প্রজন্ম চত্বরে ওরা

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫০
শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের সৃষ্টি করেছেন। লাখো প্রাণে ছড়িয়ে যাওয়া এ প্রতিবাদ আজ ব্যক্তি, দল, ধর্ম, বর্ণ ও সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। এ আন্দোলন আজ দেশের পাশাপাশি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনের সংগঠক, কর্মী এবং অংশগ্রহণকারীরা অধিকাংশই তরুণ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবার নারী। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জাগ্রত থাকা ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ বেশিরভাগ সময়ই নারী কণ্ঠের স্লোগানে মুখরিত থাকে। নারীকণ্ঠের এই স্লোগানগুলো আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করে রেখেছে। স্লোগানের হিসেবেও তারা সর্বস্তরের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শুধুমাত্র স্লোগান দিয়ে নয়, এই আন্দোলনে সংগঠক হিসেবেও নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শ্রম-ঘাম, মেধা-সৃজনশীলতা সর্বোপরি সাহসিকতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলো— লাকী আক্তার, সামিয়া রহমান, লুত্ফুন্নাহার সুমনা, মুক্তা বাড়ৈ, সুস্মিতা রায়, সুপ্তি, আমেনা আক্তার রিনা, তানজিদা তুবা, প্রীতিলতা, প্রগতি বর্মণ রমা, সবিতা সরকার মনি, উম্মে হাবিবা বেনজির। এরা সবাই বামপন্থি ছাত্র সংগঠন এবং প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী লাকী আক্তার। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা লাকী শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের বিভিন্ন আন্দোলনে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে এবার তার স্লোগান ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। লাকী জানান, আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই সংগঠনের অন্য নেতা-কর্মীদের সাথে শাহবাগে অবস্থান নেন তিনি। মাঝে অসুস্থতার জন্য ছোট বিরতি দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই স্লোগানে শাহবাগ চত্বর কাঁপিয়ে দিয়েছেন লাকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সামিয়া রহমান বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। চলমান আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নারী সংগঠকদের একজন তিনি। সামিয়া জানান, বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা আন্দোলন এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তবে শাহবাগের এই আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা অন্যরকম। এর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারদের বিরুদ্ধে চারদিকে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনের আরেকজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর লুত্ফুন্নাহার সুমনা ইডেন কলেজের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ঢাকা মহানগর কমটির সহ-সভাপতি। সুমনা জানান, তিনি প্রথম দিন থেকেই শাহবাগ আন্দোলনে যুক্ত আছেন। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশ সময় তিনি এখানেই থাকেন। সুমনা বলেন, এই আন্দোলনে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাত্পর্যপূর্ণ একটি বিষয়। শাহবাগ চত্বর ১৯৭১-এর বাংলার প্রতিচ্ছবি। তানজিদা তুবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী। চলচ্চিত্র আন্দোলনসহ প্রগতিশীল বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত তিনি। এই আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। মূল মঞ্চের বাইরে বিভিন্ন ছোট ছোট জমায়েত এবং মিছিলে স্লোগানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তুবা জানান, এর আগে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন করেছেন তিনি। এখানে মানুষের সাথে সুর মেলাতে পেরে অন্যরকম লাগছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী উম্মে হাবিবা বেনজীর। বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদক তিনি। আন্দোলনের প্রথম থেকেই শাহবাগে স্লোগানের মাধ্যমে জনতাকে মাতিয়ে রেখেছেন তিনি। বেনজীর বলেন, পরীক্ষা চলছে তবুও যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে রাজপথে নেমেছি। সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মকে একইভাবে জেগে উঠতে হবে। রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা এখন আমাদের প্রধান দাবি। লক্ষণীয় বিষয়, ৯০ দশকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের এক মহিয়সী নারী। তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। কবি সুফিয়া কামালসহ আরো অনেক নারী তাতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, উপমহাদেশে বৃটিশবিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলনেই নারীদের তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও নারীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা কোনো অংশে কম নয়। যদিও এর স্বীকৃতিতে এখনো ঘাটতি আছে। শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ মুক্তিযুদ্ধের সে সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আন্দোলনের কর্মী, সংগঠক এসব নারীরা যেমন যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তারা একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নও দেখেন। যেখানে ধর্ম, বর্ণ, জাতের কোনো ছেদ থাকবে না’ থাকবে না নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্য। তাদের মতে, এটাই হলো সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সে চেতনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের আপামর নারী সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এই প্রজন্মের নারী আন্দোলন কর্মীরা।