জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই শীত-গ্রীষ্মের পালাবদল ঘটছে আকস্মিকভাবে। এই ক’দিন আগে অর্থাত্ মাঘের শেষেও গ্রামাঞ্চলে ছিল হাড় কাঁপানী শীত। গ্রামবাংলা জুড়ে ছিল শীতের আবহ। চারদিকে সৌরভ আর মিষ্টতা ছড়িয়ে শীত জানাচ্ছিল তার উপস্থিতি। অগ্রহায়ণ, পৌষ বা মাঘ কোন মাসকেই মধুমাস না বলা হলেও শীতের এই সময়গুলো এখন বাংলাদেশে মধুমৌসুমে পরিণত হয়। সরিষাফুলের হলদে আভা, সুগন্ধ আর মৌমাছির মধু সংগ্রহের ব্যস্ততায় গ্রামের মাঠগুলো সেজে ওঠে অন্য এক সাজে। মাঠের পর মাঠ সরিষার আবাদ। বিস্তীর্ণ হলুদ প্রান্তর। আর এর হলুদের ভেতরেই অগণিত মৌমাছির স্বশব্দ বিচরণ। এ যেন মৌমাছিরই রাজ্য। গত কয়েক বছরে দেশে সরিষা আবাদের সঙ্গে মৌচাষ বিষয়টি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। সরিষা ক্ষেতে মৌ কলোনী স্থাপন করা হলে সরিষার ফলন বাড়ে, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর এদিকে কৃষকেরও ব্যাপক আগ্রহ। প্রতি বছর এ মৌসুমে দুর দুরান্ত থেকে মৌয়ালরা আসেন সরিষা চাষ এলাকায়। বলা যেতে পারে ভ্রাম্যমান মধু সংগ্রহকারী। তারা প্রতি মৌসুমেই দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়ায় মৌমাছির খাদ্যের সন্ধানে। মৌমাছি মধু পান ও সংগ্রহ করে। কখনো সরষে ফুল, কখনো ধনিয়া, কখনোবা লিচু এক এক মৌসুমে এক এক জায়গায় বিচরণ। উদ্দেশ্য একটাই, মধূ আহরণ। বছর কয়েক আগে আব্দুর রাজ্জাক মাত্র কয়েকটি বাক্স নিয়ে শুরু করেন মৌ চাষ। বছর দশেক আগের কথা। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এসব মৌআলদের মধু সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র ছিল সুন্দরবন । সেখানে বছরের একটি বিশেষ সময়ে মধূ আহরণ করা যেত। বাকী সময় একদিকে তারা থাকতো কর্মহীন, পাশাপাশি মৌমাছির খাদ্য যোগাতেও ব্যয় করতে হতো বাড়তি অর্থ। কিন্তু এখন সেই দিন আর নেই। এখন বছরের অধিকাংশ সময়ই কোন না কোন ফুলের মৌসুম। আর এসব মৌসুমে ছুটে বেড়ায় জোয়ান বৃদ্ধ সব বয়সের উদ্যোক্তা। মৌ চাষী কল্যাণ সমিতির এক হিসেবে দেখা গেছে দেশে এখন বাণিজ্যিক মৌ চাষীর সংখ্যা ২ হাজার ২’শ জনের মতো। এর মধ্যে ১ হাজার ৪’শ জন ভ্রাম্যমান মৌ চাষী।
দেশে বহু বেকার রয়েছে যারা মধু চাষে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে। এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। মৌচাষিরা নিজেদের উন্নয়নের স্বার্থেই সংগঠিত হয়েছেন। একজন অন্যজনের সহায়ক হয়ে উফেছেন। পাশাপাশি এই খাতকে এগিয়ে নেয়ার জন্যও রয়েছে তাদের নানামুখি উদ্যোগ। এখন মৌ চাষীরা স্বপ্ন দেখেন, সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন এদেশে উত্পাদিত মধু রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা আয় করা যাবে। ইতোমধ্যেই কৃষি দিবানিশি অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রচারণা ও মৌ চাষীদের সক্রিয় উদ্যোগের কারণে এই শিল্পের সম্ভাবনা সরকারের দৃষ্টিতে এসেছে। দেশে মধু শিল্প তথা মৌচাষকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যে দুয়েকজন সংগঠক ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন তাদেরই একজন সাতক্ষীরার এবাদুল্লাহ আফজাল। কথা হলো তার সঙ্গে। বর্তমান সময়ে দেশে বছরে উত্পাদিত হয় প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন মধু। এবারও লক্ষ্যমাত্রা এমনই ছিল। কিন্তু আশাব্যঞ্জক বিষয় হচ্ছে কোন কোন এলাকায় দুই ও তিন দফায় স্বল্পমেয়াদী ফসল সরিষা আবাদের কারণে, এবার মধুর উত্পাদন দেড়গুণ বেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এবার দেশব্যাপী ৬ হাজার মেট্রিক টন মধু উত্পাদনের। বাংলাদেশ মৌ চাষী কল্যান সমিতির সভাপতি এবাদুল্লাহ আফজাল বলেছেন, মধুর উত্পাদন ৮ হাজার মেট্রিক টনে পৌছে যেতে পারে। মধু সংগ্রহ ও এর বাণিজ্যিক বিষয়গুলো সম্পর্কে দেশের সরিষা ও মধু উত্পাদনবহুল জেলাগুলোর প্রশাসনও এখন অনেকটা অবগত। সব মিলিয়েঅনেক দূরই এগিয়ে গেছে মৌ চাষ শিল্প। আমদানিকৃত মধুর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় মধুর ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য বহুদিন ধরেই আহ্বান জানিয়ে আসছেন চাষী ও ব্যবসায়ীরা। পরিবার পর্যায়ে খাদ্য উপকরণেই ব্যবহার নয় শুধু, বিভিন্ন শিল্প উত্পাদনেও মধুর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ইতোমধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মৌ চাষ উন্নয়ন প্রকল্প নামে সরকার একটি প্রকল্পও গ্রহণ করেছে। পাঁচ বছর মেয়াদী ওই প্রকল্প শুরু হয়েছে গত জুলাই ২০১২ তে শেষ হবে ২০১৭ সালের জুন-এ।
