জামায়াত নিষিদ্ধে আল্টিমেটাম

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২২
জনজোয়ারে ভেসে গেল শাহবাগ আন্দোলনের প্রজন্ম চত্বর। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের মহাসমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে জনতার স্রোত এসে মিশেছিল প্রজন্ম চত্বরে। জনতার সেই স্রোত কোটি কণ্ঠে দাবি জানালো যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের। এদিকে, লাগাতার আন্দোলন থেকে সরে এসে বিকাল তিনটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক সমাবেশ ও শুক্রবার প্রতিবাদ সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের নেতৃবৃন্দ। এছাড়া গণস্বাক্ষর কর্মসূচি চলতে থাকবে। গতকাল লাখো মানুষের উপস্থিতিতে প্রজন্ম চত্বরের মহাসমাবেশ থেকে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তরুণযোদ্ধারা। গতকাল মহাসমাবেশ থেকে আন্দোলনের নেতা ইমরান এইচ সরকার ৬ দফা দাবি ও ১১ দফা কর্মসূচি তুলে ধরেন। এই মহাসমাবেশ থেকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সৃষ্টিতে নতুন প্রজন্ম নতুন মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেয়। সারাদেশে গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টি করে আন্দোলন, ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ আয়োজন করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান তরুণরা। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়দাতা জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয় এ মহাসমাবেশ থেকে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল অনুষ্ঠিত হলো তৃতীয় সমাবেশ। একদিকে শহীদ দিবস একই দিনে আবার গণজাগরণ চত্বরে মহাসমাবেশ। মানুষের ঢল নেমেছিল প্রজন্ম চত্বরে। আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত দিয়ে। এরপর পবিত্র গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক থেকে পাঠ করা হয়। সব ধর্মের ধর্মগ্রন্থ পড়ে সমাবেশ শুরু :গতকাল সমাবেশ শুরুর আগে সব ধর্মের ধর্মগ্রন্থের উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠ করা হয়। এর আগে বক্তারা বলেন, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। জামায়াত-শিবির চক্র ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতিকে পুঁজি করে অপপ্রচার করছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। কোরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা মেহেদী হাসান, গীতা পাঠ করেন শ্রী সাধন চন্দ্র চক্রবর্তী, বাইবেল পাঠ করেন মাইকেল এশপ, ত্রিপিটক থেকে পাঠ করেন ড. বিমান চন্দ্র বড়ুয়া। জাতীয় সঙ্গীত ও একুশের গান পরিবেশনের পর শুরু হয় মহাসমাবেশের বক্তৃতা পর্ব। ‘যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবির লড়াইয়ে জিততে হবে’ গতকাল সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, কোন ষড়যন্ত্র করে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবি থেকে সরানো যাবে না। ফাঁসির দাবি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরব না। বক্তারা বলেন, আমাদের এ অহিংস আন্দোলনকে জামায়াত-শিবির চক্র যদি দুর্বলতা ভাবে তাহলে ভুল করবে। আন্দোলনের আহ্বায়ক ডা. ইকবালের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট-এর সভাপতি সাইফুজ্জামান, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি আব্দুর রউফ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল হাসান, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জু রহমান মিন্টু, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক হিল্লোল রায়, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তমাল, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তানভীর রুদ্র, বাংলাদেশ ছাত্রইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান তারেক, জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলাম, বাংলাদেশ ছাত্রঐক্যের সাধারণ সম্পাদক সোবাহান। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট-এর সভাপতি সাইফুজ্জামান বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জাতির এই ঐক্যবদ্ধতা কেউ ষড়যন্ত্র করে ভাঙ্গতে পারবে না। তিনি সরকারের প্রতি জামায়াত- শিবিরের রাজনীতি বদ্ধের দাবি জানান। বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি আব্দুর রউফ বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে সবসময় ধর্মকে ব্যবহার করেছে ধর্মব্যবসায়ীরা। জামায়াতের ধর্মকে ব্যবহারের এ রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। নিষিদ্ধ করতে হবে জামায়াতের রাজনীতি। বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জু রহমান মিন্টু বলেন, স্বাধীনতার ৪২ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে পুরো দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এই দাবি বাস্তবায়ন করে আমরা ঘরে ফিরব। এর কোন বিকল্প নেই। বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক হিল্লোল রায় বলেন, আমাদের ভয় পাওয়ার, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ নেই পিছু হটারও। আমাদের দাবি একটাই, তাহলো যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা। এই দাবি বাস্তবায়নে আমাদের সকল চাপ সহ্য করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জিততে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তমাল বলেন, আজকের তারুণ্য শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়বে। ইসলামের নামে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে জামাত দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজামী, গোলাম আযম, মুজাহিদ তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়াননি। আসলে ধর্ম ব্যবসায়ী গোষ্ঠী তাদের সুবিধার্থে ধর্মকে ব্যবহার করছে। তারুণ্যের জয় অবশ্যম্ভাবী মন্তব্য করে বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তানভীর রুদ্র বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না। বাংলাদেশ ছাত্রইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান তারেক বলেন, আমাদের এ আন্দোলন অহিংস। তবে একে যদি জামায়াত-শিবির চক্র দুর্বলতা ভাবে তাহলে ভুল করবে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরব না। এছাড়া রাজিবের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলাম বলেন, যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। কাদের মোল্লাসহ সকল রাজাকারের ফাঁসির দাবি কার্যকর করতে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণরা প্রমাণ করেছে, তারা মাথা নত করতে জানে না। আর এই তারুণ্যের উচ্ছ্বাস দেখে জামায়াত-শিবির ভয় পেয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্রঐক্যের সাধারণ সম্পাদক সোবাহান বলেন, জীবন দিয়ে হলেও রাজাকারের ফাঁসির দাবি কার্যকর করবো। ধর্ম ব্যবসায়ীরা ধর্ম নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল হাসান বলেন, সারাদেশ আজ যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তরুণরা চাইলে যে সব হয় এটা তারই প্রমাণ। তিনি জামায়াতের রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, ধর্মকে নিয়ে রাজনীতি করার অধিকার কারো নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফেরা হবে না বলে জানান। সংহতি অব্যাহত গতকালও প্রজন্ম চত্বরে এসে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠন যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে আন্দোলনরতদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে। গতকাল আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে উপস্থিত হয়েছেন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এমপি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, আসাদুজ্জামান নূর এমপি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, কবি অধ্যাপক আবদুস সামাদ, অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, ভাস্কর রাশা, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত কার্যনির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, কথাসাহিত্যিক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, তারিক আনাম খান, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, রোকেয়া প্রাচী, আফসানা মিমি, শহীদুজ্জামান সেলিম, মোহন খান, আহসান হাবিব, নাদিয়া। বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পী সারা যাকেরের নেতৃত্বে নাগরিক নাট্যাঙ্গনের কর্মীরা প্রজন্ম চত্ব্বরে এসে সংহতি প্রকাশ করেন। এর আগে সাংবাদিকদের একটি বড় দল এসে মহাসমাবেশে গণজাগরণে সংহতি প্রকাশ করে। এতে ছিলেন আবেদ খান, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, শ্যামল দত্ত, শাহ আলমগীর, নাদিম কাদির, জ ই মামুন, জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল, শহীদুল আজম, প্রভাষ আমিন, রাজু আহমেদসহ আরও অনেকে। সোনারগাঁও হোটেলের সামনে জড়ো হয়ে সেখান থেকে মিছিল নিয়ে আসেন তারা। মহাসমাবেশে মিছিল নিয়ে যোগ দিচ্ছিলেন আরও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাল গণজাগরণ মঞ্চ বায়ান্নের ভাষা শহীদদের প্রতি গোটা জাতির সাথে শ্রদ্ধাবনত হলো শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছেন আন্দোলনরতদের একটি দল। বুধবার দিবাগত রাত ১২টা ৫০ মিনিটে ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহবায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বে আন্দোলনরতরা শহীদ মিনারের মূল বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, ব্লগার মাহমুদুল হক মুন্সী, সুমন, লাকী আক্তার, শাওন। পুলিশের রক্তদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রজন্ম চত্বরে গতকাল রক্তদান কর্মসূচি পালন করে পুলিশ। সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ব্লাড ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল এ কর্মসূচির আয়োজন করে। গণজাগরণ মঞ্চে আগত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ রক্ত দান করেন। পুলিশ ব্লাড ব্যাংকের উপ-পুলিশ পরিদর্শক রনপ কুমার ভক্ত বলেন, পুলিশসহ সকল মানুষের সেবা নিশ্চিত করতেই আমাদের এই রক্তদান কর্মসূচি। এখানে যে কেউ রক্ত প্রদান ও রক্তের সন্ধান করতে পারেন। মহাসমাবেশের নিরাপত্তায় এসপিবিএন মোতায়েন শাহবাগের গণজাগরণ চত্বরে চলমান আন্দোলনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃংখলা বাহিনী শুরু থেকেই তত্পর রয়েছে। গতকাল আন্দোলনের ১৭তম দিনে প্রথমবারের মতো নিরাপত্তায় সংযুক্ত হয়েছে স্পেশাল সিকিউরিটি প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন (এসপিবিএন)। গতকাল দুপুর ২টার পর থেকে শাহবাগের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক পুলিশের নতুন এই ব্যাটালিয়ন সদস্যদের মোতায়ন করা হয়। এসপিবিএন’র এএসআই হুমায়ুন কবীর জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে তারা গণজাগরণ চত্বরের নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছেন। মহাসমাবেশের চার প্রবেশস্থল রূপসী বাংলা হোটেল, টিএসসি, কাটাবন মোড় এবং শিশুপার্ক এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন তারা। এছাড়াও মহাসমাবেশকে ঘিরে উঁচু ভবন, বারডেম হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘরের ছাদে বাইনোকুলার দিয়ে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করছেন।