক্তে গ্লুকোজ মান নেমে গেলে কিছুক্ষণের মধ্যে মগজে গ্লুকোজ চলাচল নিঃশেষিত হওয়ার পর্যায়ে চলে যায়। তখন দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়তে হয়। কখনো সংজ্ঞালোপ পায় রোগীর। আজকাল দেখা যাচ্ছে, এরকম ঘন ঘন রক্তের গ্লুকোজ মাপানো ল্যাবরেটরীতে গিয়ে বেশ কঠিন। নিয়মিত তা সম্ভবও নয়। আরো ঘনিষ্ঠ মনিটরিং চাই, বিশেষ করে পথ্য রুটিনে যদি অনিয়ম ঘটে, তাহলে তো এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কিছু গবেষক দেখেছেন, ৭৭% ডায়াবেটিস রোগীর আহারের দু’ঘন্টা পর রক্তে গ্লুকোজ মান ১৬০ মিলিগ্রামের উপরে উঠে যায়। রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ও নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখার জন্য পথ্যবিধি ও ব্যায়ামের পরামর্শ দেন ডাক্তারগণ। কিন্তু সব সময় এই মান মনিটর না করলে যে কোন সময় নিরাপদ সীমা অতিক্রম করা অস্বাভাবিক নয়। আবার গ্লুকোজ মানে পরিবর্তনটি ব্যক্তিবিশেষে হেরফের হতে পারে। আবার উপসর্গ সব সময় দৃশ্যমানও হয় না। অনেক ডায়াবেটিস রোগী অজান্তে বিপদসীমা অতিক্রম করে যান কোন লক্ষণ উপসর্গ ছাড়াই। অথচ বিপজ্জনক সীমায় রক্তের গ্লুকোজ বার বার থেকে গেলে রক্তে বাড়তি গ্লুকোজ জমা হয়ে কালক্রমে রক্তনালীর পথ রোধ করে দেয়,
চোখ, টিস্যু, কিডনি, হূদপিন্ডের প্রভূত ক্ষতিসাধন করে
ফেলতে পারে। অনেক সময় এ
থেকে স্ট্রোক হয়ে যায়, হার্ট এ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়।
আরও জটিল হলে, চোখ অন্ধ হয়ে যায়, রক্ত চলাচল বন্ধ হলে অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন ঘটে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডায়াবেটিস ইউনিটের পরিচালক ডা: হিলারি কিং বলেন, “যেহেতু বেশিরভাগ ডায়াবেটিস রোগী রোগের কারণে মৃত্যুমুখে পতিত না হয়ে বরং রোগের পরিণতির ধারাবাহিকতায় মারা যান সে জন্য এতে মৃত্যুহারের পরিসংখ্যান যে অনুমান পাওয়া যায় তা সঠিক অবস্থার থেকে বেশ নিচে।”
শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্ক ও বৃদ্ধদের জটিলতা হয়ে বেশি, এদের জন্য রক্তের গ্লুকোজ মনিটরিং বেশি প্রয়োজন, যাদের প্রায়ই রক্তের গ্লুকোজ নিচে নেমে যায় এবং যাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস আছে এদের জন্য এটি বেশি প্রযোজ্য। বস্তুত দেখা যাছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে আহারের পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি হলে হূদরোগের একটি বড় ঝুঁকি থাকে। ইনসুলিন নির্ভর নয় এমন ডায়াবিটস অর্থাত্ টাইপ-২ ডায়াবেটিস মহামারী আকারে বিস্তৃত হওয়ার ব্যাপারটি চিকিত্সকদের ভাবিয়ে তুলেছে। এধরণের ডায়াবেটিসের কারণও খুব স্পষ্ট নয়। বংশগতি, জীবনযাপনের ধরন এবং হরমোনের চড়াই উত্রাই-এর পেছনে রয়েছে এমন ধারণা। এ জন্য চিকিত্সকরা বলেন, এ রোগে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য আরো ঘনিষ্ঠ মনিটরিং প্রয়োজন। দিনে অন্তত:একবার রক্তে গ্লুকোজ মান মেপে দেখা ভালো।
ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার জন্য প্রথমে দরকার রক্তের গ্লুকোজ মান মনিটর করা। এজন্য সেলফ্ মনিটরিং বা নিজের গ্লুকোজ নিজেই মেপে দেখা অনেক বেশি উপযোগী এবং সুবিধাজনক। এজন্য যন্ত্রপাতিও রয়েছে এবং যা সহজেই চালাতে পারেন রোগীরা নিজেই। রক্তের গ্লুকোজ মান নিজে নিজে মেপে দেখলে যে নিবিড় মনিটরিং
হয় এতে ব্যক্তিবিশেষে রক্তের
গ্লুকোজ মান কত থাকা উচিত সে লক্ষ্য নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
ইনসুলিন মাত্রা কত দিতে হবে তাও নির্ধারণ করা যায়, কতবার
দিতে হবে তাও বলা যায়, পথ্য ও ব্যায়ামের ব্যাপারেও নির্দেশ দেওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, রোগরি সমস্যা ভেদে এবং সার্বিক
চিকিত্সার প্রেক্ষিতে রক্তের গ্লুকোজের সেলফ মনিটরিং হওয় উচিত দিনে একবার থেকে চারবার। এই ফলাফল দেখে ব্যক্তি বিশেষের চাহিদা ভেদে চিকিত্সার লক্ষ্য ও ব্যবস্থাপনা
সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
