জাগরণ সমাবেশে ঘোষণা

জনতার জয় অনিবার্য

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৩২
জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে রাজপথে নেমে আসা তারুণ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিয়েছে। তরুণরা শুধু নিজেরা রাজপথে নামেনি, তাদের সাথে সম্পৃক্ত করেছে দেশের আপমর জনতাকে। শাহবাগের গণজাগরণ জাগিয়ে দিয়েছে গোটা বাংলাদেশকে। জাগিয়ে দিয়েছে বিশ্বের সকল প্রান্তে থাকা বাংলাদেশি-বাঙালিদের। শাহবাগ মোড়ে টানা ১১ দিন অবিরাম অবস্থান করে সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিসহ ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা। শাহবাগ মোড় এখন যতটা না তার প্রশাসনিক নামে পরিচিত, তার চেয়ে বেশি পরিচিত প্রজন্ম চত্বর কিংবা গণজাগরণ মঞ্চ নামে। প্রতিবাদের যে স্লোগান গত ১১ দিন প্রজন্ম চত্বরে অবিরত চলেছিল, তা আজ দ্বাদশ দিবস থেকে চলবে প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। গতকাল শুক্রবার বিকালে প্রজন্ম চত্বরে জাগরণ সমাবেশে এ ঘোষণা দেন আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহবায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার। গণজাগরণ মঞ্চে তিনি জনতার জয় অনিবার্য বলে ঘোষণা দিয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান। পাঠকের জন্য জাগরণ মঞ্চের ঘোষণা তুলে ধরা হলো- ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংগ্রামী সাথীগণ, নবজাগ্রত বাংলাদেশের বন্ধুগণ, যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধের ন্যায়বিচার দাবিকারি বাংলাদেশের জনগণ-আপনাদের অভিনন্দন জানাই। এই গণজাগরণ মঞ্চ থেকে যে আন্দোলনের শুরু, তা আজ জাতীয় আন্দোলন। একে বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক আন্দোলনে পরিণত করেছেন আপনারাই’ হে তারুণ্য, হে জনতা, হে কৃষক-শ্রমিক মধ্যবিত্ত নারী-পুরুষ। দেশে বা বিদেশে যেখানেই থাকুন না কেন, আজ আপনিই শাহবাগ, আপনিই বাংলাদেশ, আপনিই একাত্তরের প্রজন্ম, আপনিই মুক্তিসংগ্রামী বাংলাদেশ। আপনাদের জানাই সংগ্রামী সালাম। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বড় দুঃখভারাক্রান্ত হূদয় নিয়ে আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছিলাম। মিরপুরের কসাই কাদের মোল্লার বিচারের রায় আমাদের হতাশ ও ক্রুদ্ধ করেছিল। মাসের পর মাস রাজপথে জামায়াত-শিশিরের কর্মীদের সন্ত্রাস-নাশকতা বাংলাদেশকে অস্থির করে তুলেছিল। রায়ের আগের দিন জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কণ্ঠে গৃহযুদ্ধের হুমকি শুনে আমরা বিচলিত হয়েছিলাম। এই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামকে আজো তারা ‘গৃহযুদ্ধ’ আখ্যায়িত করে থাকে। তাদের সেই ‘গৃহযুদ্ধ’ মানে ত্রিশ লাখ মুক্তিকামী মানুুষকে গণহত্যার শিকার করা। তাদের ‘গৃহযুদ্ধ’ মানে আড়াই থেকে চার লাখ নারীকে ধর্ষণ নির্যাতনের শিকার করা। তাদের ‘গৃহযুদ্ধ’ মানে জনপদ জ্বালিয়ে দেয়া, সোনার বাংলার স্বপ্নকে পুড়িয়ে ছারখার করে শ্মশানে পরিণত করা। মুক্তিসংগ্রামী বাংলাদেশ সেদিন অবিচল লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশ না হলে আজকের প্রজন্ম আমরা উঠে দাঁড়াতে পারতাম না, আমাদের মাতা-পিতারা স্বাধীনতার অহংকার নিয়ে জীবনে এগিয়ে যেতে পারতেন না। কিন্তু বারবারই সেই স্বপ্ন আর মুক্তির অহংকার বেহাত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়নি, বরং তারা গদি দখলের নোংরা রাজনীতির আশ্রয়ে সমাজের মুক্তি ও জাগরণের বিরোধিতা করে এসেছে। বিরোধিতা করেছে গণতন্ত্রের, বিরোধিতা করেছে স্বাধীনতার, বিরোধিতা করেছে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের অধিকারের, বিরোধিতা করেছে নারীমুক্তির। হীন স্বার্থে ছড়িয়েছে সামপ্রদায়িকতার বিষ-বাষ্প। তারা বাঙালিসহ সকল জনজাতির অধিকারের বিপক্ষ শক্তি। আমাদের বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে একাত্তরের শহীদের রক্ত ঝরেছে, প্রতিরোধ হয়েছে। এই শহীদের জীবনের দাম, এই প্রতিরোধের ফসল বৃথা যেতে পারে না। ক্ষমা কিংবা ছাড় পেতে পারে না দেশদ্রোহী রাজাকার গণহত্যাকারী, ধর্ষক, লুটেরা নরপশুরা। অথচ তারা ছাড় পেয়েছে, সেই সম্পদ ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রকে দখল করার কাজে। সৃষ্টি করেছে শান্তি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি হুমকি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ট্রাব্যুনালকে দিয়েছে হুমকি, জনগণকে করেছে নাশকতার জিম্মি, ভবিষ্যেক করেছে অনিশ্চিত। আজ আমরা তাদের বিচার চাই, ফাঁসির দণ্ড প্রাপ্য যার তার ফাঁসি চাই। আর তা চাই আইনের পথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথে। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের পথে। আমরা সামাজিক-আদর্শিক-রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা অনুযায়ী জামায়াত-শিবিরসহ যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছি। শাহবাগ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশ। প্রমাণ হয়ে গেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সমগ্র বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আপোসহীন লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। গত শুক্রবারের মহাসমাবেশে কোটি মানুষ এক কণ্ঠে দেশব্যাপী শপথ পাঠ করেছে আপোসহীন সংগ্রামের। আমাদের ডাক দেশ তিন মিনিটের জন্য উঠে দাঁড়িয়ে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। দেশময় আলোকশিখা জ্বালিয়ে জনপথ আমাদের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। এ সংগ্রামের পিছু হটার কোনো জায়গা নেই, ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই, নজরদারির কর্তব্যের কথা ভুলে যাবার কোনো উপায় নেই। লড়াই শুরু হয়েছে, লড়াই চলবে, যতক্ষণ না বিজয় আসে। কাদের মোল্লা বিচারের রায়ে মর্মাহত, হতাশ ও ক্ষুব্ধ মানুষের কাতার থেকে উঠে এসেছে, এই আন্দোলন, নিঃসন্দেহে এটি একটি রাজনৈতিক বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক হলেও তা দলীয় নয়। আমাদের এ আন্দোলন দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে, আমরা প্রতিনিধিত্ব করছি জাতীয় ঐকমত্যের। আমাদের অর্জন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পূর্ণাঙ্গ ন্যায্য বিচার ছাড়া আমরা ঘরে ফিরবো না। আমরা কাঁদতে আসিনি বিয়াল্লিশ বছর পরে আমরা ফাঁসির দাবি জানাতে এসেছি শাহবাগে। আমাদের সর্মথন করুন, আন্দোলন এগিয়ে নিন, বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিন একাত্তরের বার্তা। হে আজকের তরুণ-তরুণী বেলা বয়ে যায়, যুদ্ধে যাওয়ার আজ শ্রেষ্ঠ সময়। এ জাগরণ সমাবেশ থেকে আমরা সাত দফা দাবি জানিয়েছিলাম। আমরা দাবি করেছিলাম যে, যুদ্ধাপরাধী খুনী কাদের মোল্লার ফাঁসি হোক। আইনের ফাঁকফোঁকর বুজিয়ে তার হাতে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি সুবিচার করা হোক। আমরা চেয়েছি সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। আমরা দাবি করেছি, যুদ্ধাপরাধ বিচারের আইনের দুর্বলতা দূর করা হোক। আমরা চেয়েছি যাতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো সরকার যুদ্ধাপরাধীদের সাজা মওকুফ করার সুযোগ না পায়। আমরা চেয়েছি যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষক সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে আসুক, যাতে তারা এগুলো ব্যবহার করে আর অপকর্ম, সন্ত্রাস, দাপট চালিয়ে যেতে না পারে। আমরা তাদের রাজনৈতিক অধিকারের নামে বাংলাদেশ বিরোধী তত্পরতা রুখে দেয়ার উদ্দেশ্যে জামায়াত-শিবির ও রাজনৈতিক ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছি। আমরা বাংলাদেশকে যুদ্ধাপরাধীদের আছরমুক্ত করার সংগ্রামে নেমেছি। আমরা সূচনা করেছি সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নতুন পর্যায়ের এক আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। এই সংগ্রামে আপোস বা পিছটান দেয়ার কোনো সুযোগ কারো নাই। আন্দোলনের ধাপে ধাপে আমরা যেমন গণরায় পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন হচ্ছে। যে জাতীয় ঐক্য এবং সংকল্প গঠিত হয়েছে তাতে আমরা আশাবাদী যে, বাকি দাবিগুলোও অর্জিত হবে। সকল রাজনৈতিক দল এবং বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের প্রতি আমরা উদাত্ত আহ্বান জানাই, আপনারা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক চিরতরে পরিত্যাগ করুন। তাদের প্রতিষ্ঠানকে রয়কট করুন এবং তাদের আদর্শের মুখোশ উন্মোচন করুন। অপরাধ ক্ষমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিন। মনে রাখবেন, অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে উভয় অপরাধী। জনগণ ও এ প্রজন্ম কাউকে ক্ষমা করবে না। আপনারা জানেন, বিগত দশ দিন যাবত্ এক অভূতপূর্ব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাত্ মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে শামিল হয়েছে বাংলাদেশের সকল মানুষ। এ আন্দোলন এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাত্রা। বিশ্বের যেখানেই বাঙালি আছে, সেখানেই আজ এক দাবি— যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি। শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন শক্তিশালী গণজাগরণ আর হয়নি। মাত্র তিন মিনিটের নীরবতায় সংহতি প্রকাশের মাধ্যমে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো সারাবিশ্বের সকল বাঙালি। পৃথিবীতে আর কখনো একটি দাবিতে প্রজ্বলিত হয়নি কোটি মোমবাতি। প্রজন্ম চত্বর থেকে আপনারা দেখিয়েছেন কীভাবে দাবি আদায়ের প্রতি দৃঢ়চেতা হতে হয়। যে ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানে এসেছিলো আমাদের স্বাধীনতা, সেই শ্লোগানকে জনমানুষের মন থেকে মুছে দেবার সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে বীর বাঙালি আজ কণ্ঠে ধারণ করেছে জয়বাংলা। তরুণ প্রজন্ম আজ যুদ্ধাপরাধীদের সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছে। তারা শিখেছে ‘গ-তে গোলাম আযম, তুই রাজাকার তুই রাজাকার’। এভাবেই তছনছ হয়ে যাবে যুদ্ধাপরাধীদের অপকর্ম ঢেকে রাখার সকল অপকৌশল। এ প্রজন্ম আজ সব জেনে গেছে। প্রজন্ম চত্বর থেকে জামায়াত-শিবির প্রতিরোধের যে আগুন জ্বলেছে সে আগুন ছড়িয়ে গেছে সবখানে। যেখানেই জামায়াত-শিবির সহিংসতার অপচেষ্টা করছে, সেখানেই বাংলাদেশের জনগণ তা প্রতিরোধ করছে। প্রতিরোধের এই অগ্নিমশাল অবিরাম জ্বলবে, জ্বলবেই। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের প্রতিষ্ঠান বর্জন শুরু হয়েছে। বর্জনের এই চেষ্টাকে উত্সবে রূপ দিতে হবে। সার্বিকভাবে ষোলো কোটি বাঙালি মিলে বয়কট করতে হবে দেশ বিরোধী জামায়াত-শিবিরের সকল প্রতিষ্ঠান। নবজাগ্রত বাংলাদেশের বন্ধুগণ, এই গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ঘোষিত আপনাদের প্রাণের দাবিকে ছয় দফা আকারে আমরা মহান জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকারের কাছে পেশ করেছিলাম। আমাদের এই আন্দোলন জাতীয় সংসদকে বাধ্য করেছে ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে। মনের যে চাপা কষ্ট থেকে এই প্রজন্ম চত্বরে লাখো কণ্ঠের মিলিত শ্লোগান তুলেছি—‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’; এই সংশোধনের ফলে দাবি আদায়ে আর কোনো আইনি জটিলতা থাকবে না। এ বিজয় আমাদের সকলের। দাবি আদায়ের প্রতি আমাদের অটল অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়েছে। তবে আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগবো না। চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে আরো কঠোর থেকে কঠোরতর মনোবল নিয়ে যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। দৃপ্ত কণ্ঠে তুলতে হবে আগুন ঝরা শ্লোগান। আপনারা জানেন, একই সঙ্গে আইন সংশোধনের ফলে যুদ্ধাপরাধীর বিচার সংক্রান্ত যেকোনো মামলা আপিলে যাবার পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। বিচারপ্রার্থী লাখ লাখ শহীদ পরিবারের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘায়িত হতে দেবো না। আমরা নতুন প্রজন্ম কলঙ্কের প্রাচীন দাগ মুছাতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।