রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধিমালা অনুমোদনকারী সর্বোচ্চ পর্ষদ সিনেট দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নিষ্ক্রিয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-১৯৭৩ অনুসারে সিনেট নির্বাচন ও কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। বর্তমান আওয়ামী লীগ সমর্থক প্রশাসনও এই অধ্যাদেশ কার্যকরের উদ্যোগ নেয়নি।
১৯৭৩-এর এ্যাক্ট অনুযায়ী ১০টি ক্যাটাগরিতে ১০৩ সদস্যের সিনেটে পদাধিকার বলে উপাচার্য সভাপতি, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রাজশাহী ও যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সদস্য। এছাড়া সরকার মনোনীত পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তা, স্পিকার মনোনীত পাঁচজন সংসদ সদস্য, চ্যান্সেলর মনোনীত পাঁচজন শিক্ষাবিদ, সিন্ডিকেট মনোনীত পাঁচজন গবেষণা সংস্থা প্রতিনিধি, শিক্ষাপরিষদ মনোনীত পাঁচজন কলেজ অধ্যক্ষ, শিক্ষাপরিষদ মনোনীত ১০ জন কলেজ শিক্ষক, রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট নির্বাচিত ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি, শিক্ষক নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ শিক্ষক প্রতিনিধি ও ছাত্রদের নির্বাচিত ৫ জন ছাত্র প্রতিনিধি থাকবেন। রাবি সিনেটের কলেজ অধ্যক্ষের ৫টি, কলেজ শিক্ষকের ১০টি, রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধির ২৫টি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কর্তৃক নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধির ৩৩টি পদের মেয়াদ অনেক আগেই উত্তীর্ণ হয়েছে। ছাত্র প্রতিনিধির ৫টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে পদাধিকার ও সরকার মনোনীত ২৫ জন সদস্য নিয়ে কোনমতে টিকে রয়েছে রাবি সিনেট। ১৯৯০ সালের পর রাবি কেন্দ ীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) নির্বাচন হয়নি। উপাচার্যও নির্বাচিত নন। গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে পরিচিত উত্তরাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ চলছে অনির্বাচিতদের দিয়ে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
১৯৭৩ এর রাবি অ্যাক্ট অনুসারে নির্বাচিত রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট, শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে সিনেট থাকবে। অথচ সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি পদে ১৯৯০ সালে; রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট পদে ১৯৯৪ সালের ২১ মার্চ; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রতিনিধি পদে ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ্যাক্ট অনুসারে নির্বাচিত সিনেট ও প্রতিনিধির মেয়াদ ৩ বছর। কিন্তু মেয়াদোত্তীর্ণ সদস্য নিয়ে বছরের পর বছর ধরে খুঁড়িয়ে চলছে রাবি সিনেট।
১৯৭৩-এর অ্যাক্ট অনুসারে উপাচার্য নিয়োগে তিন সদস্যবিশিষ্ট প্যানেল নির্বাচনের দায়িত্ব সিনেটের। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে নির্বাচিত তিনজনের এই প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য নিয়োগের জন্য চ্যান্সেলরকে সুপারিশ করবে সিনেট। রাবি সিনেটের সুপারিশে সর্বশেষ ১৯৯৮ সালের ১৯ জুন নির্বাচিত প্যানেল থেকে ১৯৯৯ সালের ৪ আগস্ট উপাচার্য নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. এম সাইদুর রহমান খান। সর্বশেষ সিনেট সভা হয় ২০০১ সালের ২৬ জুন তার আমলেই। সিনেটে প্যানেলে নির্বাচিত উপাচার্য ড. সাইদুর রহমান খানকে ২০০১ সালের ১২ নভেম্বর অব্যাহতির পর আর সিনেট সভা হয়নি। তত্কালীন চারদলীয় জোট সরকার অধ্যাপক ফাইসুল ইসলাম ফারুকী, অধ্যাপক ড. আলতাফ হোসেন-২ ও অধ্যাপক ড. মামনুনুল কেরামতকে এবং বর্তমান মহাজোট সরকার অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহানকে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য নিয়োগ করে। বছরে অন্তত একবার সিনেট সভা অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। কিন্তু নিয়োগপ্রাপ্ত চারজন উপাচার্য সিনেটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন এড়াতে গত ১৪ বছরে একবারও সিনেট সভা ডাকেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটও সিনেটের অনুমোদন ছাড়াই পাস হচ্ছে। এ্যাক্টে বলা আছে, সিনেটররা দাবি করলে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধ্য।
পরাজয়ের ভয়ে
নির্বাচন বন্ধ
পরাজয়ের ভয়ে উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান তার চার বছরের মেয়াদে সিনেট সভা আহ্বানের ঝুঁকি নেননি। অথচ ১৯৭৩ সালের অ্যাক্ট অনুসরণ করলে তার সিনেট কর্তৃক নির্বাচিত উপাচার্য হওয়ার সুযোগ ছিল।
রাবি প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সাবেক আহ্বায়ক অধ্যাপক শাহ্ নওয়াজ আলী মনে করেন, ‘গণতান্ত্রিক নিয়ম ও অধ্যাদেশ অনুযায়ী অবশ্যই নির্বাচন হওয়া উচিত। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে উপাচার্যদের বৈঠকের পর আশা করেছিলাম, শিগগিরই এ নির্বাচন হবে, কিন্তু হয়নি।’ বিএনপি সমর্থক প্রভাবশালী শিক্ষক অধ্যাপক এম রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা দীর্ঘদিন সিনেটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি। অস্থায়ী উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান বলেন, সিনেটের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের পর উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
