এক যুগেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি

বরিশালের সরকারি কলেজগুলো ছাত্রলীগের একক নিয়ন্ত্রণে

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:১৪
বরিশালের সরকারি কলেজগুলোতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। অধিকাংশ কলেজের ছাত্র সংসদের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পাসগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ছাত্রলীগের একক নিয়ন্ত্রণ। বিএম কলেজ ও শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদ পরিচালনার জন্য কয়েক জন ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে কর্মপরিষদ গঠন করে দপ্তর বণ্টন করা হয়। তা নিয়েও খোদ ছাত্রলীগের মাঝেও চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ছাত্রদলসহ অপর ছাত্র সংগঠনগুলো এ ভাবে কর্মপরিষদ গঠন করে ছাত্র সংসদ পরিচালনা অবৈধ বলে দাবি করে আসছেন। দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি বিএম কলেজ ছাত্র সংসদ (বাকসু) নির্বাচন সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০০২ সালের ১৩ আগস্ট। তখন ছাত্রদল নেতা মশিউল আলম সেন্টু ভিপি নির্বাচিত হন। ওয়ান ইলেভেনের পর সেন্টু র্যাবের ক্রস ফায়ারে প্রাণ হারায়। সেন্টুর মৃত্যুর আগে ছাত্র সংসদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও নির্বাচন হয়নি। বর্তমান সরকারের আমলে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে ছাত্র লীগের একাধিক গ্রুপ ও বাম ছাত্র সংগঠনগুলো নির্বাচনের দাবিতে ক্যাম্পাসে আন্দোলন গড়ে তোলে। এ নিয়ে একাধিকবার বিবাদমান ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে আন্দোলন ঠেকাতে ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে কর্ম পরিষদ গঠন করে ছাত্র সংসদ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। শুরুতেই কলেজ ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলসহ সকল ছাত্র সংগঠন এর বিরোধিতা শুরু করে। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে মামলাও করা হয়েছিল। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত এক মাসের মধ্যে কর্মপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে বাকসু নির্বাচনের শর্তে সময় সীমা বেঁধে দিয়ে কর্মপরিষদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি খারিজ করে দেয়। এক মাসের স্থানে এক বছর পর হলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন তো দূরের কথা কর্মপরিষদকে বহাল রেখেই চলছে কার্যক্রম। এরই মাঝে অধ্যক্ষ রদবদল নিয়ে সেই কর্মপরিষদের আন্দোলনেই প্রায় এক মাস ধরে অচল হয়ে আছে বিএম কলেজ। কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. ননী গোপাল দাসের বদলির প্রতিবাদে কর্মপরিষদ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। কলেজে যোগ দিতে আসা নতুন অধ্যক্ষ শংকর দত্তকে মারধর করে যোগদানে বাধা দেয় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। এখনো কলেজ ক্যাম্পাস কর্মপরিষদ সমর্থিত ছাত্রলীগের দখলে রয়েছে। শুধু বিএম কলেজ নয়, নগরীর অধিকাংশ কলেজ ক্যাম্পাসই ছাত্রলীগের দখলে রয়েছে। বিএম কলেজ ছাত্রদলের ও ছাত্রলীগের উভয় সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকায় ছাত্রদলের মতই ছাত্রলীগের এক গ্রুপ ক্যাম্পাস ছাড়া হয়েছে। ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের একাধিক নেতা জানান, একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারা প্রতি বছর নির্বাচন দাবি করেছেন। নির্বাচনের জন্য তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও রহস্যজনক কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। বিএম কলেজের অধ্যক্ষ ড. ননী গোপাল দাস নির্বাচন না দিয়ে তার তল্পিবাহক ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে কর্মপরিষদ গঠন করেছেন বলে অভিযোগ করেন ছাত্র নেতারা। তাদের অভিযোগ সোয়াশ’ বছরের প্রাচীন এই কলেজে ছাত্র সংসদ পরিচালনার জন্য কখনোই নির্বাচন ব্যতীত এ রকম কর্মপরিষদ গঠনের নজির নেই। অধ্যক্ষ ননী গোপাল সম্পূর্ণ তার স্বার্থে এ অগঠনতান্ত্রিক উপায় ছাত্র সংসদ পরিচালনার জন্য এ কমিটি করেছেন। ছাত্রনেতাদের অভিযোগ দেড় মাসের জন্য কমিটি গঠন করে অস্থায়ী কর্মপরিষদ নাম দেয়া হলেও এক বছর যাবত্ ঐ অবৈধ কমিটি বহাল রয়েছে। বিএম কলেজের সাবেক জিএস অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালক বলরাম পোদ্দার ইত্তেফাককে বলেন এ ধরনের কর্মপরিষদ গঠন করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অর্থ আত্মসাত্ ছাড়া অনির্বাচিত ছাত্র সংসদ আর কোন কাজ করতে পারেনি। অধ্যক্ষ ননী গোপাল দাস অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আলোচনা করেই অচল ছাত্র সংসদ সচল করতে তিনি কর্মপরিষদ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নির্বাচনের পরিবেশ না থাকায় এ বিকল্প পথে ছাত্র সংসদ সচল করা হয়েছে বলে ননী গোপালের দাবি। বিএম কলেজের চেয়ে আরো শোচনীয় অবস্থা সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ, সরকারি বরিশাল কলেজ ও ল’ কলেজের ছাত্র সংসদের। এ কলেজগুলোতে কোন কর্মপরিষদও নেই। এ সব কলেজের ক্যাম্পাসে কোন রাজনৈতিক উত্তাপ নেই। হাতেম আলী কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯ বছর আগে। নির্বাচনের জন্য বারবার দাবি তুললেও কলেজ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে তা আজ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বেশিরভাগ ছাত্র নেতা। এ ব্যাপারে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল ইসলাম বাপ্পি জানান, দলীয় নীতি নির্ধারকদের কাছ থেকে তারা নির্দেশ পেলে কলেজ কর্তৃপক্ষকে নির্বাচনের জন্য অনুরোধ জানাবেন। কলেজ ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সুজন জানান, নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় ঐ কলেজে ছাত্র রাজনীতি ধ্বংসের পথে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তারা বারবার কলেজ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানালেও নির্বাচনের ব্যাপারে তারা কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সহ-অবস্থানের রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে কলেজে সুষ্ঠু নির্বাচন চায় তারা। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, সকল সংগঠন ঐক্যবদ্ধ ভাবে নির্বাচন চাইলে তাদের কোন আপত্তি নেই। সরকারি বরিশাল কলেজের ছাত্র সংসদের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৩ সালে। সর্বশেষ ভিপি জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ আকন বিপ্লব জানান, কলেজ কর্তৃপক্ষ সহ অবস্থানের রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে ছাত্রদল সেই নির্বাচনে অংশ নেবে। বরিশাল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক ভিপি ফরহাদ বিন আলম জাকির জানান, তারা অচিরেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাবেন। তারাও সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন দেখতে চান। এ ব্যাপারে সরকারি বরিশাল কলেজের অধ্যক্ষ ইত্তেফাককে জানান, বিএম কলেজে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আমরা চিন্তা-ভাবনা করব। সে ক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক দল থেকে দাবি উত্থাপিত হলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তারও প্রয়োজন রয়েছে। ল’ কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মেয়াদ ২০০৩ সালে শেষ হয়। ২০০৫ সালে নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হলেও তত্কালীন সরকার দলীয় নেতারা তাদের প্রার্থী নির্ধারণে অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।