সমাবর্তন বক্তৃতা

স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি মানুষেরই চেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রম করা উচিত

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫১
সমাবর্তন বক্তৃতা দিতে এসে আমি রোমাঞ্চিত। আজ তোমরা যারা গ্রাজুয়েশন শেষ করছো তাদের মনের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া আমার জন্য কঠিন। কারণ আমার কাজ হলো ডকুমেন্টারি তৈরি করা। যখন আমি কোনো ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি করি তখন প্রশ্ন করি এবং এই প্রশ্নের মাধ্যমে আসল ঘটনা বের করে আনার চেষ্টা করি। মনে হতে পারে এই গল্পগুলো একটির থেকে আরেকটি অনেক আলাদা। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই গল্পগুলোর একটি চিরন্তন রূপ আছে। এখন আমি তোমাদের নিজেদের ইচ্ছা এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভাবতে বলবো। ভাবতে বলবো তোমরা নিজেদের জীবনে কী গল্প লিখবে এবং কীভাবে সাজাবে তোমাদের জীবন তা নিয়ে! এই কলেজে কিছুদিন আগে যে আর্ট সেন্টারটি চালু হয়েছে সেটা আমি দেখেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। এটা অসাধারণ। আমি আশা করবো তোমরা শিল্পকলার সাথে থাকবে। তোমরা কর্মজীবনে যা-ই করো না কেনো আমার আশা থাকবে তোমাদের জীবনের ঘটনাগুলোকে শিল্পকলা প্রস্ফূটিত করবে, তোমাদের জীবন দর্শনকে আরো সম্বৃদ্ধ করবে। শিল্পকলা বলতে আমি কী বুঝি! আমার কাছে শিল্পকলা চিরন্তন একটি বিষয়। এমনকী এটা হতে পারে যখন কোনো গানকে আমরা ফিল্মে ব্যবহার করি কিংবা যখন তোমরা কোনো বিষয় নিয়ে লেখ এবং সেটা হতে পারে কোনো নারী বা পুরুষের দ্বারা। মহান ব্যক্তিদের কর্ম এক্ষেত্রে তোমাদেরকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। সাম্প্রতিক সময়ে আমি একজন ডাক্তারের উপর একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি করেছি যিনি মানুষের জন্য কাজ করেছেন এবং এর পুরস্কারও পেয়েছেন। এই পুরস্কারের অর্থ মূল্যও অনেক। তার কাজের অনুপ্রেরণা এসেছিল টিমটিম করে জ্বলা আকাশের তারা থেকে। তিনি প্রত্যন্ত গ্রামে কাজ করেছেন এবং সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিউইয়র্কে পাঠিয়েছেন। এভাবেই কাজ করে গেছেন। ওই ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন, ভালো কোনো কিছুর ফল পাওয়ার আগের মুহূর্ত অনেক রোমাঞ্চকর এবং দিশেহারা হওয়ার মতো। আর যতোক্ষণ না এমন রোমাঞ্চকর এবং দিশেহারা অবস্থা না হবে ততোক্ষণ বুঝতে হবে অল্প অল্প করে উন্নতি করা। প্রতিনিয়ত আমরা কাজ করছি কিন্তু আমাদের নতুন চিন্তা ভাবনাগুলো নিয়ে কাজ করতে বা আগাতে সাহস করি না! কারণ ব্যর্থ হওয়ার ভয় প্রবলভাবে কাজ করে আমাদের মনের মধ্যে। ডকুমেন্টারী ফিল্ম তৈরি করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে শিল্পকর্ম হলো আবশ্যিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে চলা। আমি নিজে অনেকবার ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছি। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমি প্রথম যে ডকুমেন্টারিটা বানিয়েছিলাম সেটা ছিল একজন বারো বছরের কিশোরকে নিয়ে, যে বক্সিং করতো এবং অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে আগাতে হয়েছিল তাকে। উইলিয়াম রক্সার আজ একজন স্বনামধন্য ফটোগ্রাফার। তার একটি ক্যামেরা ছিল আর আমাদের একটি গাড়ি ছিল। তাই নিয়ে আমরা সেই কিশোরের সব বক্সিং প্রতিযোগিতা দেখতাম এবং আমাদের ক্যামেরায় ধারণ করতাম। কিন্তু সমস্যা ছিল সে ওই সময় সবগুলো প্রতিযোগিতাতেই হারতো। যখন তার বয়স ১৫ হয়ে যায় তখন পর্যন্ত সে কোনো প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। আমাদের ওই ডকুমেন্টারিটা আর বানানো হয়নি। কিন্তু এখান থেকে যে শিক্ষা আমরা পেয়েছি যে সে চেষ্টা করে গেছে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি মানুষেরই চেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রম করা উচিত। আমি যখন ডার্টমাউটে পড়াশুনা করেছি তখন এখনকার মতো এতো সুযোগ সুবিধা ছিল না। কিন্তু আমাদের শিক্ষকমন্ডলী অনেক সাহায্য করেছেন আমাদেরকে। আমার মনে আছে রাতে খাওয়ার পর তাদের সাথে আর্ট নিয়ে কথা বলতাম আমরা। আমি ফিল্মের নানা দিক নিয়ে কথা বলতাম এবং তাদের থেকে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা পেতাম। আমার জীবনের মোড় ঘোরানো যে ডকুমেন্টারিটা বানিয়েছিলাম তা আমার প্রথম জীবনে বানানো এবং নর্থ ক্যারোলিনা থেকে আমার এক বন্ধুর ফোন পেয়ে। আঠারো বছরের এক কিশোরকে ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয়েছিল। আমার বন্ধুর কথা শুনে যখন আমার দলের সদস্য এবং শিক্ষকদেরকে বললাম তারা আমাকে উত্সাহিত করেছিল এবং আমরা দেরী না করে নর্থ ক্যারোলিনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম। সেটা ছিল আমাদের জন্য একটি যুদ্ধের মতো। দীর্ঘদিন ধরে আমাদেরকে সেই যুদ্ধ চালাতে হয়েছিল। প্রকৃৃত অপরাধী দোষ স্বীকার করেছিল অনেক পরে। ততোদিন আমরা এটা নিয়ে কাজ করেছি। ওই সময় ফিল্মের জন্য আমাদের হাতে অর্থ ছিল না, এছাড়া হাজারো অসুবিধার মধ্য দিয়ে আগাতে হয়েছিল। কিন্তু সেই কিশোরের মুক্তি ছিল আমাদের জন্য আনন্দের। সেই ফিল্ম অনেক পুরস্কার পায়। আমরা সেই সময় তোমাদের মতোই তরুণ ছিলাম। অনভিজ্ঞ ছিলাম। কিন্তু আমাদের বাসনা ছিল ওই কিশোরের উপর অবিচার হতে দেব না। আমরা সেটা পেরেছিলাম। তাই আমার কাছে মনে হয় শিল্পকর্ম নিয়ে কাজ করতে হলে অনেক বিপদ, ঝুঁকি, প্রতিকূলতা আসবে। কিন্তু সব বাধাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে যেতে হবে। বিখ্যাত প্রযোজক, পরিচালক এবং লেখক মেল ব্রুকস বলেছিলেন, আমি দার্শনিক হতে চাই না কিন্তু তুমি যদি জীবিত থাকো বা থাকতে চাও তাহলে তোমাকে কাজ করতে হবে। কারণ জীবন মৃত্যুর ঠিক বিপরীত। জীবনকে সুন্দর করতে চাইলে নিজের সুন্দর স্বপ্ন এবং ভাবনাগুলোকে অবলম্বন করে কাজ করতে হবে। এই দর্শনটা আমি মেনে চলি। তাই আমি তোমাদেরকে বলবো নিজেদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়ন করতে কষ্ট হলেও পিছিয়ে এসো না বরং এগিয়ে চলো সেগুলোকে সামনে রেখেই। এজন্য তোমাদের পথ অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। বন্ধুর পথ অতিক্রম করেই সফলতাকে ছিনিয়ে আনতে হয়। আমি তোমাদেরকে বলবো পিছিয়ে না এসে জয় করো কঠিনকে। এখন সিদ্ধান্ত তোমাদের, কীভাবে নিজেদের গল্পকে সাজাতে চাও, কীভাবে জীবনকে যাপন করতে চাও। — সংক্ষেপে অনূদিত