বাহান্নোর ভাষা আন্দোলন ও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাঙালী নারীর সেই প্রতিবাদী ভাবমূর্তি আবার সারাবিশ্বের কাছে উদ্ভাসিত হল শাহবাগের প্রজন্ম চত্ত্বরের গণজাগরণের মধ্য দিয়ে। প্রায় তিন সপ্তাহব্যাপী বহমান শাহবাগের এই আন্দোলনকে চাঙ্গা রেখেছে নারীদের জ্বালাময়ী কণ্ঠের স্লোগান। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পুরুষের পাশাপাশি এক মঞ্চে স্লোগান দিয়ে নারীরা বীরের মত নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, এই আন্দোলনের প্রাণ মূল যারা স্লোগান দিচ্ছেন তারা। এবং এই স্লোগান দিচ্ছেন মূলত নারীরা তথা স্লোগান কন্যারা। স্লোগানকন্যা লাকি আক্তারের পাশাপাশি দিন-রাত স্লোগানের ঝড় তুলেছে মুক্তা বাড়ৈ, প্রগতি বর্মন, সুষ্মিতা রায় সুপ্তি, জয়শ্রী রায়, তানিয়া, সামিয়া রহমান, উম্মে হাবিবা বেনজির, তানজিদা তুবা প্রমুখ। তাদের এই স্লোগানে অনুপ্রাণিত হয়ে আন্দোলনের এক অগ্নিময়ী শিখা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশের প্রতিটি মানুষের মনে। যু্দ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত সে আগুন নেভবার নয়। শুধু স্লোগান দিয়ে নয়, আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশের লক্ষ্যে নারী-শিশুদের দিন রাত নির্বিশেষে শাহবাগে উপস্থিতি ছিল এ যুগের জন্য অতি প্রয়োজনীয় দৃষ্টান্ত। সারাদিন, এমনকি সন্ধ্যার পরও নারীরা শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও তাদের কাউকে কখনো পুরুষদের কাছ থেকে সহ্য করতে হয়নি কোন প্রকার লাঞ্ছনা বা উত্ত্যক্ততা। সমাবেশে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হলেও নারীদের মুখোমুখি হতে হয়নি কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনার। তাদের জন্য প্রয়োজন পড়েনি কোন আলাদা নিরাপত্তার। বরং প্রজন্ম চত্বরে এসেই নারী-শিশুরা ফিরে পেয়েছে তাদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সেই সাহস ও নিরাপত্তা। এখানে নারী-পুরুষ নিবির্শেষে সমবেত হয়ে পরিণত হয়েছে এক অপরাজেয় শক্তিতে। যারা মনে প্রাণে এক, যাদের লক্ষ্যও এক। তাই সংগ্রাম এগিয়ে চলেছে একই গতিতে। একাত্তরে যে লক্ষ্য নিয়ে জন্ম বাংলাদেশের, তাকে পরিণতি দেওয়ার নতুন প্রত্যয় নিয়েই মত্ত এই নবীন প্রজন্মের তরুণ তরুণীরা।
গত বুধবার বিকেলে প্রায় ২৫ হাজার নারী যোগ দেয় এই গণজাগরণে। প্রায় ৩০টি নারী সংগঠনের ব্যানারে এই নারীরা যোগ দেয় গণজাগরণ মঞ্চে, ৩০টি সংগঠনের মধ্যে ছিল ব্রতি, নিজেরা-করি, মহিলা-পরিষদ, মহিলা আইনজীবী পরিষদ প্রমুখ। প্রজন্ম চত্বরে প্রতি মুহূর্তে সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন স্লোগানের। রাত দশটা বারটা পর্যন্ত দেখা গেছে চাকরিজীবী, গৃহবধু নারীদের উপস্থিতি। সমাবেশে স্লোগানের মধ্যে নারীদের কণ্ঠ ছিল বেশি সরব। সারাদিনের অফিসের ক্লান্তি কর্মজীবী নারীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিন চার বছরের শিশুকে নিয়েও চলে এসেছে তাদের মায়েরা। স্লোগানে মায়ের সাথে, তার কোলে বসে গলা মিলিয়েছে চার বছরের কন্যাটিও। মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু কিশোর-কিশোরী অকালে প্রাণ দিয়েছে, আমাদের মনে জমে রয়েছে শুধু সে সময়ের দঃখের স্মৃতি। যা এই সময়ের বুকে এক ক্ষত, এই নগরীর বুকে এক ক্ষত। বহু মা এই নতুন প্রজন্মের নারীদের মধ্যে খুঁজে পায় যুদ্ধে শহীদ হওয়া তার নিজ সন্তানের চেহারা। তাদের স্মরণ করে বহুকাল পর তাদের কাছে পাঠায় চিঠি। একজন মা বলছিলেন তার আট বছর বয়সী মেয়েকে গাছ থেকে ফেলে দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করেছিল। বহুদিন পর নিজ মেয়ের কাছে চিঠি লিখতে গিয়ে সেই মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। আশেপাশের স্কুল ছাত্রীরাই তখন তার মেয়ের মত পাশে এসে দাঁড়ায়। সকাল থেকে প্রতিদিনই প্রজন্ম চত্বর ছিল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রীদের স্লোগানে মুখর। ভিকারুননেসার কিছু ছাত্রী বলেন-এই সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে পেরে তারা গর্বিত। পরীক্ষা সামনে থাকলেও এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার পথে তা কোন বাধা হতে পারেনি, আবার পড়াশোনার পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের এক ছাত্রী বলে, ‘বইমেলা, পহেলা বৈশাখ, বাণিজ্য মেলার মত অনুষ্ঠানে গিয়ে এতটা দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারতাম না যতটা এখানে রয়েছি’। বহুদিন পর নির্ভয়ে চলার ও নিজ দাবী প্রকাশের জায়গা খুজে পেয়ে ছুটে এসেছে সব প্রজন্মের, সব বয়সের নারীরা এই শাহবাগ চত্বরে। প্রজন্ম চত্বরে সবাই যেন ভাই বোন। এই আন্দোলন সবার মনে এনে দিয়েছে পবিত্রতা। তীরন্দাজ নাট্যদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য বিভাগসহ আরও অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন এর পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছে তাদের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি। এসব দলে নারীদের মধুর কণ্ঠের গান, কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। বহু বাবার কাঁধে বসে তার শিশু কন্যা, হাতে মোমবাতি প্রজ্বলনের মধ্যে দিয়ে জ্বালিয়ে রেখেছে চেতনার শিখা। পরবর্তী প্রজন্মের শিশুরা সংগীতের সাথে একাত্ম হয়ে উপলব্ধি করছে নতুন প্রজন্মের এই সংগ্রামকে।
