ভাষার প্রতি ভালোবাসা বাঙালির বহুদিনের। এতে হিন্দু ও মুসলমান কোনো ভেদ নেই। মুসলমান কবি আবদুল হাকিম আর হিন্দু কবি নিধু বাবু একইভাবে কবিতায় ভাষার প্রতি ভালোবাসা জানিয়েছেন। তাঁরা যে সময় নিজ ভাষাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন সে সময় রাজভাষা ছিল ফার্সি এবং ইংরেজি। সভাসদ বা এলিটদের ভাষা। যারা এই ভাষা জানত তারা রাজকাজের সঙ্গে যুক্ত হবে, আলাদা শ্রেণীতে পরিণত হবে, শাসন চালাবে, অর্থোপার্জন করবে। আর গরিবরা বাংলা বলবে। ওই দু’জন কবি দুঃখ, ক্রোধ কবিতায় প্রকাশ করে সান্ত্বনা পেয়েছিলেন।
বাংলা ভাষাকে প্রেমিকার মতো ভালোবাসি না, বাসলে, বার বার বাংলার প্রয়োজনীয়তার কথা লিখতে হতো না। আমাদের মনোবাসনাটা তাত্ক্ষণিক। যার আয়ু খানিকক্ষণ, প্রেম অথচ আস্থাহীন। পাকিস্তানের কলোনি আমলে বাংলা ভাষা নিয়ে শাসক শ্রেণী ও তাদের সহযোগীরা যা করেছে, আজ দেখা যাচ্ছে, ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কোনো প্রতিবাদ নেই। তখনকার তরুণদের কলোনি মানসিকতা হয়তো ততটা গ্রাস করেনি, এখন যতটা করেছে। তাই তখন প্রতিবাদ ছিল, এখন নেই। বাংলা ভাষা নিয়ে কী আন্দোলন হয়েছে, একুশে ফেব্রুয়ারির তাত্পর্য কী, তা নিয়ে প্রতিবছর যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে, যা পুনর্ব্যক্ত করার প্রয়োজন নেই। সেই তাত্পর্য এখন কেন গুরুত্বহীন সেই আলোচনাই বোধহয় বেশি প্রাসঙ্গিক।
সেই থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত কত কবি এই ভাষা নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে গান লিখেছেন, কবিতাও। ভাষা আন্দোলন বলা যেতে পারে সেই সব রচনার/ ঘটনার উত্তরসূরি। ১৯৭১ সালে গান যখন যুদ্ধের হাতিয়ার, তখন দেশের গান আর ভাষার গান এক হয়ে গিয়েছিল। ভাষা মানে দেশ, দেশ মানে ভাষা। তাই ১৯৭২ সালের সংবিধানে লেখা হয়েছিল—একেবারে ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ—‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। বঙ্গবন্ধুর আমলে আক্ষরিক অর্থেই তা ছিল, বাংলা ভাষার রাষ্ট্র ছিল বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যথাযথভাবে সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা প্রচলনে উদ্যোগী হয়েছিলেন। জাতিসংঘে যে তিনি নিজ ভাষায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন তার একটি কারণ তিনি বিশেষ একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, নিজ জাতির আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করতে চেয়েছিলেন। যে সব জাতি হীনমন্যতায় ভোগে না তারা নিজ ভাষায় কথা বলে গর্ব অনুভব করে। কয়েকদিন আগে যে তুর্কী প্রেসিডেন্ট এলেন তিনি তো নিজ ভাষায় কথা বলে গেলেন। তিনি কি ইংরেজি জানেন না? বিলক্ষণ জানেন।
বঙ্গবন্ধুর আমলেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছিল। বাংলা ভাষা প্রচলনে তাঁকেও কয়েকবার বিশেষ নির্দেশ দিতে হয়েছে। এর কারণ কী? কারণ, আর কিছুই না, বিভিন্ন পেশাজীবী, যারা গঠন করেছিল এলিট শ্রেণী, তারা তাদের কাছে করণিক ইংরেজিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। বাংলা নয়, বাংলা ছিল গরিবদের ভাষা। যারা বিদেশি ভাষায় দক্ষ তারাই চাকরিতে অগ্রাধিকার পেত, অর্থাত্ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এলিটদের সন্তানরা। বাংলা চালু হলে এই সুবিধা হ্রাস পেত, যাতে তারা রাজি ছিল না। এ ছাড়া, বাংলাদেশের জন্য গরিবরা যত রক্ত দিয়েছে অকাতরে, এলিটরা ততটা নয়। সুতরাং বাংলাদেশের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসায় হেরফের ছিল। কলোনির মন তারা দূর করতে পারেনি।
বাংলা ভাষা-বিরোধী এই প্রতিরোধ জয় হয় জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে। জিয়া ভালো বাংলা জানতেন কিনা জানি না, তবে তিনি বাংলাটা বলতেন উর্দুর ঢংয়ে। তিনিই সংবিধান থেকে বাংলা হটিয়ে দিলেন। চতুর্থ তফসিলে [১৫০ অনুচ্ছেদ] ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী’ বলে ৩/ক/৯-এ বলা হলো- ‘সংবিধানের বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে কোনো বিরোধ, বৈপরীত্যে, অসঙ্গতি অথবা অসামঞ্জস্যতার ক্ষেত্রে, যতদূর তাহা উক্ত ফরমানসমূহ দ্বারা সংবিধানের কোনো পাঠ কিংবা উহার উভয় পাঠের কোনো সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন অথবা বিলাসসাধন সম্পর্কিত হয়, ইংরেজি পাঠ প্রাধান্য পাইবে।’
জিয়াউর রহমানের মূল লক্ষ্য ও আদর্শের সঙ্গে ঐ বিধান ছিল সঙ্গতিপূর্ণ। তাঁকে ক্ষমতায় বসান হয়েছিল যাতে তিনি বাঙালি পাকিস্তানিদের পয়দা করতে পারেন। স্বাধীন বাংলায় রাজাকার আলবদর মন্ত্রী হবে, জামায়াতি ও স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনীতি করবে, আইএসআই হবে দেশের চালিকাশক্তি আর বাংলা ভাষা ঐভাবে বলবত্ থাকবে তাতো হতে পারে না, উর্দুটা চালু করতে পারলে হয়তো তিনি খুশি হতেন, কিন্তু অতটা সাহস করেননি তাঁরা। এলিটদের এই ইঙ্গিত বুঝতে সময় লাগেনি। পরবর্তী সামরিক শাসক থেকে এ পর্যন্ত ঐ ধারাই বলবত্ থাকছে। বিষয়টা স্বাভাবিক করে তোলার প্রচেষ্টা হচ্ছে।
সে কারণে ১৯৭৫ সালের পর দেখা যাচ্ছে, সারাদেশে পল্লীগ্রাম পর্যন্ত ইংরেজি মিডিয়াম খোলা হচ্ছে। এখানে যে সব পাঠ্যবই পড়ানো হয় তাতে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। প্রশাসনে ইংরেজি ফিরে এল এবং বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কে প্রায় শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে নিয়োগকর্তারা বলতেন, ইংরেজির ই-ও জানে না। বিচারকরা বললেন, ইংরেজি ভাষায় রায় দেওয়া যায় না, যদিও বিচারপতি খায়রুল হক বা আরও অনেকে দেখিয়েছেন বাংলায়ও চমত্কার রায় দেওয়া যায়। বাংলা একাডেমীর পাঠ্যপুস্তক বিভাগ অনুবাদ বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়ল। শহরের স্থাপনাসমূহের নাম ইংরেজিতে লেখা হতে লাগল। ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াটা একটা স্ট্যাটাসের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। বাংলা মাধ্যমের অজস্র ছাত্রছাত্রীর মনে এক ধরনের হীনমন্যতাবোধ ঢুকিয়ে দেওয়া হতে লাগল। বছর দশেক আগে থেকে মোবাইল ফোন অপারেটর এবং সম্প্রতি এফএম রেডিওতে মিশ্র বাংলা বিজ্ঞাপন বা ধারা বিবরণী চালু হলো। এমনকি রোমান হরফে বাংলা লেখাও, যার বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত, তারা একটি বৃহন্নলা ভাষা তৈরি করতে চায়, যা হবে এক বৃহন্নলা সমাজের ভাষা। যেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা সংস্কৃতির স্থান করে নেবে করপোরেট বিকৃত সংস্কৃতি। আমি লক্ষ্য করেছি বিভিন্ন সভা-সেমিনারে একজন বিদেশি থাকলে বা সবাই বাঙালি হলেও ইংরেজিতে আলোচনা করে তারা অতীব আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। এভাবে ভাষা একটি বিশেষ এলিট শ্রেণী তৈরির মাধ্যম হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের আপত্তিটা সেখানে, যে রাষ্ট্র গঠিত গরিবদের রক্তের বিনিময়ে সেখানে তারা ভাষার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে না এটা হতে পারে না।
এখনও রাষ্ট্রভাষা বাংলা, তবে আক্ষরিক অর্থে নয়। ভাষার ওপরে এখন কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের। সামরিক শাসকদের আমল থেকে, খালেদা জিয়া-নিজামীদের পাকিস্তানপন্থি আমলে থেকে, রাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ স্থান থেকে বাংলাকে হটিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই অষ্টাদশ-উনিশ শতকের মতো এখন নতুন শ্রেণী হয়েছে, যাদের ভাষা ইংরেজি তাদের ব্যবহার কলোনির অধস্তনদের মতো। হীনমন্যতা ভরা। মর্যাদাপূর্ণ নয়।
অন্যান্য ভাষা নিয়ে আমার কোনো বিরাগ নেই। যে যত ভাষা জানবে তার জন্য তত সুযোগের দুয়ার খুলে যাবে। আর ইংরেজিতে তুখোড় না হলেও জানতে হবে। ইংরেজি এখন শুধু আর ভাষা নয়, এটি একটি দক্ষতা বা ‘স্কিল’। যেমন, কম্পিউটারটা জানা। না জানলে পিছিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সে কারণে ইংরেজিকে রাষ্ট্রে মর্যাদা দেওয়া আর নিজ ভাষাকে রাষ্ট্র থেকে হটিয়ে দেওয়া, ইংরেজিতে সামান্য দক্ষ কৃষ্ণ সাহেবদের নিয়ে আলাদা শ্রেণী করাটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আরও গ্রহণযোগ্য নয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইংরেজির ব্যবহার। এ দেশে প্রথম শ্রেণী থেকে ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হয়। যদি ছাত্ররা তা না শিখে থাকে তাহলে তা শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি। সেটি আগে মেরামত করা দরকার।
গ্রহণযোগ্য নয় আরেকটি বিষয়, সেটি হচ্ছে বাংলা ভাষা নিয়ে গণমাধ্যমে ফাজলামি।
টেলিভিশন নাটক, এফএম রেডিওতে এমন ভাষা বলা হচ্ছে যেটিকে ‘হিজড়া ভাষা’ বলা যায়। এটা আধুনিকতা, উত্তর-আধুনিকতা নয়, এটি মূর্খতা। বাঙালিকে হিজড়া বানাবার কোনো অর্থ নেই। এই কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহারে কোনো নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের নেই, এটিও ব্যর্থতা, ভাষার বিকৃতায়ন শুরু করছিল বড় মাল্টিন্যাশনাল করপোরেশনগুলো, যাদের ভয়ে গণমাধ্যম তটস্থ। এদের বাংলা ভাষার বিকৃতায়নে তাই গণমাধ্যম চুপ থেকেছে। ভাষা হত্যাও যে গণহত্যা, তা তাদের মনে হয়নি। বেশ আগে মফিদুল হক দুঃখ করে লিখেছিলেন—‘যাদের হাতে অঢেল বিত্ত জমা আছে, তাই তাদের জন্য এক্সট্রা খাতির শুরু হলো ঝাকানাকা ফাও গেঁজানো। বিজ্ঞাপনে এসব স্ট্রিটস্মার্ট বাংলা লেখা হলো ইংরেজিতে, রোমান হরফে এবং রসিকতা করেই হোক কিংবা বাঙালিত্বের মুখে কালি লেপে দেওয়ার অভিপ্রায় থেকে হোক, নবধারার বিজ্ঞাপনের কাজটি বিশালভাবে শুরু হলো পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের দিন থেকে। ডিজুস নামের অদ্ভুত ইংরেজি স্ল্যাংয়ে তারা ভরিয়ে ফেলল শহর।’ উদাহরণ আরও দেওয়া যায়, লাভ কী?
একটা কথা মনে রাখা দরকার, রোমান হরফে বাংলা লেখার বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালে আন্দোলন হয়েছিল। এখন যারা আবার পাকিস্তানিদের মতো বাংলা ভাষার অবমাননা করছে তারা বাংলা ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের বিরুদ্ধে বেইমানি করছে। এরা এ দেশে বসবাসকারী কলোনি মনোভাবাপন্ন বিদেশি। বাংলাদেশে থেকে বাংলাদেশের সব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে হিজড়া সংস্কৃতি বিকাশে তারা উত্সাহী। এতে তাদের ক্ষতি হয় না। শ্রেণীস্বার্থ তাদের অটুট থাকে। আশার কথা এই, এ ধরনের মানুষজনের অপচেষ্টা সব সময়ই বিফল হয়েছে। এখন আরও হবে। কারণ বাংলা ভাষার সূর্য এখন অস্ত যায় না। আর এটি পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্ ভাষা। যারা দেশপ্রেমিক মনে করেন নিজেদের, তাঁতের এই সত্যটি বারবার তুলে ধরা দরকার যে, বাংলা ভাষাই বিশ্বে আমাদের আত্মগৌরব তুলে ধরবে। একটি জাতির আত্মসম্মানবোধ কিছুতেই বিকশিত হবে না, যদি না সে নিজের ভাষাকে সম্মান করে। আগে যেমন আমরা এসব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে এগিয়ে এসেছি, এখনো আমাদের সময় এসেছে এসব অপচেষ্টাকে প্রতিরোধ করার।
পরিচর্যার অভাবে বাংলা ভাষাটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ সামান্য মনোযোগে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইংরেজি ও বাংলা শিক্ষক নিয়োগ করলে ছাত্রদের ভাষা বুনিয়াদ দৃঢ় হবে। নিজের ভাষা যেমন শুদ্ধভাবে পড়তে ও লিখতে পারবে একজন ছাত্র, তেমনি বিদেশি ভাষা সম্পর্কেও অহেতুক ভয় থাকবে না। বাংলা একাডেমীর পাঠ্যপুস্তক বিভাগটি শক্তিশালী করে উচ্চস্তরে রেফারেন্স বই লেখা ও অনুবাদ নিয়মিত প্রকাশ করলে উচ্চস্তরে রেফারেন্স বইয়ের অভাব মিটবে। আমরা চাই একজন ছাত্র একাধিক ভাষায় লিখুক কিন্তু অগ্রাধিকার পাক বাংলা ভাষা। ভাষার মাধ্যমে নব্য এলিট শ্রেণী তৈরি প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। এ সমস্যাগুলো সমাধান না করলে অচিরেই যে দ্বিতীয় ভাষা আন্দোলনে গরিবরা এগিয়ে আসবে না তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।
