শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সাক্ষী রেখে আন্দোলনের শপথ

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৪
রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের স্থানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার শপথ নিলেন ছাত্র-জনতা। গতকাল শনিবার রায়েরবাজার বধ্যভূমি লাল-সবুজ পতাকায় বর্ণিল হয়ে উঠেছিল। দেশের মানুষ এখানে আসেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে। বলতে আসেন ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না।’ শত নির্যাতন সহ্য করে মৃত্যুকে পর্যন্ত আলিঙ্গন করে যে বুদ্ধিজীবীরা দেশমাতৃকার সম্মান নষ্ট হতে দেননি—তাদের সেই প্রেরণায় উজ্জীবিত তারুণ্য শপথ নিলেন গতকাল। শপথে তারা উচ্চারণ করেন, রাজাকার-আলবদরদের মৃত্যুদণ্ড না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব। জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ও তাদের নাগরিকত্ব বাতিল না করা পর্যন্ত রাজপথে- অনলাইনে সোচ্চার থাকবো। পঁচাত্তরের পরে যে যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তাদের বিচারের দাবিতে কাজ করবো। ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা, ফোকাস, রেটিনা কোচিং বয়কট করবো। যেসব সংগঠন শিশুদের মাঝে স্বাধীনতাবিরোধী বিষবৃক্ষ বপন করছে সেগুলোও বয়কট করবো। যুদ্ধাপরাধীদের মদদদাতাদের কোনো পত্রিকা অফিসে বা বাসায় রাখবো না প্রভৃতি। বক্তৃতায় ছাত্রনেতারা বলেন, ধর্ম অবমাননার ধুয়ো তুলে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের দোসররা। জামায়াতকে প্রতিহত করা মানে ধর্মকে প্রতিহত করা নয়। নেতৃবৃন্দ ধর্ম ব্যবসায়ীদের এসব চক্রান্তকে রুখে দেয়ার আহ্বান জানান। এর আগে মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো বধ্যভূমি এলাকা। রাজাকারদের ফাঁসির দাবি জানিয়ে গণজাগরণের সমাবেশে যোগ দেন স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা। এক পর্যায়ে আন্দোলনে শরীক হন কাদের মোল্লার নির্যাতনের শিকার ও তার বিরুদ্ধে মামলার সাক্ষী আনোয়ারা খাতুন। তিনি কাদের মোল্লার নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরে সরকারের কাছে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি জানান। শাহবাগের গণজাগরণ চত্বর থেকে পূর্ব ঘোষিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে রায়ের বাজার বধ্যভূমির গণজাগরণ চত্বর যেন লাল-সবুজের পতাকা মেলার রূপ পেয়েছিল। সমাবেশে যোগ দিতে আসা আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল সবুজ জমিনের ওপর রক্ত লাল সূর্যখচিত ১৬ কোটি বাঙালির প্রিয় পতাকা। সমাবেশের যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই যেন লাল-সবুজের খেলা। গতকালের এ সমাবেশে ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকারের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তানভীর রুস্তম, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক হিল্লোল রায়, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তমাল, জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলাম, বাংলাদেশের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর রহমান, ছাত্র সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক সালমান খান, ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রেসিডেন্ট সামিয়া রহমান প্রমুখ। সবশেষে ইমরান এইচ সরকার উপস্থিত জনতাকে শপথ বাক্য পাঠ করান। গতকালের এ সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করেন স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ফজলে নূর তাপস এমপি, উদীচী, খেলাঘর, ব্যারিস্টার শাহদীন মালিক। এছাড়াও অসংখ্য সংগঠন এ সমাবেশে যোগ দেয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- প্রজন্ম ’৭১, ছায়ানট, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, শ্যামলী ক্লাব, ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট স্কুল, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি স্কুল এন্ড কলেজ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ যুব কল্যাণ সংগঠন, রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী গণজাগরণ মঞ্চ, আনন্দদ্যুতি খেলাঘর আসর, চন্দ্রালোক ও সূর্যালোক খেলাঘর আসর প্রভৃতি। অবিচল শাহবাগ সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিসহ ছয় দফা দাবিতে অবিচল রয়েছে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলন। প্রজন্ম চত্বর থেকে গণজাগরণ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ও দেশের সকল জেলায় ছড়িয়ে দিয়েছেন তরুণরা। গতকাল শনিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শাহবাগে একদিকে চলেছে গণস্বাক্ষর অভিযান অন্যদিকে চলেছে জনতার শ্লোগান। গতকাল সকাল থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শাহবাগ মোড়ে আন্দোলনরতরা অবস্থান নেননি। শাহবাগে আগত জনতা বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে জাতীয় জাদুঘর ও গণগ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেন। তারা নিয়মিত বিরতিতে শ্লোগান দিতে থাকেন। দুপুর দেড়টার পর জনতার একটি গ্রুপ শাহবাগ মোড়ের ফোয়ারা সংলগ্ন সড়কে অবস্থান নেয়। সকাল থেকে রাতভর তারা সেখানে শ্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় মাইক ব্যবহার না করেও জনগণ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দাবি করেন। সন্ধ্যার পর মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। রাতে শ্লোগানে মুখরিত হয় প্রজন্ম চত্বর। শাহবাগে অবস্থানরতরা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত সাফল্য আসবে না। তাই তারা ঘরেও ফিরে যাবেন না। এর আগে গতকাল দুপুর একটা থেকে দুইটার মধ্যে প্রজন্ম চত্বর থেকে আন্দোলনরতদের কয়েকটি গ্রুপ পৃথকভাবে পতাকা মিছিল নিয়ে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে যান। রায়ের বাজারমুখী তারুণ্যের হাতে ছিল লাল-সবুজের পতাকা, কণ্ঠে ছিল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামায়াত-শিবিরসহ সকল ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধের দাবি। রায়ের বাজারে সমাবেশ শেষে আন্দোলনরতরা আবারো শাহবাগ এলাকায় জমায়েত হন। গণস্বাক্ষরে অংশ নেন সবশ্রেণির মানুষ গণজাগরণ মঞ্চের ছয় দফা দাবির পক্ষে সমর্থন জানিয়ে গণস্বাক্ষর অব্যাহত রেখেছেন সর্বস্তরের মানুষ। গতকাল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শাহবাগে গণস্বাক্ষরে অংশ নেন কিশোর-তরুণ-যুবা-বৃদ্ধসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ। তরুণদের আন্দোলনের সাথে গতকাল শাহবাগে এসে একাত্মতা জানান এবং দাবির পক্ষে স্বাক্ষর করেন বিশিষ্টজনরাও। গতকাল গণজাগরণ মঞ্চে এসে সংহতি জানান এবং গণস্বাক্ষরে অংশগ্রহণ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, অ্যাডভোকেট তারানা হালিম এমপি, অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী মনোরঞ্জন ঘোষাল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইকবাল আর্সলান, সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক শরফুদ্দিন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া, অধ্যাপক জাকারিয়া স্বপন প্রমুখ। সন্ধ্যায় প্রজন্ম চত্বরে এসে নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বলেন, বিএনপির এক নেতা গণতন্ত্র মঞ্চ করার ঘোষণা দিয়েছেন। ঐ মঞ্চ মূলত হবে রাজাকার মঞ্চ। কেননা বিএনপি জামায়াত-শিবিরের হরতালে সমর্থন দিয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, জামায়াত-শিবিরের হামলায় শহীদ রাজীব হায়দার, জাফর মুন্সী, বাহাদুর মিয়া, কিশোর রাসেল মাহমুদ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সাতদিনের মধ্যে গ্রেফতার করা, আগামী ২৬ মার্চের পূর্বে স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক সন্ত্রাসী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যায় নেতৃত্বদানকারী জামায়াতে ইসলামের বিরুদ্ধে সংশোধিত আইনের অধীনে অভিযোগ গঠন এবং এই দলটিকে নিষিদ্ধ করতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা, অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধী সংগঠনগুলোর আর্থিক উত্স—যেসব উত্স থেকে সকল প্রকার জঙ্গিবাদী এবং দেশবিরোধী তত্পরতায় আর্থিক যোগান দেয়া হয়, সেগুলো চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া গতিশীল ও অব্যাহত রাখতে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে স্থায়ী রূপ দেয়া, গণমানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও তাণ্ডব বন্ধে অবিলম্বে আইন-শৃংখলা বাহিনীকে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে সকল সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ গোপন আস্তানাসমূহ উত্খাত করা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এদের ভয়ংকর রূপ প্রকাশ করা, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষক এবং হত্যা ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিদাতা গণমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া। চলেনি যানবাহন মহাসমাবেশের পর গত বৃহস্পতিবার রাতে শাহবাগ মোড় থেকে গণজাগরণ মঞ্চ জাতীয় জাদুঘরের সামনে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন মঞ্চের সংগঠকরা। শুক্রবার দুপুর ১২টায় শাহবাগ মোড় আন্দোলনকারীশূন্য হয়ে পড়ে। কিন্তু জুমার নামাজের পর জামায়াত-শিবির-ইসলামী দলগুলোর তাণ্ডবের পর আবারো শাহবাগে অবস্থান নেয় তারুণ্য। ফলে দুপুর সাড়ে ১২টায় শাহবাগ মোড় দিয়ে যান চলাচল শুরু হলেও বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আবারো তা বন্ধ হয়ে যায়। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টায় সড়ক ছেড়ে জাদুঘরের সামনে অবস্থান নেন তারুণরা। গতকাল দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শাহবাগ মোড় আন্দোলনকারীশূন্য ছিল। জাদুঘর ও গণগ্রন্থাগারের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে শ্লোগান দেয় জনতা। ঐ সময়ও শাহবাগের মোড় দিয়ে কোনো যান চলাচল করেনি। চারদিকের সড়কেই পুলিশ অস্থায়ী কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে রাস্তা বন্ধ রেখেছে। রাত পর্যন্ত শাহবাগ মোড় দিয়ে কোনো যান চলাচল করেনি।