বাংলাদেশে প্রচলিত পঞ্জিকাগুলোতে শকাব্দ, বঙ্গাব্দ, খ্রিস্টাব্দ, সংবত্, হিজরি, ফসলি, আমলি, মগি, বগড়ি, ত্রিপুরাব্দ, স্ত্রী চৈতন্যাব্দ, কামরূপীয় শঙ্করাব্দ, বুদ্ধাব্দ, নানকাব্দ, ভারতীয় শকাব্দ প্রভৃতি অব্দের উল্লেখ রয়েছে।
শকাব্দ শালিবাহন মতান্তরে কনীষ্ক প্রবর্তিত অব্দ। এটি বঙ্গাব্দের চেয়ে ৫১৫ বছর পূর্বে আরব্ধ। সংবত্ রাজা বিক্রমাদিত্য কর্তৃক প্রচারিত অব্দ। এটি খ্রিস্টের জন্মের ৫৭ বছর পূর্বে আরব্ধ। শকাব্দ আবার দুরকম। বর্তমানে ১৯৩৪ শকাব্দ চলছে। সেইসঙ্গে চলছে ভারতীয় শকাব্দ ১৯৩৪/৩৫। চৈত্র মাস থেকে শুরু হয় এ শকাব্দ। নাম থেকেই বোঝা যায় শ্রীচৈতন্যাব্দ, বুদ্ধাব্দ, নানকাব্দ শ্রীচৈতন্য, বুদ্ধ ও নানকের জন্মের বা মৃত্যুর পরে তাদের অনুসারীগণ কেউ প্রবর্তন করে থাকবেন। সম্প্রতি শ্রী শ্রী অনুকূল ঠাকুরের অনুসারীদের মধ্যে অনুকূলাব্দ, শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর অনুসারীদের মধ্যে লোকনাথাব্দ— সেরূপ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণাব্দ, শ্রী শ্রী জগদ্বন্ধু সুন্দরাব্দ, শ্রী শ্রী সুধারামাব্দ প্রচলনের শুভেচ্ছা জাগ্রত হওয়াটাও স্বাভাবিক।
বাংলা সন সম্রাট আকবর প্রবর্তিত—এরূপ সিদ্ধান্তে একথাও বিদিত যে, আগে অগ্রহায়ণের ১ তারিখ থেকে শুরু হতো নববর্ষ। তা নামেও স্পষ্ট। অগ্র মানে প্রথম, হায়ন মানে বত্সর। অগ্রহায়ণ হচ্ছে হায়নের প্রথম। অন্যপক্ষে অগ্র অর্থ শ্রেষ্ঠ, হায়ন অর্থ ধান। সাধারণ্যে ধানের উত্পত্তি থেকে বছর গণনা হতো। এ সময়েই শ্রেষ্ঠ ধান হেমন্তিক ধান বা আমন ধান ফলতো। তবে বর্ষা শেষে সম্রাটের খাজনা আদায়কারীদের যাতায়াতে সমস্যা হওয়ায় সম্রাট আকবর শুষ্ক মৌসুমের বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস নির্ধারণ করেন খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে।
বাংলা সনের মাসগুলোর দিন সংখ্যা অনির্ধারিত। বাংলায় কোনো মাস ৩২ দিন, কোনো মাস ৩১ দিন, কোনো মাস ৩০ দিন, কোনো মাস ২৯ দিন। তাও আবার স্থিরিকৃত নয় যে, প্রতি বছর একই নিয়মে একটি নির্দিষ্ট মাসই কেবল ৩২ দিন বা ৩০ দিন হবে। দেখা যাচ্ছে ১৪১৮ সনের জ্যৈষ্ঠ মাস ৩১ দিন অথচ ১৪১৯ সনের জ্যৈষ্ঠ মাস ৩২ দিনে; তেমনি ১৪১৮ সনের আষাঢ় ৩২ দিনে হলেও ১৪১৯ সনে তা হয়েছে ৩১ দিনে। সেক্ষেত্রে খ্রিস্টাব্দের মাসের দিনগুলো নির্ধারিত। বাংলা মাস সনাতন জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে নির্ধারণ করা হয় বলে মাসের দিন সংখ্যার এমন বাড়তি-কমতি। কিন্তু বাংলা সনের মাসের এই দিন সংখ্যাকে নির্দিষ্ট করে দিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি বৈশাখ থেকে ভাদ্র—এ ৫ মাস ৩১ দিনে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র ৩০ দিনে নির্দিষ্ট করলেন। তবে অধিবত্সরের চৈত্রকে তিনি ৩১দিনে নির্ধারিত করলেন। এরশাদ সরকারের আমলে এ পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন এনে বাংলাদেশে সনাতন জ্যোতিষ শাস্ত্রীয় বাংলা দিনপঞ্জিকার পাশাপাশি এ দিন পঞ্জিকাটিও চালু হয়েছে। পঞ্জিকায় এর বিবরণে লেখা হয় ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি। পরিবর্তনে অধিবত্সর হিসেবে প্রচলিত খ্রিস্টীয় অধিবত্সরটিই অনুসরণ করা হচ্ছে। আর অধিবত্সরের চৈত্র মাসের পরিবর্তে ফাল্গুন মাসকে গ্রহণ করা হয়েছে। এক্ষণে আমাদের প্রস্তাব নতুন প্রচলিত এ অব্দকে ‘শহীদুল্লাব্দ’ নামকরণ করে পঞ্জিকার পাতায় ‘বাংলাদেশ’ স্থলে শহীদুল্লাব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘শহী.’ বা ‘শ.’ লেখা যেতে পারে। তাতে এই মহান মনীষীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ছাড়াও যে সুবিধাটা হবে, সেটা হচ্ছে একই দেশে প্রচলিত দুটি তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি মেটাতে খ্রিস্টীয় সন তারিখ মেলাতে হবে না। বরেণ্য জ্ঞানতাপস এ মনীষীর জন্ম ১৮৮৫ সন থেকে শহীদুল্লাব্দ শুরু করলে ১৪১৯ বঙ্গাব্দে শহীদুল্লাব্দ হবে ১২৮ শহী.। আশা করবো সংশ্লিষ্ট মহল তা কার্যকর করার ব্যবস্থা নেবেন।
ঢাকা
