বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ নতুন বিনিয়োগ করবে না

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৫১
বাংলাদেশে চালু থাকা সকল প্রকল্পের বাস্তবায়ন কঠোরভাবে তদারকি করবে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ নতুন বিনিয়োগ না করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। দাতাদের সূত্রে এ খবর পাওয়া গেছে। সমপ্রতি বাংলাদেশ সরকারের তরফে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থ না নেয়ার সিদ্ধান্ত আসার পরপরই বিশ্বব্যাংকের সদর দফতর থেকে তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা সংক্রান্ত নির্দেশনা আসে। কাছাকাছি সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে না যাওয়ার বিষয়টিও ঢাকা অফিসকে অবহিত করা হয়। এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন দায়িত্বশীল সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, কঠোর তদারকির বিষয়টি সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। এটা তাদের বিষয়। তবে তারা ইঙ্গিত দিচ্ছে বড় ধরনের কোন অবকাঠামো প্রকল্পে তারা আপাতত আর জড়াতে চায় না। সম্ভবত, পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে যা হয়েছে এটি তারই তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রেসিডেন্ট জিম ইয়াং কিমের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে ওয়াশিংটনের পথে রয়েছেন। যাওয়ার আগে তিনি বলে গেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যে বিশ্বব্যাংক যে ১২০ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সে অর্থ তিনি অন্য কোন প্রকল্পে দেয়ার অনুরোধ জানাবেন। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, তাদের সঙ্গে আমাদের সময় মেলেনি। সুতরাং আমরা সেখান থেকে সরে পড়েছি। সরে পড়ার পরে ১২০ কোটি ডলার রয়েছে, যেটা আমাদের ছিলো তা কিভাবে ব্যবহার করবো তা চিন্তা করছি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হয়েছে, এই অর্থ দ্বিতীয় পদ্মা সেতুতে দেয়ার জন্যে অনুরোধ জানানোর সম্ভাবনা রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। দাতাদের সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে সরকারের সঙ্গে ব্যাংকের তিক্ততা সৃষ্টির পর এক পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকের আগের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক গত বছর ব্যাংকের ঢাকা অফিস বন্ধ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে অবশ্য নানা আলোচনার পর তিনি সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। কিন্তু বাংলাদেশে চালু প্রকল্পগুলো ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের জন্যে তখন তৃতীয় পক্ষ দিয়ে তদারকির একটি কর্মসূচি চালু করা হয়। এই কর্মসূচির নাম দেয়া হয় ‘থ্রি এস’। এই ‘থ্রি এস’ কর্মসূচির প্রথম ‘এস’ - এর অর্থ হলো সেফগার্ড। এর মাধ্যমে একটি প্রকল্প তদারকির জন্যে বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়। দ্বিতীয় ‘এস’ - এর অর্থ হলো সিস্টেম। এর মাধ্যমে প্রকল্প তদারকির জন্যে সরকারের যে সব ব্যবস্থা আছে সেগুলোকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়। আর তৃতীয় ‘এস’ - এর অর্থ হলো সান শাইন। এর মাধ্যমে মূলত কোন ধরনের রাখ-ঢাক না করে স্বচ্ছভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। প্রকল্প সংক্রান্ত তথ্যাদি সবার জন্যে উম্মুক্ত করার ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রথমদিকে এ কর্মসূচিতে চারটি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অতি সমপ্রতি এই কর্মসূচিতে আরও তিনটি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ৩০টি চালু প্রকল্প রয়েছে। এতে অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। পদ্মা সেতু প্রকল্পে স্বল্প সুদে বিশ্বব্যাংকের ১২০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে গত বছরের জুন মাসে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল করে। পরে সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে গত সেপ্টেম্বর মাসে আবার ফিরে আসার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্বব্যাংক। তখন শর্ত দেয়া হয়, তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সহায়তা করতে বিশেষজ্ঞ দল পাঠাবে বিশ্বব্যাংক। সেই স্বাধীন দলটির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে অর্থায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বিশ্বব্যাংক। পর্যবেক্ষণ দলটি দুবার বাংলাদেশ ঘুরে যায়। দুদক পদ্মা দুর্নীতি নিয়ে মামলা করে। কিন্তু প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন (এফআইআর) নিয়ে বিশ্বব্যাংকের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ দলটির সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ দলটি সন্দেহভাজন কয়েকজনকে এফআইআর থেকে বাদ দেয়ার কারণসহ দুদকের কাছে আটটি প্রশ্নের জবাব চেয়ে পাঠায়। এসব প্রশ্নের জবাবও পাঠায় দুদক। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই গত মাসের শেষে পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের জন্যে বিশ্বব্যাংককে করা অনুরোধ ফিরিয়ে নেয় বাংলাদেশ।