বন্ডের মাধ্যমে উচ্চ সুদে বিদেশি ঋণ নেবে সরকার

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:০৪
ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ গ্রহণের পর এবার সরকার বিদেশি উত্স থেকে ঋণ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশিয় ব্যাংকগুলোতে তারল্য তীব্র হওয়ায় রাষ্ট্রকে গ্যারান্টি দিয়ে সরকার উচ্চ সুদে ৫০ কোটি ডলার ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এজন্য সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বন্ডের মেয়াদ, সুদের হার নির্ধারণসহ একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য তিনটি বিদেশি ব্যাংক এইচএসবিসি, সিটি ব্যাংক এনএ ও স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হয়েছে। জানা গেছে, দাতা দেশ এবং সংস্থাগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত ঋণ না পাওয়ার কারণে সরকার বন্ড ছাড়ার দিকে ঝুঁকেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, একটি দেশের আপদকালীন ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ রাখতে হয়। সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারলেই এ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদকে নিরাপদ মনে করা হয়। বর্তমানে পণ্য আমদানির প্রবাহ অনুযায়ী তিন মাসের আপদকালীন ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজন হয় ৯০০ কোটি ডলার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এখন রেকর্ড পরিমাণ এক হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ রয়েছে, যা দিয়ে আপদকালীন ব্যয় মেটানোর পরেও ৪০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থাকার পরেও সভরেন বন্ড ছেড়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা কতটুকু যুক্তি সঙ্গত হচ্ছে তা সরকারই ভাল বলতে পারবে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের (২০১২-২০১৩) বাজেটে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে মোট ২৫ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। এতে করে ব্যাংক খাতে সরকারের বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট থাকায় সরকার এ উত্স বাদ দিয়ে বিদেশি উেসর দিকে ঝুঁকছে। জানা গেছে, সরকারের আমদানি ব্যয় সামনে আরো বাড়তে পারে এ আশংকা থেকে বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে বিদেশি উত্স থেকে ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এর বাইরে আরো ৫০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা হচ্ছে। এজন্য দি ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, দি ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড, দি ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড ছাড়া হয়েছে। বন্ডগুলো গ্রাহকদের কাছে আকৃষ্ট করতে সুদের হারসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর চিন্তা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সভরেন বন্ড ছাড়ার কৌশল প্রণয়ন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে সভরেন বন্ড ছাড়ার জন্য একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ কৌশলপত্রের মধ্যে থাকবে বন্ডের মেয়াদ কত দিনের হবে, কী হারে ক্রেতা দেশকে সুদ দেয়া হবে এসব বিষয়। এজন্য বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় বন্ডের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কৌশলপত্র প্রণয়নের পর তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পেশ করা হবে। ওইসব বন্ডের আদলে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে রাষ্ট্রীয় বন্ড ছাড়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফসহ দাতা সংস্থা থেকে বৈদেশিক ঋণ কাঙ্ক্ষিত হারে অবমুক্ত হচ্ছে না। এজন্য বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ নির্ভরশীলতা কমাতে বৈদেশিক মুদ্রায় সভরেন বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান এ বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারবে না। শুধু বিদেশি ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান এতে বিনিয়োগ করতে পারবে। এজন্য একটি নীতিমালা দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। খুব শিগগিরই অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে সুপারিশ পেশ করা হবে। উল্লেখ্য, সার্বভৌম বন্ড একটি বিশেষ ধরনের বন্ড যা সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে বিক্রি করার অধিকার রাখে এবং এর মধ্যদিয়ে সেই রাষ্ট্র অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের ঘাটতি মোকাবেলায় কাজে লাগায়। বন্ড সাধারণত দু’ধরনের হয়। এর মধ্যে সরকারি বন্ড দেশের অভ্যন্তরে টাকায় কেনা-বেচা হয়, আর সার্বভৌম বন্ড কেনা-বেচা হয় বৈদেশিক মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাজারে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দেশ এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো এ বন্ড কিনতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশ সার্বভৌম বন্ড আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে ছেড়ে তার ব্যয়ের জন্য অর্থ যুগিয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আর্জেন্টিনা, গ্রীস। সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলংকা ও পাকিস্তান এ ধরনের বন্ড ছেড়েছে। তবে বাংলাদেশ এর আগে কখনো সার্বভৌম বন্ড ছাড়েনি ।