কুশলের কান্না

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:২১
কুশল একেবারে নিঃশব্দ। কোনো কথা বলছে না। কুশলকে বাসায় ঢুকতে দেখেই হাসনা বানু থালায় ভাত আর মুরগীর মাংস টেবিলে দিয়ে রেখেছে। জানে, কুশল জামা কাপড় ছেড়েই খাওয়ার টবিলে ছুটে আসবে আর চিত্কার করবে— আমাকে খেতে দাও। পেটে আমার খিদের বাদ্য বাজছে..... অথচ সেই কুশল নিজের ঘরে একেবারে চুপচাপ বসে আছে। অবাক হাসনা বানু। ওর কী অসুখ করেচে? জ্বর এসেছে? নাকি কারো সঙ্গে ঝগড়া করেছে? স্কুলের কোনো শিক্ষক কী বকেছে? কুশলের কাছে বসে কপালে হাত রাখে, না শরীর ঠিক আছে। তাহলে? কী হয়েছে কুশল? মোলায়েম কণ্ঠে জানতে চায় হাসনা বানু। গম্ভীর কণ্ঠ কুশলের—কিছু হয়নি আমার। চুপচাপ বসে আছো যে? তোমার খিদে পায়নি? ঘাড় কাত করে, পেয়েছে। তাহলে খেতে চলো। টেবিলে খাবার দিয়েছি। সকালেতো ভালো করে নাস্তা করোনি। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। কেনো্? বাবা আসুক, তার সঙ্গে খাবো। তারও আসার সময় হয়েছে। তুমি চলো খাওয়ার টেবিলে। না, বাবা আগে আসুক। হঠাত্ কুশলের এই গম্ভীর আচরণে অবাক হাসনা বানু। কুশলের ঘর থেকে বের হয়ে সম্পার রুমে যায়। ডাকে পম্পা আর চম্পাকেও। ওরাও কুশলের হঠাত্ এই গম্ভীর আচরণে বিস্মিত। ঠিক এই সময়ে কলিংবেল বাজে। ওই তোদের বাবা এসেছে। যা দরজা খুলে দে— ছুটে যায় পম্পা। ঘরে ঢোকেন রহমান সিদ্দিকী— কী ব্যাপার? সবাই এখানে গম্ভীর হয়ে আছো কেনো? হাসনা বানুর কাছে সব শুনে অবাক রহমান সিদ্দিকীও, বলো কী? চলো ওর কাছে যাই। চলো। হাসনা বানু, রহমান সিদ্দিকী, সম্পা, পম্পা, চম্পা ঢোকে কুশলের রুমে। সত্যিই কুশল গম্ভীর হয়ে বসে আছে ওর ছোট্ট চেয়ারে। মনে হচ্ছে, গভীর একটা ভাবনায় ডুবে আছে কুশল। পেছনে দাঁড়িয়ে ওর ঝাঁকড়া চুল এলোমেলো করে দেয় রহমান সিদ্দিকী, কী হয়েছে বাবা? কুশল তাকায়, বাবা? বলো। ওর বিছনায় বসেছে সবাই। অপক্ষো করছে কুশলের হঠাত্ এই গম্ভীর হওয়ার কারণ জানার জন্য। ওর এই গম্ভীর মুখ দেখে হাসি পাচ্ছে চম্পার। প্রাণপণ চেষ্টায় হাসি আটকে রেখেছে চম্পা। হাসলেই সবাই বকবে, বুঝতে পারে ও। আমার দাদু, মানে তোমার বাবা তো ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন? হাসেন রহমান সিদ্দিকী, হ্যাঁ। সেতো কবেকার কথা। হঠাত্ এই প্রশ্ন কেনো? দাদুর কী নাম ছিলো? আশ্চর্য! তুমি তোমার দাদুর নাম জানো না?রহমান সিদ্দিকীর কণ্ঠে একটু রাগ। জানি, তারপরও তুমি বলো। রহমান সিদ্দিকীর নিজেকে আসামী মনে হচ্ছে। নিজের পুঁচকে ছেলের কাছে তাকে জাবাবদিহি করতে হচ্ছে। ভেতরে ভেতরে রাগে ফুসছেন। হাসনা বানুসহ মেয়েরা তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। বলো বাবা। তোমার দাদুর নাম আই এইচ কোরেশী। উনি কী ১৯৫২ সালের একুশে ফ্রেবুয়ারি মিছিলে গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন? ঘরটার মধ্যে বজ্রপাত হলো। রহমান সিদ্দিকী মুমূর্ষ মানুষের মতো নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভাবেন, ইতিহাস কতো নির্মম। নিজের নাম থেকে কোরেশী বাদ দিয়ে সিদ্দিকী লিখলেও ইতিহাস পেছন ছাড়ছে না। রক্তাক্ত বাঘের মতো ইতিহাস পেছনে পেছনে আসে। বাবা, কথা বলো। উনি কী— হ্যাঁ বাবা। কিন্তু ইচ্ছে করে গুলির অর্ডার দেন নি। তখনকার সরকারের আদেশে উনি— আজকে ক্লাশে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পড়াচ্ছিলেন মুনতাসীর মামুন স্যার। পড়াতে পড়াতে তিনি বললেন বাঙালি হয়ে বাঙালির বুকে গুলি চালানোর আদেশ দিয়েছে বাঙালি ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট মি আই এইচ কোরেশী। গোটা ভাষা আন্দোলনের জন্য, পৃথিবীর সমস্ত বাঙালির জন্য এটা কলংক। আমিতো দাদুর নাম জানতাম। জানতাম উনি ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেটও ছিলেন। তোমার কাছে জেনে নিশ্চিত হলাম। সত্যি, আমার খুব খারাপ লাগছে। আমার দাদু কেনো ভাষার মিছিলে গুলির আদেশ দিয়েছিলো? রুম থেকে চলে যায় কুশল। পাথরের ভারী বোঝা বুকে নিয়ে বসে রইলেন রহমান সিদ্দিকী। তাঁর মুখ ফ্যাকাসে। চোখ বিষন্ন। আর গোপান ইতিহাসটা জেনে লজ্জায় মুখ নিচু করে বসে আছে সম্পা, পম্পা আর চম্পা। আর কুশল বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে। এতোক্ষণ কষ্ট করে যে কান্নাকে আটকে রেখেছিলো।