জন্ম থেকেই এদের মূল ছিন্ন। এদের নেই কোনো মজবুত মূল। তাই এরা অবহেলিত সবকিছু থেকে। আদর, ভালোবাসা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এদের কাছে স্বপ্নের মতো। বছর যায় বছর আসে, পরিবর্তন হয় না সমাজের। শিশু অধিকারের কথা জোরেসোরে উচ্চারিত হয় প্রতিবারই, কিন্তু অধিকার পায় না তারা। পেটের দায়ে তাই মাঠে নামতে হয় এই শিশুদের। কখনো কাগজ কুড়িয়ে, কখনো ইট-পাথর ভেঙে দিন কাটে তাদের। নাম তাদের পথশিশু, যারা নিজেদের জীবিকার সন্ধান করে নিজেরাই। একমুঠো খাবারের জন্য এরা প্রায় সবকিছু করতেই প্রস্তুত! এদের আমরা বলি ছিন্নমূল শিশু। আর এই ছিন্নমূলদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে একটি চক্র এদের জড়িয়ে ফেলছে বিভিন্ন সমাজবিরোধী কাজে। পকেট কাটা থেকে চুরি ছিনতাই সবকিছুই করানো হয়ে থাকে এদের দিয়ে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব অপরাধ করে এরা, ধরা পড়লে সাজাও পায়। অথচ অপরাধ করে যা উপায় করে তার থেকে এদের মেলে অতি সামান্য। গত ক’দিন আগে শহীদ খোকন পার্ক এলাকা ও সাতমাথার বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ার এলাকায় ঘুরে ছিন্নমূল শিশুদের কাছ গিয়ে এরূপ তথ্যই পাওয়া গেলো।
যখন তাদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছিল, তখন এদের অনেকের হাতেই ছিল পলিথিনের প্যাকেট। এই পলিথিনের ভেতরে মাঝে মাঝেই নিঃশ্বাস নিয়ে আবার সেই পলিথিনেই শ্বাস ছাড়ছিল। তারা কী করছে জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘আঠা খাচ্ছি! খাইলে ভালো লাগে।’ এই পলিথিনের যে আঠা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে তারা ভেতরে নিচ্ছে সেটা তাদের জীবনের জন্য কতটা ভয়ংকর, জীবনঘাতী এটা না জানলেও তারা জানে এর মাধ্যমে সাময়িক সুখ পাওয়া যায়।
এসব ছিন্নমূল শিশুদের মধ্যে জুঁই একজন। তার বয়স ৯ কি ১০ হবে। রেলস্টেশন বস্তিতে থাকে। সে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। স্কুল শেষ করে এসে জীবিকার তাগিদে নেমে পড়ে কাগজ ও ভাংরি কুড়াতে। সারাদিন কাগজ ও ভাংরি কুড়িয়ে জোটে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। তার সঙ্গে আবর্জনা থেকে বেছে বেছে কাগজ কুড়াচ্ছিল শিশু সৈকত। জুঁই জানালো সৈকত বেশি কাগজ কাগজ কুড়াতে পারে না তাই সে টাকাও বেশি পায় না।
আবদুর রহিম নামে আরেক ছিন্নমূল। সে গত ৫ থেকে ৬ বছর ধরে কাগজ কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা চালাচ্ছে। সে দিনে একশো থেকে দেড়শো টাকা রোজগার করে। আজিজুল জানালো, তার বাড়ি নাটোরের কান্দিভিটা গ্রামে। বাবা অন্যত্র বিয়ে করায় তার সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই। বাড়িতে রয়েছে মা ও ছোট বোন। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। সংসারের অভাবের কারণে প্রাইমারি পড়ার সুযোগ হয়নি। গত কয়েক বছর আগে অভাবের তাড়নায় বগুড়া শহরে আসে সে। সারাদিন অর্ধাহারে অনাহারে ভাংরি ও রাস্তায় কাগজ কুড়িয়ে জোটে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। তার এ জীবন ভালো লাগে না। সে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে চায়।
অন্যান্য শিশু যেভাবে পরিবারের সঙ্গে আনন্দে মেতে থাকে সে সুযোগগুলো পায় না। ওরা বোঝে না আনন্দের আসল অর্থ। তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে আসা পার্কের শিশুদের দেখে। ইচ্ছে করে তাদেরও। কিন্তু ভাগ্য তাদের সঙ্গে নেই। তাই পার্কের শিশুদের দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে পার্কেই। ছিন্নমূল শিশুদের বেশিরভাগই কাগজ, লোহা কুড়িয়ে জীবিকা চালায়। অন্য কোনো কাজ তারা করতে পারে না। হাত বাড়ায় পথচারীদের দিকে। প্রতিদিন রাত ১২টায় বগুড়ার আকবরিয়া হোটেল কর্তৃপক্ষ যে খাবার তাদের জন্য রাখে সেটা দিয়েই তাদের পেট পূর্তি হয়। এছাড়া সারাদিন তারা থাকে ভুখা। তারা সেই ফ্রি খাবারের অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে ঘড়ির কাঁটার দিকে।
এই শিশুদের খোঁজ-খবর নেওয়ার মতো কেউ নেই। অথচ আমরা একটু সহযোগিতার হাত বাড়ালেই এসব ছিন্নমূল শিশুর জীবনও হয়ে উঠতে পারে অনেক সুন্দর। আমরা ইচ্ছে করলেই পারি তাদের লেখাপড়া, চিত্ত বিনোদনসহ তাদের যেসব দরকার সেগুলো নিশ্চিত করতে। আমাদের উচিত সরকারি ও বেসরকারি ভাবে প্রতিটি জেলায় ও থানা পর্যায়েই তাদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা। সেখানে থাকবে তাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিত্সার সুব্যবস্থা। কিন্তু আমরা তো ব্যস্ত আমাদের নিয়েই।
সুকান্তের পৃথিবী এখনও শিশুদের বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি। তারা পায়নি তাদের মৌলিক অধিকার। অথচ এমনটি হবার কথা ছিল না। তবে আমরা ইচ্ছে করলেই পারি এ পৃথিবীকে শিশুদের বাসযোগ্য করতে। যেখানে কোনো শিশুরই থাকবে না ধনী গরিব ভেদাভেদ। প্রতিটি শিশুই পাবে তাদের ন্যায্য মৌলিক অধিকার।
বগুড়া
