যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে চলমান আন্দোলন নিয়ে এবার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে লন্ডনের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। আজ শনিবার সাময়িকীটির ছাপা সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: গণঅসন্তোষ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবির প্রতিবাদ কর্মসূচি শাহবাগের নামেই পরিচিতি পেয়েছে। যদিও কারো মতে এটি ‘নতুন প্রজন্ম চত্বর’। এই প্রতিবাদ কর্মসূচি দেশে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার আভাস দিচ্ছে। এরকম অন্য কোনো প্রতিবাদে অনেক রাজনৈতিক দাবি-দাওয়াও উঠতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতি দুটি দল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং তাদের অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের তিক্ত রাজনৈতিক লড়াই বিদ্যমান, এটা খুব কম মানুষই পছন্দ করে। এই দুই দলের একচ্ছত্র প্রভাবের অবসান হলে শাহবাগের অনেকে হয়তো আনন্দ-উল্লাস করবেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিগত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ সমাবেশ হচ্ছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবদুল কাদের মোল্লার প্রত্যাশিত বিচারের দাবিতে শাহবাগে প্রতিদিন লাখ লাখ বিক্ষোভকারী জড়ো হচ্ছেন। তাদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। মুক্তিযুদ্ধকালে ভয়ঙ্কর অপরাধ করা সত্ত্বেও কাদের মোল্লাকে শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেয়ে কাদের মোল্লা তার সমর্থকদের উদ্দেশে বিজয় চিহ্ন প্রদর্শন করেন। তার এই অঙ্গভঙ্গি জনগণকে বিক্ষুব্ধ করেছে। অনলাইন কর্মীদের বিক্ষোভের ডাকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি এই সমাবেশ শুরু হয়। কাদের মোল্লাসহ বিচার চলা অন্যদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করছেন তারা। হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও যুদ্ধকালীন অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য শেখ হাসিনা সরকার স্থানীয় এই আদালত গঠন করেন। অভিযুক্তদের বেশিরভাগই ইসলামপন্থি বিরোধী দলের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শাহবাগের এই নতুন প্রজন্ম চত্বর থেকে দেশে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই পুরো পরিবার নিয়ে হাজির হয়েছেন। সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং দেরিতে হলেও বিরোধী দল বিএনপি এই প্রতিবাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা কোনো বক্তব্য রাখতে না পারলেও আওয়ামী লীগ এখান থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। সরকার আইনে সংশোধন আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির জন্যও ঘটনাগুলো সমস্যাপূর্ণ। তাদের আরো কিছু হারাতে হতে পারে, বিশেষ করে বড় শরিক জামায়াতে ইসলামকে। কারণ দলটির বেশিরভাগ নেতার বিরুদ্ধে বিচার চলছে। শেষ পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক বিএনপি সমর্থক শাহবাগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের তিক্ত রাজনৈতিক লড়াই বিদ্যমান, তা খুব কম মানুষই পছন্দ করে। এই দুই দলের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটলে শাহবাগের অনেকে হয়তো আনন্দ করবেন।
আইন সংশোধন থেকে বিরত থাকার আহ্বান হিউম্যান রাইটস ওয়াচের: জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন দণ্ড পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার জন্য আইনে সংশোধন আনা থেকে সরকারকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। আইনে পরিবর্তন সুষ্ঠু বিচার লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের বৈধতাকে দুর্বল করবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। একইসঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া শক্তি ও অস্ত্র ব্যবহার থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিরত থাকারও আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
গণজাগরণ নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টেও প্রতিবেদন :এদিকে, গতকাল ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে বাংলাদেশে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ চলছে। এদিকে, বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে জামায়াতে ইসলামী প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সংঘাতের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন এসব সংঘাতের ঘটনায় নিহত হয়েছে। ‘গণবিক্ষোভ বাংলাদেশে ৪০ বছরের ফাটল অনাবৃত করেছে’ শিরোনামের এ প্রতিবেদনে বলা হয়, শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। এ বিক্ষোভ এখনো শান্তিপূর্ণ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়া ইসলামপন্থীরা অনেক মানুষকে হত্যা করে। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়া ১০ জনের মধ্যে ৮ জনই জামায়াতের। তবে জামায়াতপন্থীরা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন দণ্ডের বিরোধিতা করছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনের কথাও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।
