মারুফ বেশ চমত্কার একটা শিরোনাম লিখেছে। ‘ভানুমতির খেল!’ আজকাল তার কাছে নিজের সবকিছুই চমত্কার মনে হয়। লেখা তো বটেই; খেলাধুলা কিংবা কোনো একটা প্রোগ্রামে গান বা বক্তব্য—সে মনে করে তার সবকিছুই চমত্কার হচ্ছে। সব মিলিয়ে মারুফ নেতা না হলেও নেতাদের গুণাবলি তার ভেতর পয়দা হতে শুরু করেছে। নেতাদের সবকিছুই যেমন চমত্কার, সঠিক ও নির্ভুল; তেমনি তারও! পৃথিবীর যত দেশ আছে, যত দল আছে, মতবাদ আছে; সবাই নিজেকেই শ্রেষ্ঠ বলে ভাবে। আর অন্যেরটা ভুল; শুধু ভুল নয়, একেবারেই ভুল—আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার মতো আর্বজনা। বিশ্বনেতারা ভাবেন, তাদের জন্য পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, চমত্কার চলছে। নেতাদের ভাষায় পৃথিবী খরস্রোতা নদীর স্রোতের মতো সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী যেন একটা লঞ্চ, আর মানুষ সে লঞ্চের যাত্রী। ভেসে চলা বাহনে প্রকৃতিপ্রেমী জনগণ সারাক্ষণ আনন্দে গান করে, ‘ওরে নীল দরিয়া, পানি খাব পেট ভরিয়া!’ মারুফ ভাবে, দোষ হোক বা চমত্কার কোনো গুণ হোক, এটা সত্য যে, আমরা কবির প্রত্যাশাকে অপূর্ণ রেখে কথায় বড় হয়েছি। বড় হয়েছি প্রতিহিংসায়। একবার মারুফ একটা ভিন্ন ধরনের দেয়াল পত্রিকার সন্ধান পায়। মারুফকে দেয়াল পত্রিকাটি দেখাতে এক সরকারি অফিসে নিয়ে গিয়েছিল হাফিজুর। সেখানে গিয়ে মারুফ বলল, ‘পত্রিকা কই?’ হাফিজুর তাকে বাথরুমে নিয়ে যায়। বাথরুমে ঢুকে সে অবাক! চার দেয়াল ভরে লেখা। কত লেখা! আমি সামান্য বর্ণনা দিই (ওপর থেকে)—
মল ত্যাগ করিবার সময় ধূমপান করিবেন না :শিমুল
শিমুল একটা গাধা :রাতুল
উপরের তিন শব্দ যে লিখিয়াছে সে একটা গরু :শিমুল
আমি গরু না তুই গরু :রাতুল
ভালো উপদেশ যার সহ্য হয় না সে শুয়োরের চেয়েও নিকৃষ্ট :শিমুল
ওরে শিমুল ... ওরে ...-এর বাচ্চা! :রাতুল।
মারুফ আর সামনে অগ্রসর হয়নি। অগ্রসর হওয়াটা সম্ভবত ঠিকও হতো না। দেয়াল ভরা লেখা দেখে একটা সম্পাদকীয় লিখতে ইচ্ছা হচ্ছিল তার! লেখা হয়নি। ছোট করে দু-এক লাইন এভাবে লিখলে হতো :লেখালেখির এ অদ্ভুত চর্চা দেখে আমি আবেগাপ্লুত, অবাক বিস্ময়ে শুধু ভাবছি, রবীন্দ্রনাথরা কেন এত বড় হলো?
একটা চাপাবাজি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিযোগিতার শ্রেষ্ঠ চাপাবাজকে নিয়ে বানানো হবে টেলিফিল্ম! মারুফ হাজির হলো সেই প্রতিযোগিতায়।
প্রথম প্রতিযোগীর গল্প :গাছে ওঠার এক প্রতিযোগিতা (কে কত দ্রুত উপরে উঠতে পারে) হচ্ছিল, আমিও ছিলাম সে প্রতিযোগিতায়। প্রতিযোগিতা শুরু হলো। আমি উঠছি সবার চেয়ে দ্রুত। কিছুক্ষণ পর হঠাত্ করে খেয়াল করলাম, গাছের মাথা পেরিয়ে আরো বিশ হাত উপরে উঠে গেছি!
দ্বিতীয় প্রতিযোগী :এই তোমার গল্প! শোনো আমার কাহিনি—একবার সিমেন্টের ব্যাগে পঞ্চাশ কেজি আটা নিয়ে বাড়ি ফিরছি। ব্যাগটা একটু ছেঁড়া ছিল। সেই ছেঁড়া দিয়ে অল্প অল্প আটা বেরুচ্ছিল। আমি শ্বাস টানি আর বিড়ির ধোঁয়ার মতো আটা আমার নাকের মধ্যে ঢুকে যায়। শ্বাস টানি, আর নাকের মধ্যে আটা ঢুকে যায়। বাড়ি এসে দেখি ব্যাগে আটাই নেই। ওজন মেপে দেখি আমার ওজন পঞ্চাশ কেজি বেড়ে গেছে।
মারুফ ছিল তৃতীয় প্রতিযোগী। গম্ভীর ভাব নিয়ে সে স্টেজে গেল। থমথমে গলায় বলল, আমি লেখক মানুষ, আপনাদের মতো পালোয়ান নই। বহুকাল বাংলা সাহিত্যে কেউ নোবেল পায়নি। কেন পায়নি জানেন? আমি আসিনি বলেই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্পটা এতদিন ইচ্ছা করেই লেখা হয়নি। কথা দিচ্ছি, আমার কলম আজ তা প্রসব করবে।
