শোকের ছোঁয়ায় ঘাতক রোখার প্রত্যয়

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:১৮
ভাষা শহীদদের স্মরণে দেবদারু, অশ্বত্থ আর বটগাছের ডালে কালো ব্যানার। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ শেষে প্রভাতফেরি এসে থেমেছিল একুশের বইমেলার প্রবেশদ্বারে। এ পথ-সে পথ শেষে শহীদ মিনার হয়ে বাড়ি গেছে সবাই মেলা ঘুরে। আর এতেই সৃষ্ট হয়েছে মেলার ভেতর আরেক মেলার। সেটা মানুষের মেলা। মানুষের কোলাহল ঠেলে ভেসে আসছিল সেই কালজয়ী গানের সুর—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...।’ এর মাঝে শাহবাগ গণজারগণের মঞ্চ থেকে ভেসে আসছিল একাত্তরে সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে লাখো জনতার সমস্বরে শ্লোগান ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’। বাজছিল চেতনাদীপ্ত গণসঙ্গীত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সব শহীদদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এভাবেই মুখর ছিল বাংলা একাডেমীর অমর একুশের বইমেলা। সেই সঙ্গে ছিল একাত্তরে সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি ও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবি। ঘাতকদের রুখে দেয়ার প্রত্যয়। বই মেলায় আসা শিশুদের মুখমণ্ডলে আঁঁকা ছিল রঙিন বর্ণমালা, শহীদ মিনার, জাতীয় পতাকা। কালো পাড়ের সাদা শাড়ি পরে এসেছিলেন তরুণীরা। তরুণদের পাঞ্জাবিতেও ছিল শোকের কালো রঙ। সাদা-কালো শাড়ি, পাঞ্জাবি আর ফ্রক নিয়ে উত্সবমুখর সে মানুষের স্রোত এঁকেছিল সাদা-কালোর এক বিশাল ক্যানভাস। ক্যানভাসে ছিল বড় বড় সাদা আর কালো রঙের ‘অ-আ’ ‘ক-খ’ বর্ণমালা। মেলার দেয়ালগুলোর গায়ে সাঁটানো ভাষা আন্দোলনের সাদা-কালো আলোকচিত্র আরো বেশি শোকাবহ করে তুলেছিল মেলা প্রাঙ্গণ। ১৪৪ ধারা ভাঙার সে মিছিল, আমতলা দিয়ে বেরুনো মিছিলে তরুণ-তরুণী আর রক্তের অক্ষরে লেখা বর্ণমালা-সবখানেই ছিল বেদনার ছোঁয়া। প্রধান প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকতে সে চিত্রমালার সামনে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায় সবার পা। নত হয়ে আসে মাথা। শ্রদ্ধাবনত হয়েই ছোটে শোকাবিষ্ট মানুষের মিছিল। মেলায় যতনা ক্রেতা তারচেয়েও দ্বিগুণ ঘুরতে আসা মানুষের ঢল। সকাল ৮টায় মেলার দ্বার খুলে দেয়ার পর থেকে একটানা ১৪ ঘণ্টা ছিল মেলা আর বইপ্রিয় মানুষের স্রোত। সকাল থেকে শুরু হয়ে মানুষের স্রোত তীব্র হয়ে ওঠে সন্ধ্যায়। মেলার ভেতর ও বাইরের প্রাঙ্গণে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। দীর্ঘ সারি ছিল দুই পাশের প্রবেশদ্বারেই। সারি ধরেই ঘুরতে হয়েছে মেলার ভেতর। এমনকি বই কিনতেও স্টলের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে দীর্ঘ সারিতে। প্রকাশকরা বলছেন, আশানুরূপ বিক্রি হয়নি। তবে তারা খুশি মেলায় প্রচুর লোক সমাগম দেখে। প্রকাশকদের অভিমত, বিক্রি না হোক, মানুষ তো বইমেলায় এসেছে, বই দেখেছে। একদিন এসব মানুষই বই কিনবে। একুশ নিয়ে মানুষের এমন উচ্ছ্বাস দেখে সত্যিই মন ভালো হয়ে যায়। প্রকাশিত নতুন বইগুলোর মধ্যে বেশি বিক্রি হয়েছে, জ্ঞান বিতরণী প্রকাশনী থেকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন-এর ফখরুদ্দিন-মইন উদ্দিনকে নিয়ে লেখা ‘৬১৬ দিন’ গ্রন্থটি। অবসর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে গোলাম মুরশিদ-এর নারী প্রগতির একশো বছর ‘রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া’, বিশ্বসাহিত্য ভবন থেকে প্রকাশিত হয়েছে মোহাম্মদ হাননান-এর ‘ঢাকার রাজনৈতিক ইতিহাস’, শূচীপত্র থেকে এসেছে ফকরুদ্দীন মুন্না’র ‘টোলা মাষ্টার’, শিল্পতরু প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে হনুফা ইমদাদ-এর ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু’, পালক থেকে এসেছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেন এন ডি সি পি এস সি (অব.) এর ‘নির্বাচন কমিশনে পাঁচ বছর’, জাগৃতি থেকে এসেছে শেখ আবদুল হাকিম-এর সায়েন্স ফিকশন ‘জ্যান্ত অতীত’, অ্যাডন থেকে এসেছে আমির হোসেন-এর ‘যুদ্ধ ও প্রেম’।