মিডিয়া-প্রভাব নিয়ে সরল পাঠ এবং সংসদে ‘ডোরেমন’ প্রসঙ্গ

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:০৩
ডোরেমন-প্রভাব নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে। এই ভিড়ে আমার মতো সাধারণ-চিন্তার মানুষের লেখার কোনো ইচ্ছে ছিল না। কিংবা আজকেও এর পালটা কোনো যুক্তি খাড়া করার কোনো মতলবও আমার নেই। কিন্তু ডোরেমন যখন সংসদে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে পড়ে তখন এটাকে নিঃসন্দেহে ‘জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করলে তা অতুক্তি হয় না! চলতি মাসের প্রথম রবিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণীয় নোটিশে (বিধি-৭১) সরকার দলীয় এক সংসদ সদস্য দাবি তোলেন হিন্দি ভাষায় ডাবিং করা জাপানি কার্টুন ‘ডোরেমন’ সম্প্রচার বন্ধ করার। তিনি যুক্তি দেখান, এই কার্টুন শিশুদের হিন্দি আর মিথ্যা বলা ছাড়া কিছুই শেখাতে পারবে না। তিনি এর বিকল্প হিসেবে এমন কার্টুন দেখানোর পরামর্শ দেন, যেগুলো শিশুদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দেবে, সময়মতো পড়াশোনায় আগ্রহী করবে, এমন বিদেশি ভাষার বাংলায় অনূদিত কার্টুন। ‘ডোরেমন’ কার্টুনটির সংক্ষিপ্ত কাহিনি বিন্যাসটায় নজর দেয়া যাক। ডোরেমনকে দ্বাবিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমানে পাঠিয়েছে নোবিতা নোবির নাতি (দৌহিত্র!) সেবাশি নোবি। সে তার দাদা নোবিতার খারাপ চরিত্রকে সংশোধন করার জন্যই ডোরেমনকে পাঠিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে তার বংশধররা একটা উন্নত জীবনযাপন করতে পারে। নোবিতা খুবই দুষ্টু চরিত্রের একটা ছেলে। সে হোমওয়ার্ক ফাঁকি দেয়, দেরি করে স্কুলে যায়, আর এর ফলবশত পরীক্ষায় খুবই কম নম্বর পায়। এসব থেকে বাঁচার জন্যই সে প্রায়ই মিথ্যার আশ্রয় নেয়। এজন্যই নোবিতা তার ক্যারিয়ারে উন্নতি লাভ করতে পারে না এবং তার পরিবার আর্থিক সংকটে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই ইতিহাসের পরিবর্তন করতে এবং নোবির পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতেই সেবাশি কানবিহীন একটা রোবট বিড়াল ডোরেমনকে পাঠায়। এই ধরনের একটা কাহিনির ওপর ভিত্তি করে কার্টুনটির রোজকার পর্বে দেখানো হয় নোবিতার দৈনন্দিনকার বিভিন্ন সমস্যা। দেখানো হয় স্কুলে কিংবা প্রতিবেশীর কাছ থেকে নোবিতা প্রতিনিয়ত যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়, সেগুলো। ডোরেমন তাকে সবসময় এই সমস্যাগুলোর সমাধানমূলক প্রয়োজনীয় উপদেশ দেয়। কিন্তু এটুকু নোবিতার জন্য যথার্থ হয় না। সে সবসময় দ্রুত সমাধান-এর প্রত্যাশী। চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখা যায়, সে তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং দোষ স্বীকার করে। এজন্য ডোরেমন তার ভবিষ্যত্ থেকে একটা গেজেট বা যন্ত্র আনে, যার মাধ্যমে নোবিতা তার সমস্যা, প্রতিশোধ এবং গর্বিত করার বিষয়গুলো আগে থেকেই জানতে পারে। নোবিতা প্রায়ই এই গেজেট অমান্য করে এবং অনেক সমস্যায় পড়ে। যা হোক, এই কাহিনি শেষ হয় দোষী চরিত্রগুলোকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে এবং সর্বোপরি একটা নৈতিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, শিশুদের বিনোদনের জন্য তৈরি এই কার্টুনের কাহিনি কী সমস্যার তৈরি করছে? কোন সমস্যার কারণে আজ এই কার্টুনটি জাতীয় সংসদেও একটি আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হলো? অভিযোগ উঠেছে— কার্টুনটিতে নৈতিক কিংবা শিক্ষনীয় কোনো বিষয় নেই। আমরা কেউ কি কার্টুনটি দেখে এই পর্যবেক্ষণ করছি? নাকি এটা একটা গড়পরতা সমালোচনা মাত্র? কিংবা হতে পারে, শিশুদের মধ্যে এটা দেখার প্রবল ইচ্ছার কারণে অভিভাবকসুলভ সর্বজ্ঞানের আধিকারিক হয়ে ওঠার গর্বে আমরা কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ করছি? কার্টুনটিতে নোবিতা দুষ্টু এবং চঞ্চল স্বভাবের একটি চরিত্র। তাকে শোধরানোর দায়িত্ব দিয়েই পাঠানো হয় ডোরেমনকে। এখানে ডোরেমন নোবিতার সকল দুষ্টুমির জন্য শিক্ষামূলক কিংবা নৈতিকতা বিষয়ক জ্ঞানদান করে থাকে। এখানে দেখা যায় পরিবেশের প্রতি সচেতনতা, গৃহপালিত পশুদের জন্য যত্ন, অপরের কল্যাণে আত্মত্যাগ, বিপদের সময়েও মুখে সাহসের ছাপ এবং বাবা-মার জন্য ভালোবাসা প্রভৃতি নৈতিকতা বিষয়ক বার্তা। কোনো পর্ব নৈতিকতানির্ভর না হলে কাহিনিগুলো হয় কোনো শিক্ষণীয় বিষয়—ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, বিজ্ঞাননির্ভর কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে। এমনকি অর্থনৈতিক মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্য সম্পর্কেও এখানে বার্তা দেওয়া হয়। এই উপাদানগুলোই শিশুদের পরিচিত কিছু চরিত্রের মধ্য দিয়ে কমেডি এবং হাস্যরসের সংমিশ্রণে উপস্থাপন করা হয়। আর এজন্যই ২০০২ সালের ২২ এপ্রিল আমেরিকার সাপ্তাহিক ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এর এশিয়ান ‘হিরো ’ নিয়ে এক বিশেষ ইস্যুতে ২৫ জন এশিয়ানের মধ্যে ডোরেমনকে ‘এশিয়াস গ্রেটেস্ট লিভিং হিরো’ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এর কারণ হিসেবে ম্যাগাজিনটি জানায়, ‘এটা পুরো এশিয়ার সকল শিশুকে উত্সাহিত ও অনুপ্রাণিত করে’। এবার একজন অভিভাবক হিসেবে ভেবে দেখুন তো, আপনার ছোট্ট সন্তানটি আসলে কেমন? সে খেতে চায় না, জোর করে তাকে খাওয়াতে হয়? রোজ বুঝিয়ে তাকে নিয়ে বসতে হয় পরের দিনের হোমওয়ার্ক করানোর জন্য? সকালে ঘুম থেকে টেনে তুলে দ্রুত তাকে তৈরি করা হয় স্কুলের জন্য এবং সে না-যাওয়ার অনেক অজুহাত আপনাকে দেখায়? কোনোদিন তার পেট ব্যথা, কোনোদিন তার বন্ধু যাবে না প্রভৃতি প্রভৃতি? ‘ডোরেমন’ কার্টুনটির নোবিতাও ঠিক এমন-ই একটা চরিত্র ধারণ করেছে। আর এজন্যই নোবিতা একটি শিশুর এত কাছের জন। নোবিতার মধ্যে সে তার নিজেকে খুঁজে পায়। আর এজন্যই শিশুদের মধ্যে এই কার্টুনটির এতোটাই জনপ্রিয়তা। সুতরাং নোবিতাকে দেখে একটি শিশুর নতুন করে কিছু শেখার নেই। বরং একটি শিশু যেমন ‘নোবিতা’ ঠিক তেমনই একটা শিশু চরিত্র। আর এজন্যই ‘ডোরেমন’ কার্টুনটির প্রধান চরিত্র ডোরেমনকে ছাপিয়ে নোবিতা-ই শিশুদের পছন্দ ও অনুকরণীয় চরিত্র হয়ে উঠেছে। এবার দ্বিতীয় অভিযোগটির প্রসঙ্গে আসা যাক। শিশুরা ‘ডোরেমন’-এর জন্য হিন্দি শিখছে। আসুন আমরা একটু আমাদের শৈশবে ফিরে যাই। যখন ডিশ সংযোগ (ক্যাবল নেটওয়ার্ক) ছিল না, সেই ’৯০ দশকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং ভারতের দূরদর্শন—। এই দুই চ্যানেলই শুধু দেখার ছিল। তখনকার শিশুদের কাছে অত্যধিক জনপ্রিয় একটা কার্টুন ছিল ‘দ্য জঙ্গল বুক’। হিন্দি ভাষায় ডাবিং করা জাপানি এই কার্টুনটি দূরদর্শনে দেখানো হতো। ইন্ডিয়ার জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া একটি শিশুকে বনের বন্য পশুরা তাদের আস্তানায় নিয়ে আসে এবং এই সূত্র ধরেই নানাধরনের অ্যাডভেঞ্চার তৈরি হয়। মোগলি, ভালু, বাগিরা, শের খান প্রভৃতি প্রত্যেকটি চরিত্র ছিল তখনকার প্রত্যেক শিশুর অনেক পরিচিত। শিশু মোগলি বনের পশুদের সঙ্গে বড় হওয়ার কারণে তার চরিত্রে এর অনেকটাই ছাপ পড়ে। কিছু সময় পরে ডিশ সংযোগ চালুর কারণে সেইসময় আরেকটি অত্যধিক জনপ্রিয় টিভি শো ছিল ‘আই ড্রিম অফ জিনি’। ফ্যান্টাসির সঙ্গে কমেডির মিশ্রণে তৈরি আমেরিকার এই শো-টি হিন্দিতে ডাবিং করে সনি চ্যানেলে প্রচারিত হতো। নাসার নভোচারী টনি নেলসন দুই হাজার বছর আগের বন্দি এক জিনিকে বোতল থেকে উদ্ধার করেন। জিনি সবসময় দুষ্টুবুদ্ধিতে ভরা চমত্কার একজন নারী। এবং সে তার মাস্টার নেলসনের চরম ভক্ত। এই বিষয়টা শুধু জানেন নেলসনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু, তার সহকর্মী রজার হেয়ালি। মাস্টারের প্রয়োজন হলেই যে কোনো সমস্যা থেকে জিনি তাকে সাহায্য করে। মেজর নেলসনকে কেন্দ্র করে সবসময়ই আশ্চর্যকর ঘটনা ঘটতে থাকে। নাসার মনোচিকিত্সক ডা. আলফ্রেড বেলৌস এর কারণ খুঁজে পান না এবং হতভম্ব হন। কিন্তু সেইসময় আমাদের প্রজন্মের অভিভাবকরা এই কার্টুন কিংবা টিভি শো-টি নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করতেন না! মোগলি দেখে কোনো শিশু চাকতি দিয়ে তার বন্ধুকে মেরেছে কিংবা গাছের ডাল ধরে ঝুলে মাথা ফাটিয়েছে বলে কোনো অভিভাবক কখনো অভিযোগ করেননি। জিনির সংক্ষিপ্ত পোশাক শিশুর বিকাশে প্রভাব ফেলছে— এমন কথাও শোনা যায়নি। আর হিন্দিতে ডাবিং করা এসব দেখেই তার শিশুটি হিন্দি ভাষা আত্মস্থ করছে, বাংলা ভুলে যাচ্ছে—এমন অদ্ভুত যুক্তিও কোনো অভিভাবক দেখাননি। এই পর্যায়ে আজকের অভিভাবকদের কাছে প্রশ্ন— স্টার প্লাস, জি টিভি কিংবা সনি টেলিভিশনের কোন সিরিয়ালটা দেখা আপনি বাদ রাখেন? তখন কি আপনার শিশুটি ঘুমিয়ে থাকে? রাত সাড়ে ১০টা কিংবা সাড়ে ১১টার ‘সিআইডি’ বা ‘ক্রাইম পেট্রোল’-এর জন্য আপনার সন্তানটিকে জাগিয়ে কিংবা কোনো কোনো দিন অভুক্তও রাখেন! তখন আপনার শিশুটি কি তার সকালের হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকে? পরিবার-পারিপার্শ্বিকতা ও সমসাময়িক সময়কে বাদ রেখে, সংস্কৃতিতে আধুনিকতার ছোঁয়ার প্রভাব-প্রতিপত্তিকে বাদ রেখে, রাষ্ট্রের-সমাজের ক্ষমতাচর্চার সম্পর্কসূত্রগুলোকে বাদ রেখে জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মিডিয়ার প্রভাবের এই সরল-পাঠ হাস্যরসের জন্ম দেয় বৈকি। শিশুর ছোট্ট পিঠে পাঠ্যপুস্তকের বোঝা আর চার দেয়ালে বন্দী শৈশবে একমুঠো বিনোদনকে যেন অভিভাবকসুলভ কর্তৃত্বের ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমরা যেন কেটে না ফেলি। ঢাকা