‘শহীদ জননীর সে ডাক শুনতে কী পাও!’

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:০৩
শহীদ জননী ডাকছেন। শুনতে পাচ্ছেন সে ডাক! ওই যে, শাহবাগ আন্দোলনের গণজাগরণ মঞ্চের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছেন তিনি! সৌম্য চেহারা। কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয় সে মুখে। বলছেন, আমার ছেলে রুমী গিয়েছিল মুক্তি-যুদ্ধে। ফেরেনি। তোমরাও এসেছো নতুন মুক্তিযুদ্ধে। দাবি আদায় না করে ফিরে যেও না। সত্যের জয় অনিবার্য। তরুণ প্রজন্মের শাহবাগ আন্দোলনে কোন নেতা নেই, ওদের সে রাজত্বে সবাই রাজা। এতগুলো রাজনৈতিক দলের ছাত্র নেতা কাজ করছেন, ব্লগাররা যারা স্বাধীন মতামত প্রকাশে সবসময় একে আরেকজনের সঙ্গে বিতর্ক করেন—প্রত্যেকেই এক মঞ্চে, এক দাবিতে লড়াই করছেন। তাহলে কে পথ দেখাচ্ছেন ওদের! সবাই বলছেন, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ফেসবুকে একজন পোস্ট দিয়েছেন, ‘তুমি শুধু শহীদ জননী নও, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেরও জননী হও’। ফেসবুকেই একজনের প্রশ্ন, এই আন্দোলনের নেতা কে? কে এই অসাধারণ আন্দোলনের ডাক দিল? কে মূল ভূমিকা পালন করেছে? অন্য বন্ধু উত্তর দিলেন, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, আমাদের আম্মা। আমরা সবাই তার সন্তান এবং এই আন্দোলনের কর্মী।’ আরেকজন লিখেছেন, শহীদ জননী আমাদের ডাকছেন। তার সে আহবান তোমরা শুনতে পাচ্ছ? মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। কিন্তু ১৯৭৫-এর পর সেই বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি আবারো সারাদেশে ব্যাপকতা লাভ করে। সে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আলোর মুখ দেখেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ বিচার নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা ছিল। কিন্তু সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাচ্চু রাজাকারের বিচারের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই বিচার কার্যক্রম একটি পরিণতি লাভ করেছে বলে মনে করছিলেন যখন দেশের মানুষ, তখনই কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় ঘোষণায় ফুঁসে ওঠে বাংলার তরুণরা। তারা মনে করতে থাকেন, আইনের ফাঁক গলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চাইছে কোন পক্ষ। প্রতিবাদ ওঠে। জন্ম নেয় শাহবাগ আন্দোলনের। সেই আন্দোলন আজ ১৪তম দিনে পদার্পণ করেছে। তরুণদের প্রতিবাদের মুখে জাতীয় সংসদে আইন সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। সামনে আরো অনেক পথ পেরোতে হবে। সেই আন্দোলনের প্রেরণা শহীদ জননী। ইতিমধ্যেই গঠিত হয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্কোয়াড। তরুণরা জাহানারা ইমামকে কেন্দ্রে রেখে আন্দোলন করে চলেছেন। ১৯৯২ সালে গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে আন্দোলন তা বিস্মৃত প্রায় তরুণ প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের হারানো চেতনাকে ফিরিয়ে এনেছিল। আজ যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, সেদিনের আন্দোলন এই বিচারের ক্ষেত্র তৈরি করে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম নতুন করে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিস্মৃত নতুন প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায়। মুক্তিযুদ্ধে জাহানারা ইমামের বড় ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শফি ইমাম রুমী শহীদ হন। একাত্তরে এই শহীদ জননীর লেখা দিনপঞ্জি নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘একাত্তরে দিনলিপি’ গ্রন্থটি। মুক্তিযুদ্ধে একজন মায়ের সাহসী অবস্থান ও দলিল গ্রন্থ হিসাবে মানুষের কাছে সমাদৃত হয় গ্রন্থটি। এছাড়া যুদ্ধের সময় তার স্বামী শরীফ ইমামও ইন্তেকাল করেন। আশির দশকের শুরুতে, ১৯৮২ সালে তিনি মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। প্রতিবছর একবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে চিকিত্সা নিতে হতো তাকে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রুমীর মা সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠেন। ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। একজন পাকিস্তানি নাগরিক এবং যুদ্ধাপরাধী এই গোলাম আযমের তত্কালীন বিএনপি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পুনর্বাসনে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো দেশ। বিক্ষোভের অংশ হিসাবে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালতে’র মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক প্রতীকী বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন ‘বিচারকের’ সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। ২৬ মার্চ ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এই ঘৃণ্য আটজন যুদ্ধাপরাধী হচ্ছে-আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মো. কামারুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী, মাওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ এবং আবদুল কাদের মোল্লা। ২৬ জুন ১৯৯৪ সন্ধ্যায় মিশিগানের ডেট্রয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর তিন দিন আগে তত্কালীন বিএনপি সরকার গোলাম আযমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে।