পোশাকে বর্ণমালা

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:০৬
একুশ বাঙালির অহংকার। একুশের চেতনা নিয়ে ১৯৫২ সাল থেকে রচিত হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাস। এই একুশের প্রতি ভালোবাসা আর বিশ্বাস জমিয়ে রাখা আবেগগুলোই বাঙালি উজাড় করে দেবেন শহীদ বেদীতে, রাজপথে। একুশের চেতনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এমনই কিছু মানবিক ও রুচিশীল উপস্থাপনের প্রয়াস নিয়েই আমাদের এবারের মূল ফিচার। লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, ফ্যাশন তথা শিল্পের প্রতিটি শাখায় রয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রবল প্রভাব। যে প্রভাবের স্পর্শে আলোকিত হয়ে উঠেছে বাংলা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকসহ নানা অঙ্গন। সর্বোপরি প্রতিবছর বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মাসব্যাপী বইমেলা। যে বইমেলা আজ বাঙালির প্রাণের মেলারূপে প্রতিটি বাঙালির মনে জায়গা করে নিয়েছে। পাশাপাশি একুশের চেতনাকে ধারণ করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও চলে নানা আয়োজন। একুশের চেতনার ধারা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির বুকে যে সুপ্রবাহের সৃষ্টি করেছে সাম্প্রতিককালে একুশের চেতনার ছোঁয়া লেগেছে দেশের ফ্যাশন ট্রেন্ডেও। বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে পোশাক একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যে অনুষঙ্গের গহীনে এখন চলছে দেশীয় মোটিফে করা আধুনিকবোধের প্রকাশ। বিভিন্ন উত্সবের পাশাপাশি নগরবাসীরা একুশের চেতনাউত্কীর্ণ পোশাকের প্রতিও তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদানের মধ্যদিয়ে শহীদ দিবসের মর্মগাঁথাকে প্রতিবছরের ফেব্রুয়ারিতে শরীরে জড়িয়ে নেন গভীর ভালোবাসায়। দেশীয় ফেব্রিকে তৈরি একুশের পোশাক আউটলেট থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হয় ফেব্রুয়ারির গোড়া থেকে। ঢাকার প্রায় শতাধিক খ্যাতনামা ফ্যাশন হাউস নাগরিক জীবনের পরম এই অনুষঙ্গকে অত্যন্ত নান্দনিকরূপে উপস্থাপনের লক্ষ্যে গ্রহণ করে বিপুল আয়োজন। এই আয়োজনে থাকে পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, শাড়ি, থ্রিপিস, টি-শার্ট, পট, শোপিস, টিপট, মগসহ নানাদ্রব্য। সাদা এবং কালো রঙের সমন্বয়ে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য দ্রব্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও থাকে ক্রেতাদের একটি বিয়োগাত্মক দিনের স্মরণগাথা। তাই বিয়োগ-ব্যথার বেদনার্ত রঙ কালোই মূলত সবক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। পোশাকে ও অন্যান্য দ্রব্যে বর্ণমালা, শহীদ মিনার, একুশের পঙক্তিমালা, শহীদদের প্রতিকৃতিও থাকে বিভিন্ন দ্রব্যের অবয়বজুড়ে। এ ছাড়া থাকে বাঙালির চেতনাবাহী বিবিধ বিষয়; যা আমাদের শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে। ভাষার প্রতি বাঙালির যে টান যে মমত্ববোধ। এই টান ও মমত্ববোধ যেমন উত্কীর্ণ হয় লেখায়, রেখায় এবং দৈনন্দিন জীবন যাপনে তেমনি ফ্যাশনের ভুবনেও একুশের মর্মার্থকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস থাকে প্রতিবছর, প্রতিনিয়ত গহীন ভালোবাসায়। ভাষার মাস যখন বছর ঘুরে আবেগতাড়িত বাঙালির প্রাঙ্গণে এসে ছায়া ফেলে। ঠিক তার সঙ্গে এসে পাশে দাঁড়ায় ঋতুরাজ বসন্ত। একদিকে শোকার্ত অতীতের শোকগাথার গল্পবুননের গুণগুলো বুকের স্পন্দনে তিরতির করে কাঁপতে থাকে। একইভাবে রঙিন বসন্তের ফাগুন হাওয়ার দোলায়ও দুলে ওঠে বাঙালির হূদয়। অনুভূতিতে জেগে ওঠে এক অন্যরকম আবেশ। একদিকে একুশের আবেগমথিত প্রহরের করুণ সুরেলা আবহ ‘রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির’ প্রাণাবেগকে করে তোলে বিধৃত আর বেদনাপ্লুত। তেমনি হলুদ বসন্তের ঝিরিঝিরি সমীরণের উজ্জ্বল নিসর্গের ছবিটাও বাংলার পথে-প্রান্তরে শিল্পীর আঁকা চিত্রের মতো উদ্ভাসিত হয় গহন বাস্তবতায়। বাঙালি যখন একুশের সিক্ত আবেগ পোশাকে ধারণ করার প্রস্তুতিপর্ব সম্পন্ন করে। ঠিক তার পরই উঠোনে, সিঁড়ি, বারান্দায় বসন্তের চিরায়ত বর্ণময় আমেজের কম্পন নবীন আর নিপুণ আনন্দে ড্রেসের পল-অনুপলে এক উত্সবী আর উদ্বেলিত আবহে উত্সারিত হয়। অর্ধশতাব্দীকাল ধরে বাঙালি ভাষা আন্দোলনের গর্বিত স্মৃতিকে আত্মার গহীনে সারাবছর জমিয়ে রেখে একুশে ফেব্রুয়ারির কুয়াশাডোবা ভোরে শিশিরজ্বলা ঘাসের ওপর মৃদু আর সন্তর্পণের ছোঁয়াজাগা চরণ রেখে দলবেঁধে হেঁটে যায় শহীদ মিনারের বেদিতে তাজা ফুল রেখে শহীদদের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানাতে। এই বাস্তবতার নিরিখে সেই একুশের চেতনা গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে পোশাকের বুকেও। যা আজকের প্রজন্ম অত্যন্ত গর্বিত মনে গ্রহণ করে নিয়েছে অসীম আন্তরিকতা দিয়ে। একুশের বোধ-ভাবনা ও পোশাকের নান্দনিকতাকে তরুণ প্রজন্ম যেমন হূদয় দিয়ে গ্রহণ করেছে তেমনি গ্রহণ করেছে প্রতিটি বাঙালি নারী ও পুরুষ। ফ্যাশন ভুবনে শৈল্পিক যে ভিত রচিত হয়েছে তার ঢেউ কিন্তু লেগেছে জেলা শহরগুলোতেও। ফ্যাশনের ধারায় সিক্ত আজ মফস্বল শহরের সব বয়সের ফ্যাশনসচেতন বাঙালি নারী এবং পুরুষও। আর এটা বাঙালি সংস্কৃতির এক বিরাট সফলতার বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। একুশকে ঘিরেও এমনই এক আবেগময় স্ফুরণ শহর, নগর, বন্দর থেকে গ্রামগঞ্জ অবধি পোশাকে পোশাকে ছড়িয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিত রচিত হয়েছে। যার সোপানে দাঁড়িয়ে আজ সমগ্র বাঙালি জাতি। একুশ এবং বসন্ত। হাত ধরাধরি করে এরা কবিতার দুটো কোমল পঙিক্তর মতো এসে প্রকৃতির নিবিড় অঙ্গনে বসে। একজনের অঙ্গ ছেয়ে যায় সাদা আর কালো বর্ণমালায়। আর একজনের শরীর ধারণ করে বাংলার চিরকালীন নৈসর্গিক সৌরভফোটা রঙিন বর্ণের উজ্জ্বলতায়। তবে বরাবরই ভিন্ন মাত্রা নিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি এসে দাঁড়ায় বাঙালির সম্মুখে। কী আবেগে, কী কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে, চিত্রকলায় কী মনজুড়ানো ফ্যাশনের ছন্দময় স্পন্দনে। কিন্তু অন্যান্য উত্সবের মতো নয় একুশের ফ্যাশন। একুশের ফ্যাশটা যত না উজ্জ্বল তার চেয়েও বেশি হূদয়জ। দেশাত্ববোধ, আর্তি আর অমোঘ বাঙালিয়ানার বর্ষণে সিক্ত হওয়ার প্রতিচ্ছবিটাই যেন গভীর আবেগ নিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির ফ্যাশন চিত্রটা ফুটে ওঠে নিবিড় ব্যঞ্জনার-সহমর্মিতার ধারায়থ কেননা একুশ বাঙালির অনন্তকালীন এক অহঙ্কার। যে অহঙ্কার অঙ্গে জড়িয়ে নিতে চাই পছন্দের পোশাক বা শাড়ি, যা আপনি সংগ্রহ করতে পারবেন বিভিন্ন শপিংমলের আউটলেট থেকে। সুতি, সিল্ক, এন্ডি, কটন, খাদির পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শার্ট, টি-শার্ট, থ্রিপিস এবং সুতি, সিল্কের শাড়ি পাওয়া যাবে বিভিন্ন দামে। বর্তমানের বয়ানে একুশের চেতনা ফুটিয়ে তুলার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে নানা গল্পের পটভূমি হয়ে থাকা টি-শার্ট। টি-শার্টের ছোট্ট এক চিলতে জমিনে যে কত আবেগ আর অনুভূতি এক হয়ে মিশে যেতে পারে তা যেন সময়ের প্রতিটি পরতে পরতে একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে আমাদের সামনে। আর তাই একুশের চেতনাকে ধারণ করে থাকা টি-শার্টগুলোতে যেমন দেখা মেলে চিরাচরিত বর্ণমালার সুনিপুণ কোনো বিন্যাস, তেমনি এই সীমিত ক্যানভাসেই অপরিসীম আবেদন নিয়ে উঠে আসে দেশের প্রতি ভালোবাসার নানা গল্প। কখনও তা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে এই ভাষারই অলংকার হয়ে ওঠা কবিতায়। আবার কখনও একুশ যেন নতুন রূপ পায় টি-শার্টের জমিনে ফুটে ওঠা বাংলার বিভিন্ন ঐতিহ্যের খণ্ডচিত্রে। তা ছাড়া সাদা-কালোর বাইরে যারা একুশের পোশাকে সন্ধান করেন ভিন্নতা আর গভীরতার তাদের জন্যও নানা ছন্দে আর নানা রঙে একুশের চেতনাকে উঠিয়ে আনে এইসব একুশের টি-শার্ট। অন্যদিকে টি-শার্টের পাশাপাশি সাদা-কালো কিংবা লাল-সবুজের পটভূমিতে একই রকম আবেগ নিয়ে একুশ মূর্ত হয়ে ওঠে নানা ঢঙের ফতুয়াতেও। বিশেষ করে, শীতের বিদায়ের ধ্বনি যখন ঋতুর পালাবদলে গেল কিছুদিন ধরেই বেশ মূর্ত হয়ে উঠেছে, তখন এবারের একুশের আয়োজনে টি-শার্ট আর ফতুয়ার মতো পোশাকগুলোই অনেক বেশি আয়াসের সাথে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হবে একুশের চেতনাকে। একটা সময় ছিল যখন, ফাল্গুন আর একুশের আয়োজনে মেয়েদের প্রথম পছন্দ ছিল শাড়ি। শাড়ির প্রতি সেই পক্ষপাত হয়তো এই সময়ের মেয়েদের মাঝেও কমবেশি বিদ্যমান। সাদা-কালো কিংবা নীলের পটভূমিতে একুশের বর্ণমালাকে ধারণ করা মেয়েদের শাড়িতে সুতির প্রাধান্যই বেশি। এ ছাড়া নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একুশের অন্যান্য যে অনুষঙ্গগুলো যোগ হতে পারে পরিধেয়র সঙ্গে তার মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় মেয়েদের মাথা আর গলায় গাঁদা ফুলের সাজের কথা। একদিকে একুশের শহীদ বেদীতে গাঁদা কিংবা গোলাপের শ্রদ্ধার্ঘ আর অন্যদিকে একুশের চেতনায় সামিল হওয়া কোনো তরুণীর মাথায় শোভা পাওয়া গাঁদার মালা যেন একুশের ছন্দটাকেই নিয়ে আসে সকলের মাঝে। আবার মাথায় বাংলাদেশের পতাকার রঙের কোনো ফেট্টি বা হাতে লাল-সবুজের কোনো ব্রেসলেটও আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় ভিন্ন এক অনুভূতির সাথে। সেই সাথে ছোট-বড় সকলের গালে রংতুলির ছোঁয়ায় জন্ম নেওয়া বর্ণমালা আর একুশের মিনারও যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়—আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। মনে করিয়ে দেয় আজকের দিনটি শোককে শক্তিতে পরিণত করে ভাষার জন্য ভালোবাসা প্রকাশের দিন।