খুনিদের এক গ্রুপ ওঁত্ পেতে ছিল। অন্য গ্রুপ ব্লগার রাজীবের পিছু নিয়ে বাড়ি পর্যন্ত যায়

টার্গেটই ছিল খুন

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৭
স্থপতি ও ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনকে টার্গেট করেই খুন করা হয়েছে। খুনিরা তার কাছে থাকা ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ কিছুই নেয়নি। লাশের পাশেই পড়ে ছিল এসব। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুনিদের একটি গ্রুপ আগে থেকেই ওঁত্ পেতে ছিল। আর অপর একটি গ্রুপ তার পিছু নিয়ে বাড়ির সামনে পর্যন্ত যায়। কিন্তু কেন রাজীবকে হত্যা করা হল সে প্রশ্নের সঠিক কোন উত্তর মিলছে না। পরিবার ও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যারা নতুন যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন তাদের অন্যতম ছিলেন রাজীব। ধর্ম নিয়ে বাংলাদেশে যে রাজনীতি হয় তার বিরুদ্ধে ব্লগে তীর্যক লেখালেখি ছিল তার। ফলে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রথম টার্গেটে পরিণত হন রাজীব। গত চার দিন ধরে জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত সোনার বাংলা ব্লগ থেকে রাজীবকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। ফলে ধর্মান্ধ এই চক্রটিই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে বলে সন্দেহ করছে পরিবার। স্বজনরা বলছেন, ধর্মান্ধরা প্রতিশোধ নিতে আর আন্দোলনকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতেই রাজীবকে হত্যা করেছে। তার সঙ্গে কারো জমিজমা, ব্যবসায়িক, পারিবারিক কোন দ্বন্দ্বই ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শনিবার বিকেলে রাজীবদের মিরপুরের পলাশনগরের বাড়িতে যান। তিনি রাজীবের বাবা-মাসহ স্বজনদের সান্ত্বনা দেন। হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে সঠিক বিচারের আশ্বাসও দেন তিনি। সহানুভূতি জানাতে ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও আসলামুল হক এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা গতকাল মিরপুরে রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে রাজীব হত্যার। তাদের গ্রামের বাড়ি কাপাসিয়াতেও সড়ক অবরোধ করেছে জনতা। শাহবাগের আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে জামায়াত-শিবির পরিচালিত সোনার বাংলা ব্লগ। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনজনকে ডিবি অফিসে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর মধ্যে একজন পলাশবাড়িতে প্রবেশের গেটের নিরাপত্তারক্ষী আলমগীর আর দু’জন রাজীবের ব্লগ সংশ্লিষ্ট বান্ধবী তানজিলা ও রাফি। তাদের আটক বা গ্রেফতার কিছুই বলছেন না তদন্তকারী ডিবি কর্মকর্তারা। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) করবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান। যেভাবে হত্যা করা হয় শুক্রবার ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পল্লবীর পলাশনগরের বাড়ির নিজেদের ৫৬/৩ নম্বর বাড়ি থেকে ব্লগ সংশ্লিষ্ট বান্ধবী তানজিলাকে সঙ্গে নিয়ে বের হন রাজীব। এ সময় তার ছোট ভাই নোবেল ও খালাতো ভাই গালিব বাড়িতেই ছিলেন। তানজিলাকে নিয়ে রাজীব প্রথমে যান মিরপুর ১০ নম্বরে। সেখানে ঘোরাফেরার পর রাত ঠিক পৌনে ৯টায় মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশনে তানজিলাদের বাড়িতে তাকে পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এরপরই রাজীব ফোন করেন ব্লগ সংশ্লিষ্ট আরেক বান্ধবী রাফিকে। ব্লগের কিছু বিষয় নিয়ে রাফির সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন তিনি। রাফি ময়মনসিংহে থাকেন। রাত ৯টার কিছু পর পায়ে হেঁটে নিজেদের বাড়ির সামনে পৌঁছলে তাকে কুপিয়ে হত্যার পর গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। পলাশ বাড়িতে প্রবেশের ২ নম্বর গেটের নিরাপত্তারক্ষী আলমগীর জানিয়েছেন, ‘চাদর দিয়ে মুখ পেঁচানো অবস্থায় রাত ৯টার কিছু পর দুই জন লোক গেট দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। তাদের কাছে প্রশ্ন করলেও কোন উত্তর দেয়নি।’ পল্লবী থানার এসআই কামাল হোসেন জানান, রাজীবকে প্রথমে কোপানো এবং পরে জবাই করা হয়েছে। তার মাথায়, চোয়ালে ও ঘাড়ে কোপানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা দু’টি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। রাজীবের কম্পিউটার ডিভাইসটিও ঘটনাস্থলের পাশেই পড়ে ছিল। পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল লতিফ শেখ জানান, রাত ৯টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। মৃতদেহের গলায় গামছা পেঁচানো ছিল বলে জানান তিনি। রাজীব ব্লগে জামায়াত-শিবিরের স্বরূপ উন্মোচন করে লেখালেখি করতেন। এজন্য তাকে সমপ্রতি একটি ব্লগের পোস্ট থেকে হুমকিও দেয়া হয়। রাজীবের সমমনা ব্লগাররা বলছেন, জামায়াত-শিবিরই রাজীবকে হত্যা করেছে। রাজীব যে স্থানটিতে খুন হন, সেখানে ল্যাম্পপোস্টে বাতি ছিল না। ফলে খুনিদের চিহ্নিত করা যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা। ওই এলাকাটিতে জামায়াত-শিবিরের গোপন আস্তানা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে পল্লবী থানার ওসির দাবি জামায়াত-শিবিরের কোন ঘাঁটি নেই ওই এলাকায়। এলাকাবাসীও বলছেন একই কথা। হত্যাকাণ্ডের ২০ গজ দূরে অবস্থিত ওই এলাকার চা দোকানি কামাল মিয়া ইত্তেফাককে বলেন, রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি দোকান বন্ধ করছিলেন। ওই সময় দু’জন পথচারী এসে তাকে জানায়, একজন মানুষ জখম হয়ে পড়ে আছে। তারা এলাকার কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি তাদের আগে কখনো দেখেননি। রাজীবদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকের বাড়ির দোতলায় দুদকের কনস্টেবল নাজমুল হক পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তাদের বাসার ঠিক নিচে উল্টোদিকে খুন হয়েছেন রাজীব। জানতে চাইলে নাজমুল বলেন, সাড়ে ৯টার দিকে তিনি বাসায় ফিরছিলেন। বাসার সামনেই লোকের জটলা দেখে থামেন তিনি। তখন জানতে পারেন প্রতিবেশী রাজীব খুন হয়েছেন। বাসায় ঢুকে অন্যদের বলার পরই তারা প্রথম হত্যাকাণ্ডের কথা জানতে পারেন। কোন্ ধরনের চিত্কার বা গোঙরানির কোন শব্দ তার পরিবারের সদস্যরা শুনতে পারেনি বলেও জানান তিনি। রাজীবের মেজ মামা খুররম হায়দার ঢাকা মেডিক্যালে সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার রাত ৯টায় তার ভগ্নিপতি হারুন অর রশিদ তাকে ফোনে জানান যে, রাজীবের বাসার সামনে মারামারি হয়েছে। সেখানে গিয়ে রাস্তায় একটি লাশ চিত্ হয়ে পড়ে থাকতে দেখি, মাথায় অসংখ্য কোপের চিহ্ন, চেহারা এতটাই বিকৃত যে চেনা যাচ্ছিল না। খুররম বলেন, ‘চলে যাওয়ার সময় আবার ঘুরে দাঁড়ালাম। রাজীবের খবর জানতে তার মোবাইল ফোনে কল দিলাম। তখন লাশের পকেটে থাকা মোবাইল ফোন বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে লাশের কাছে গেলাম। ডান পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে দেখলাম আমার ভাগ্নে রাজীবের ফোন। লাশটি ভালো করে লক্ষ্য করে বুঝলাম— ‘হ্যাঁ আমার ভাগিনা রাজীবের লাশ’ তিনি বলেন, রাজীবের বাম পকেটে একটি কলা ছিল। আন্দোলনের পর থেকে পলাশনগরের টিনশেড বাসায় ফিরত না সে। শাহবাগেই থাকত। শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে ভাগ্নের সঙ্গে শেষ কথা হয় খুররমের। কী কথা হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, তেমন কথা হয়নি। তবে তাদের আন্দোলন নিয়ে প্রায়ই কথা হত তার সঙ্গে। রাজীব বলত, মামা আমরা একটি আন্দোলন শুরু করে দিয়েছি, এখন তরুণরা এ আন্দোলনকে লক্ষ্যে নিয়ে যাবে। রাজীব প্রায়ই বলতো, মামা আমি ইসলামবিরোধী নই, তবে জামায়াত ইসলামের বিরোধী। রাজীবের মা নার্গিস হায়দার গতকাল নিজ বাড়িতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার ছেলে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়। কারও সঙ্গে তার শত্রুতা নেই। তারপরও কেন এমন নিরপরাধ সন্তানকে হত্যা করা হল। আমি এর বিচার চাই।’ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় মামলা রাজীবের বাবা ডা. নাজিম উদ্দিন হায়দার বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় তিনি বলেছেন, ‘আমি পেশাগত কারণে কাপাসিয়ায় বসবাস করি। পল্লবীর বাড়িতে আমার দুই ছেলে রাজীব ও নোবেল এবং তাদের খালাতো ভাই গালিব থাকে। শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় আমার নিকটআত্মীয় খুররম হায়দার ফোন করে জানায়, আমার বাড়ির সামনে বড় ছেলে রাজীবের লাশ পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছেলেকে ফোন করলে সে জানায়, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বান্ধবী তানজিলাকে সঙ্গে নিয়ে রাজীব চা খাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। পরে রাত সাড়ে ৮টা থেকে পৌনে ৯টার মধ্যে বাড়ির সামনে তার রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। তার বাম চোয়ালে তিনটি মারাত্মক জখম ছিল। পরে দারোয়ান জানিয়েছে, দু’জন মুখশধারী লোক ঘটনার পর পলাশনগর বাড়ির গেট পার হয়ে বাইশটেকের দিকে চলে যায়। খুনিরা একটি ছোরা ও একটি চাকু ফেলে গেছে।’ পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল লতিফ শেখ জানান, পেশায় স্থপতি রাজীব ও তার ভাই পলাশনগরের ওই বাসায় থাকতেন। তার বাবা ও মা থাকেন গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। রাজীবের বাবা মুক্তিযোদ্ধা ডা. নাজিম নিজ বাড়িতে ইত্তেফাকসহ উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে ছিলাম। দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু রাজাকাররা নিশ্চিহ্ন না হওয়ায় আজ আমার ছেলেকে হারাতে হয়েছে। আমি রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ চাই।’ ময়না তদন্তের জন্য রাজীবের লাশ রাতেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। তদন্ত চলছে যেভাবে পল্লবী থানায় দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে রাজীবের ছিল প্রাণান্তকর যুদ্ধ। ব্লগে তিনি ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে ‘অশ্লীল’ ভাষায় লেখালেখি করতেন। তাই জামায়াত-শিবিরের সোনার বাংলা ব্লগ থেকে তাকে কয়েকদিন ধরে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছিল। তদন্তে এই বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কারণ রাজীবকে হত্যা করে মৌলবাদ গোষ্ঠী প্রতিশোধ নিয়েছে। আর শাহবাগের আন্দোলনকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে চেয়েছে। তদন্তকারীরা বলেন, এর বাইরেও আরো দুই তিনটি বিষয়ে খোঁজ করা হচ্ছে। এরমধ্যে তার স্ত্রী আনিকার সঙ্গেও সম্পর্ক খুব বেশি ভালো ছিল এমন তথ্য নেই। দুই পরিবারের মধ্যে একটা মানসিক দূরত্ব ছিল। এছাড়া ব্লগ সংশ্লিষ্ট দুই বন্ধবীর সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক ছিল। তাদের কারণে কেউ কি রাজীবের ওপর ক্ষুব্ধ হল—সে বিষয়টিও দেখা হচ্ছে। এ কারণে তানজিলা ও রাফির কাছ থেকে তথ্য নেয়া হচ্ছে। তারা দুজনই গোয়েন্দা পুলিশের ফোন কলে সাড়া দিয়ে ডিবি অফিসে হাজির হয়েছেন। তবে তদন্তের এ পর্যায়ে কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। নিহতের পারিবারিক সূত্রমতে প্রায় সাড়ে চার বছর আগে রাজীব স্থাপত্য বিভাগের ছাত্রী আনিকা ব্রোজিনকে বিয়ে করে। আনিকার পিতার নাম আবদুর রশীদ। পুরান ঢাকার আনন্দ বেকারির অন্যতম মালিক। আনিকার নামে ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডের পার্কের পাশে একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। সেখানেই থাকতেন স্বামী-স্ত্রী। কিছুদিন হল তাদের মধ্যে মতবিরোধ হওয়ায় রাজীব স্ত্রীকে ওই বাসায় রেখে পল্লবীর বাড়িতে থাকা শুরু করেন। গত মে মাস থেকে তাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ নেই বলে আনিকার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী ও পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল তার এশিয়ান প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষে ওই পলাশনগরে নিজেদের টিনশেড বাড়িতেই থাকতেন রাজীব। এলাকার অনেক মানুষের বাড়ির নকশা বিনা পয়সায় করে দিয়েছেন তিনি। এমনকি কাপাসিয়ায় মুক্তিযুদ্ধ চত্বরে প্রস্তাবিত স্মৃতিস্তম্ভের নকশাটিও তার করা। এরজন্য তিনি কোন পয়সা নেননি। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন রাজীব। পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধও ছিল তার। সাউথ এশিয়ান আর্কিটেক্ট সমিতির একজন নেতাও তিনি। তার বাবা ডা. নাজিম হায়দার ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশের অনেক বাড়ি, সেতুসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নকশা পাশ্চত্য থেকে ধার করা। এগুলো খুবই অপছন্দ ছিল রাজীবের। তার বক্তব্য ছিল এশিয়ার নিজের অনেক ডিজাইন আছে, প্রয়োজনে নতুন ডিজাইন তৈরি করা হবে। তবুও পাশ্চত্য থেকে কিছু নেয়া যাবে না। নিজের এসব চিন্তা-চেতনা থেকেই আশপাশের অনেক বাড়ির নকশা বিনা পয়সায় করে দিয়েছেন রাজীব। পলাশনগরের বাড়িতে প্রবেশের জন্য দুই দিকে দুটি গেট বানানোর কথা। ওই গেট দুটিরও বিনা পয়সায় নকশা তৈরি করে দিয়েছেন রাজীব। পদ্মা সেতু নিয়ে একটা নকশাও বানানো আছে তার ল্যাপটপে। প্রতিবেশীরাও বলছিলেন মিষ্টিভাষী রাজীবের নানা স্মৃতির কথা। সবাইকে নিঃস্বার্থভাবেই উপকার করতেন তিনি। কারো সঙ্গে ছিল না কোন বিরোধ। রাজীবের শরীরে ৮টি আঘাতের চিহ্ন গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়। ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. সোহেল মাহমুদ ময়না তদন্ত শুরু করেন। চিকিত্সক মৃতদেহে ৮টি আঘাতের চিহ্নের আলামত পান। এর মধ্যে ৬টি গুরুতর আঘাত। বাম চোয়ালে ও গলায় মিলে ৪টি, বামবাহুতে একটি ও ডান কানের পিছনে একটি এবং মাথার পিছনে দুইটি আঘাতের চিহ্ন ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক দেখতে পান। এছাড়া বামহাতে কিছু চুল ময়না তদন্তকালে চিকিত্সক দেখতে পান। এ চুল ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য রাজীবের উরু থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক বলেন, ‘৬টি গুরুতর আঘাতের মধ্যে একটিই রাজীবের হত্যার জন্য যথেষ্ট। হত্যার উদ্দেশ্যেই খুনিরা তাকে আঘাত করেছে।’ ময়না তদন্তকালে কাপাসিয়ার সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমি ও রাজীবের মামা বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা খুররম হায়দার নিকটতম আত্মীয়-স্বজনসহ বিপুল সংখ্যক লোক উপস্থিত ছিলেন। মর্গে তার মামা খুররম হায়দারসহ আত্মীয়-স্বজন জানান, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ‘ব্লগার রাজীব দিনরাত কাজ করছিলেন। কয়েক দফা এজন্য তাকে হুমকি দেয়া হয়। জামায়াত-শিবিরই রাজীবকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। তার কোন শত্রু নেই, কারো সাথে বিরোধ নেই, তার পিতা-মাতার সঙ্গে কারো সঙ্গে বিরোধ নেই। সহজ সরল ও মেধাবী স্থপতিকে টার্গেট করে খুনিরা নৃশংসভাবে হত্যা করে বলে তারা দাবি করেন। মর্গে নিহত রাজীবের শ্বশুর-শ্বাশুড়ি এসে লাশ একনজর দেখে চলে যান। স্ত্রী আনিকা তার লাশ দেখতে আসেনি বলে আত্মীয়-স্বজন জানান। ময়না তদন্ত শেষে বিকাল ৫টায় রাজীবের লাশ জানাযার জন্য মর্গ থেকে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। মিরপুরে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ রাজীব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল দুপুরে মিরপুরে সড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে স্কুল শিক্ষার্থী ও জনতা। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী। বেলা ১১টা থেকে একটা পর্যন্ত তারা এ বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভে অংশ নেয় মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট, আবু তালেব স্কুলসহ মিরপুরের বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা রাজীবের হত্যাকারীদের গ্রেফতার, বিচার ও রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে শ্লোগান দেয়। আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মোস্তারি আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা নিজ উদ্যোগে এ বিক্ষোভ-কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এই কর্মসূচির প্রতি আমরা শিক্ষকরাও সমর্থন জানিয়েছি। এর আগে রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে আন্দোলনরত জনতার সঙ্গে আমরা একাত্মতা প্রকাশ করেছিলাম। এই দাবির প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।’ গ্রেফতারের আশ্বাস দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তিনি রাজীবের বাবা-মাকে সান্ত্বনা জানিয়ে বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত যেন হয় সেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গতকাল সকালে মিরপুরের পলাশনগরে স্থপতি রাজীবের বাসায় যান তিনি। সেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকারও ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ সময় বলেন, রাজীব হত্যায় যারা দায়ী তাদের শনাক্ত করে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা হবে। পরে বিকালে প্রধানমন্ত্রী যান রাজীবদের বাড়িতে। সোনার বাংলা ব্লগ নিষিদ্ধ শিবিরের ব্লগ বলে পরিচিত সোনার বাংলা ব্লগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়। শনিবার বিকালে মাইকে এ ঘোষণা দেয়া হয়। সোনার বাংলা ব্লগ নিষিদ্ধ করায় জাগরণ মঞ্চ থেকে সরকারকে ধন্যবাদ জানানো হয়। ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারের মৃত্যুর আগে সোনার বাংলা ব্লগ থেকে তাকে হুমকি দেয়া হয়। গণজাগরণের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করা হয়। এ কারণে জাগরণ মঞ্চ থেকে সোনার বাংলা ব্লগ নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়। দাবির প্রেক্ষিতে সোনার বাংলা ব্লগ নিষিদ্ধ করাকে নিজেদের বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়। লাশ দাফন হবে গাজীপুরে রাজীবের মামা জানান, লাশ রবিবার গাজীপুরে নেয়া হবে। কাপাসিয়া পাইলট স্কুল মাঠে জানাযা শেষে তড়গাঁও ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে তাকে দাফন করা হবে। রাজীবের মা নার্গিস হায়দার উপজেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা। রাজীবের নানা মফিজউদ্দিন মাস্টার ১৯৮৯ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের গাজীপুর জেলার সভাপতি ছিলেন। তবে রাজীবরা দুই ভাই কোনো দলে যুক্ত ছিল না বলে তাদের মামা জানান। এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে পারিবারিক কোনো বিরোধ থাকতে পারে কি না—প্রশ্ন করা হলে খুররম বলেন, কখনো না। শাহবাগের আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য ছিল রাজীব। এ কারণেই জামায়াত-শিবির তাকে হত্যা করেছে।