রাজীবকে বিয়ের পর থেকে দেখেছি, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ও খুবই সোচ্চার। অনলাইনে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে লেখালেখি করতো। যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্য অনেক অনুরোধও করেছি। বলেছি ওরা তোমার ক্ষতি করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। কিন্তু আমার কোন কথাই শুনেনি সে। নিজের মতো করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত এ কারণে তাকে জীবনও দিতে হলো। নিহত স্থপতি ও ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনের স্ত্রী আনিকা বললেন কথাগুলো। গতকাল সোমবার কথা হয় তার সঙ্গে। আনিকা জানান, ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট তাদের বিয়ে হয়। আগে প্রেম ছিল। খুব সহজ-সরল ও মেধাবী ছিল রাজীব। সারাক্ষণ ল্যাপটপ নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রচার করতো। এক সময় নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। তদন্ত কর্তৃপক্ষ মনে করছে, রাজীব হত্যার পেছনে এটাও একটা কারণ হতে পারে। তবে বিষয়টিকে তেমন জোরালো মনে করছে না তদন্ত কর্তৃপক্ষ।
সম্পর্কটা কখন এমন হলো জানতে চাইলে আনিকা বলেন, বিয়ের পর থেকেই আমাকে সারাদিন একা থাকতে হতো। খুব মনযোগ দিয়ে চাকরি করতো না ও। এক চাকরিও বেশি দিন করতো না। তাকে সিরিয়াসলি চাকরি করতে বলি। বলি আমার বাবা-মার বাসা ছেড়ে চলো আলাদা বাসায় ওঠি। পরে একটা চাকরিতে জয়েন করে সে। ভাবলাম নিজেও কিছু করি। তখন ও আমাকে বলে, তোমার সঙ্গে ছায়ানটের সম্পর্ক ভালো, তো ওখানে কিছু একটা করো। পরে ছায়ানটে জয়েন করি, ২০১১ সালের নভেম্বরে।
সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতাম, একই সময় রাজীবও ফিরতো। দুজনই ক্লান্ত থাকতাম। রাজীব বলতো এ কারণে দু জনের মধ্যে আগের মতো গল্প করা হয় না। আবেগেরও ঘাটতি হচ্ছে। ও বলতো আমি তাকে সময় দেই না, গল্প করি না। এ নিয়ে প্রায় তর্ক-বিতর্ক হতো। এভাবে দিনের পর দিন ঝগড়ার কারণে সম্পর্কটা কেমন যেন হয়ে যায়। এমনিতে সহজ, সরল ও ভদ্র হলেও হঠাত্ রেগে যেতো। তখন তার রাগ ভাঙাতে অনেক কষ্টে হতো।
আনিকা বলেন, পরে রাজীবের বাবা ডা. নাজিম উদ্দিন হায়দার পরামর্শ দেন কিছুদিন আলাদা থাকলে হয়তো সম্পর্কটা আগের মতো হয়ে যাবে। গত বছরের মে থেকে অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজীব আলাদা থাকা শুরু করে। পল্লবীর পলাশনগরে তাদের বাসায় গিয়ে ওঠে। ওখানেও ল্যাপটপে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চালাতো দিনভর। কতদিন নিজ হাতে খাবার খাইয়ে দিয়েছি ওকে। ল্যাপটপে বুঁদ হয়ে থাকতো সে। খাবারের কথা ভুলে যেতো।
বান্ধবী তানজিনাকে নিয়ে ঘটনাস্থলে ডিবি
রাজীবের বান্ধবী তানজিনাকে নিয়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গতকাল বিকালে পল্লবী পলাশনগরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে গিয়েছে। ঘটনার দিন বিকাল ৩টা থেকে হত্যাকাণ্ডের ৩০ মিনিট আগ পর্যন্ত তানজিনা রাজীবরে সঙ্গে ছিল। তানজিনা মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশনে থাকে। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়, দেড় মাস আগে সম্পর্ক হয়। তানজিনাকে বিদায় দিয়ে বাসায় ফেরার পথে গত শুক্রবার রাতে নৃশংসভাবে খুন হয় রাজীব। ডিবির কর্মকর্তারা আটক ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। গতকাল রাত ৯টা থেকে আনিকাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি। আনিকা বিয়ের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিস্তারিত তথ্য ডিবি পুলিশকে জানান।
