একুশে ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে টিক টিক করে সময় এগিয়ে চলেছে। ঘড়ির কাঁটার শব্দ নয়, যেন সময়ের ঘণ্টা বেজে চলেছে। আর মাত্র তিনটে দিন বাকি, তারপরই সূর্য বিস্ফোরণের দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। ছাত্রাবাসগুলো আপাতদৃষ্টিতে শান্ত স্থির, কিন্তু ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় টানটান। আর ছাত্রাবাসে চলছে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের ছোট ছোট জটলা, আড্ডাও বলা চলে। ঢাকা হল বা ফজলুল হক হলে তেমনি মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে।
মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল। কলেজ ইউনিয়নের ভিপি গোলাম মাওলা এমএসসি পাস করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছেন ডাক্তার হবেন বলে। তার বয়স বিনম্র আচরণ ও নম্র স্বভাবের কারণে তিনি সবার ‘মাওলা ভাই’। তার রুমে প্রায়ই নেতৃস্থানীয় কর্মী-ছাত্রদের আড্ডা। মাওলা সাহেব তখনো খুব একটা রাজনীতিমনস্ক নন। কিন্তু মাতৃভাষা বলে কথা। তাই বিষয়টা নিয়ে তার যথেষ্ট আন্তরিকতা—সর্বোপরি ভিপি হিসাবে দায়-দায়িত্ব রয়েছে—সেটা অবহেলার নয়। অন্যদিকে তিনি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য। অবশ্য পড়ুয়া ছাত্রদের কথা আলাদা। তারা মোটা মোটা বই নিয়ে ব্যস্ত। এদিক থেকে ব্যতিক্রম বামপন্থি ছাত্রদের অনেকে। শাহজাদপুরের আলী আজমল, নওগাঁর মঞ্জুর হোসেন, বরিশালের লওয়ার হোসেন, কিশোরগঞ্জের ফজলুল করিম, ঢাকার আব্দুল কাদির খান, মানিকগঞ্জের আব্দুস সালাম আপাতত বই-টই একপাশে সরিয়ে রেখেছেন। বামপন্থি না হয়েও জাতীয়তাবাদী আলিম চৌধুরী বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী ঢাকার শরফুদ্দিনের সঙ্গে লায়ন সিনেমার গলিতে অ্যাডভেঞ্চারে যেতে দ্বিধা করছেন না। তরুণদের মধ্যে কবির, মাহমুদ, আলমগীর, মানাফ অনেক অনেক নাম।
শরফুদ্দিন কলেজ ইউনিয়নের জিএস ঢাকাইয়া পরিচয়ে খুশি। পুরনো ঢাকাবাসীদের ভাষা আন্দোলন বিষয়ক বিরোধিতা ঘুচাতে বাইশ পঞ্চায়েতের প্রধান কাদের সর্দারের আস্তানায় হাজির। যাতে একুশের আন্দোলনে তাদের সমর্থন মেলে। নানা টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলো। কাদের সর্দারের কথার যে নড়চড় হয় না তার প্রমাণ মিলেছে পরে। একুশের বিকাল থেকে পরের কয়েকদিন শহর ঢাকাকে তারা মিছিলের শহরে পরিণত করেছিলেন। মহল্লার তরুণ ও যুবশক্তি তখন পথে নেমেছে। অবশ্য যুবলীগ বা বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ঢাকাই তরুণ গোলাম মর্তুজা বা ফজলুল হক (ফজলুল নামে খ্যাত), হালিম সর্দার বা আশরাফ এদের কথা আলাদা। এরা সব প্রগতিশীল গণতন্ত্রী আন্দোলনে যুক্ত। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রথম থেকেই। কাদের সর্দারের ভূমিকায় এদের নিজ নিজ মহল্লায় খুশীমতো কাজ করা অনেকটা সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথাটা বলেছিল মর্তুজা একুশের সকালে আমতলায় দাঁড়িয়ে।
পুরনো ঢাকার এ পরিবর্তন জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। কথাটা বাম ছাত্রনেতা মৃণাল বাড়ড়ি’র। কারণ খাস ঢাকাইয়াদের মহল্লার মাঝখানে দাঁড়ানো জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনের তত্পরতা নিয়ে অসুবিধা হওয়ার কথা। আটচল্লিশের মার্চের আন্দোলনে ওরা তো রীতিমত বিরোধী ভূমিকায়। রণেশ দাশগুপ্ত বা তকিয়ুল্লাহদের সাধ্য কি তাদের মোকাবিলা করে? ন্যাশনাল বুক এজেন্সি পোড়ানো ও বই লুট, কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে হামলা, করোনেশন পার্কের সভায় সরদার ফজলুল করিম ও মুনীর চৌধুরী, শাহ আজিজ প্রমুখ মুসলিম ছাত্রনেতার রাজনৈতিক গুণ্ডামির কথা কি সহজে ভোলা যায়? ভোলা যায় নাদিরা বেগমের ওপর পুলিশি হামলার কথা?
এবার ১৯৫২-র ফেব্রুয়ারিতে অবস্থা ভিন্ন। অনুকূল হাওয়া ধীর বইছে। মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও তাই অনেক স্বচ্ছন্দ পরিবেশে—যদিও তারা সংক্ষিপ্ত কোর্সে ডিগ্রি শিক্ষাসহ নানা দাবিতে ধর্মঘটে। তবু মাহবুব, মুজিবর, জাফর প্রমুখ ছাত্রনেতা একুশের সঙ্গে জড়িত। অধিক তত্পর ছাত্রীদের মধ্যে নার্গিস, বীথি, ফাতেমা চৌধুরী প্রমুখ বাম ঘরানার এবং জাতীয়তাবাদী ধারার হালিমা খাতুন প্রমুখ। উত্তর থেকে দক্ষিণ তথা নতুন ঢাকা ও পুরনো ঢাকার ছাত্র-ছাত্রী-কর্মীদের মধ্যে কর্মতত্পরতার বন্ধন একুশের সফল সমাপনের পেছনে সক্রিয় ছিল।
মতাদর্শগত এই সেতুবন্ধন একুশের ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একইভাবে ফজলুল হক হল, ঢাকা হল, মেডিক্যাল হোস্টেলের প্রগতিবাদী ছাত্রদের মেলবন্ধনও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা বিশ্ববিদ্যালয় হল ছাত্রদের মধ্যে আনোয়ারুল হক খান (জিএস, ফজলুল হক হল), গাজীউল হক, কমরুদ্দিন শহুদ, মোশারফ, দেবপ্রিয়, মৃণাল দস্তিদার, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, রফিকুল ইসলাম প্রমুখের। সেসঙ্গে মুকুল, হাবিবুর রহমান শেলী, শহীদ খান, ফরিদা বারী মালিকসহ একাধিক ছাত্রী।
একটা অপ্রিয় সত্য এক্ষেত্রে মানতেই হবে, একুশের এই চালচিত্র রচনায় কেমন ছিল, কতটা ছিল রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা? হিসাব নিতে গেলে একটু থমকে দাঁড়াতে বা দ্বিধায় পড়তে হয়। যদিও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে ছিল দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রাধান্য। তাদের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে যায় ২০ ফেব্রুয়ারির সর্বদলীয় সভায় ১৪৪ ধারা ভাঙা না ভাঙার প্রশ্নে। দুইদিন পরই দেখা যাবে, বোঝা যাবে—কারা সত্যিকার অর্থে বিস্ফোরণধর্মী আন্দোলনের ঘটক।
লেখক: ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক
