মাতৃভাষা বাংলার বিপদ আপদ

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:০২
আমাদের দেশের তরুণরা এখন কথায় কথায় বলে ‘ফোন দিয়ো’। ফোন করো না বলে তারা বলছে, ‘ফোন দিয়ো’। পাত্তা দিতে না চাইলে তারা মনের ভাব প্রকাশ করে ‘বেল নাই’ কিংবা ‘অফ যা’ এই শব্দগুলো দিয়ে। এছাড়া ‘হেব্বি জোস’, ‘ফাটাফাটি’, ‘পার্ট নিলি’, ‘উরাধুরা’, ‘তারছিঁড়া’, ‘দৌড়ের উপর আছি’, ‘এইডা কিছু হইল’ আড্ডায় এবং ফেসবুক চ্যাটিংয়ে তরুণদের মুখে মুখে ফিরছে এই শব্দগুলো। এছাড়া তরুণরা আরও কিছু শব্দ বলে থাকে যা মোবাইল কোম্পানিগুলো ব্যবহার করছে। দেশের বিভিন্ন বেসরকারি রেডিও চ্যানেলের আরজেরা বাংরেজিতে কথা বলেন। তাঁরা বলে থাকেন ‘প্রিয় লিসেনার্স’ বা ‘বস’, ‘এখন আমি প্লে করে দিচ্ছি অমুকের গান’ ইত্যাদি। আমাদের মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে এই শব্দগুলো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? আমি মনে করি তরুণদের এই শব্দগুলো ব্যবহারে অনেকেরই আপত্তি থাকার কথা। বাহান্ন সালে সংঘটিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বয়স একষট্টি বছর হচ্ছে এবার। এতগুলো বছর পরেও রাষ্ট্র ও সমাজের ভাষা হতে পারেনি বাংলা। এখন দেশ স্বাধীন। বাংলা রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান ক্ষেত্রের ভাষা আজও বাংলা হয়নি। এটা কারও ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সমষ্টিগত সমস্যা। অনেক অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন সহ্য করে বাংলা ভাষা টিকে আছে। গোপনে প্রকাশ্যে ইংরেজি, হিন্দি ভাষার উত্পাত চলছে বাংলার ওপর। গত একষট্টি বছরের মধ্যে আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনভিত্তিক অনেক অর্জন আছে। আবার অসন্তোষ ও ব্যর্থতারও অনেক বিষয় আছে। যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে দেশে এখন ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের চেয়ে বেশি বৈষম্য বিরাজ করছে। ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলেও শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল। তবে এখনকার মতো এত বৈষম্য ছিল না। ভাষা আন্দোলনের মূল প্রত্যাশা ছিল বাংলা ভাষার মাধ্যমে সর্বস্তরে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আন্দোলন হলো। অথচ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সর্বস্তরে সেই ভাষা নেই। আমাদের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছে ভাষাভিত্তিক। আমরা চেয়েছিলাম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালতসহ সবখানে বাংলা ভাষার প্রচলন হোক কিন্তু তা হয়নি। এ রাষ্ট্রের মাতৃভাষার চর্চাই প্রধান হিসেবে গৃহীত হবে— জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন-গবেষণা হবে বাংলা ভাষায় এটাই ছিল স্বাভাবিক। ব্রিটিশ, পাকিস্তান আমলেও বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত ছিল, অন্য ভাষার প্রভুত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে আজ সেই প্রতিবাদ নেই। সচেতনতা নেই। যা হওয়া অনিবার্য ছিল। এ পরিণতি প্রত্যাশিত নয়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিভাজনটা এখন তিন ধারার। মাতৃভাষার ভিত্তিতে অভিন্ন শিক্ষারীতি হওয়ার কথা ছিল। এসব ধারার শিক্ষাব্যবস্থা মূলত সামাজিক ক্ষেত্রে বিভাজনের ফল। এতে সমাজে বাড়ছে শ্রেণি-দূরত্ব। বাড়ছে বৈষম্য। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করা এখনও আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল। সেজন্য বাংলায় বই লেখা এবং বিদেশি বই অনুবাদ করা দুটিরই দরকার ছিল। কাজগুলো গত বছরগুলোতে হয়নি। ফলে বাংলা ভাষার উচ্চস্তরে শিক্ষা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। উচ্চস্তরের অধিকাংশ বই ইংরেজিতে লেখা। এটাও সত্য বিভিন্ন বিষয়ের বই বাংলায় প্রচুর লেখা হয়েছে। তবে মৌলিক ও উচ্চশিক্ষার জায়গাগুলোর জন্য বই লেখার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা আছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের এতগুলো বছর পরও বিশ্বের বাংলাভাষীদের কাছে বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ তুলে ধরতে পারছি না। বিশ্বকে বাংলা সাহিত্যের একটি সামগ্রিকতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারছি না। এ ব্যর্থতার দায়ভার আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর। বাংলা ভাষার বিপদ ও শত্রুকে আমাদের চেনা দরকার। পাকিস্তান আমলেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করছে বাংলা। নানা সময়ে রাজনৈতিক কারণে বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণ এসেছে। একসময় সংস্কৃত ভাষার দাপট বাংলা ভাষার ওপর চড়াও হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় আরবি, ফার্সি ভাষাও বাংলা ভাষার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়। ব্রিটিশদের শাসনামলে আমরা দেখেছি ইংরেজি ভাষার প্রসার ও কর্তৃত্ব তত্কালীন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে দ্বিভাষীতে পরিণত করেছিল। কেননা রাষ্ট্রের ভাষা ছিল ইংরেজি। তবুও সে সময় খুব জোরালোভাবে বাংলা ভাষার চর্চা চালানো হয়েছে। ইংরেজির আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল। আমাদের সাহিত্যিকরা তাতে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন। সমপ্রতি আরও একটি নতুন উত্পাত এসে জুটেছে। তা হলো হিন্দি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে হিন্দি ভাষার উত্পাত। শিশুরাও হিন্দির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি শাসনামলেও বাংলার যতটা বিকৃতি তারা করতে পারেনি, স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বিকৃতি ঘটেছে তার চেয়েও অনেক বেশি। আবার আমাদের দেশি টিভি নাটকগুলোতেও এক ধরনের গোঁজামিল দেয়া আঞ্চলিক ঢঙের অদ্ভুত ভাষার চর্চা করা হচ্ছে। চরিত্ররা সে ভাষায় কথা বলছে। এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়াটা কঠিন। ফেব্রুয়ারি কেবল ভাষার মাস— এটা ঠিক নয়। ভাষার মাস বলে আলাদা কোনো মাস নেই। বছরের সব মাসই ভাষার মাস। ফেব্রুয়ারি এলে ভাষাচর্চার কথা বলা আর বছরের অন্য মাসে তা ভুলে থাকা—এটা অন্যায়। ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে দেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশন মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ষাট বছর পরও সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। অথচ সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের জন্যই সেদিন আন্দোলন হয়েছিল। ভাষার সঙ্গে শত্রুতা আর মানুষের সঙ্গে শত্রুতা একই। ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা আমাদের শত্রু, যা ভাষার বিকাশ, চর্চা বাধাগ্রস্ত করছে, সমাজে বাড়াচ্ছে বৈষম্য। সবমিলিয়ে ভাষা আন্দোলনের এতগুলো বছরেও শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা চালু হয়নি। পূরণ হয়নি ভাষা আন্দোলনের মৌলিক প্রত্যাশা। শাসকরা বাংলা ভাষার ব্যাপারে উত্সাহিত না হওয়ার আরেক কারণ সমাজের মৌলিক কোনো পরিবর্তন তাঁরা চান না। পরিবর্তন না হলেই তাঁদের সুবিধা। কারণ পরিবর্তনটা এলে আর সবাই সমান হয়ে গেলে তাঁদের বহুবিধ সুযোগ-সুবিধা থাকবে না। একাত্তরে স্বাধীনতা লাভের পরও সমাজে কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। সমাজটা আগে যেরকম শ্রেণিবিভক্ত ছিল, এখনও সেরকমই রয়ে গেছে। সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিত্তবানরা। তাঁরা ইংরেজিতে কথা বলেন। বাংলা বললেও তা হয় ইংরেজি মিশ্রিত। গাইবান্ধা