মাটির ভিটা। মাটির দেয়াল। উপরে টিনের চালা। সব মিলিয়ে মাটির ঘর। ঘরের সামনে বারান্দা। সেই বারান্দার একপাশে ছোট্ট তাঁত। মাঝ বয়সী এক নারী সেই তাঁতে বুননের কাজ করছেন। বারান্দার অন্যপাশে আরেকজন মাঝ বয়সী নারী চরকায় সুতা মোড়াচ্ছেন। কেবল এই ঘরের বারান্দা নয়, এখানকার প্রায় প্রতিটি ঘরের বারান্দায় দেখা যাবে তাঁতে কাপড় বুননের এই দৃশ্য। মূলত তারা গামছা বুনছেন। আর এই গামছা বুননের তাঁতি পাড়াটির অবস্থান- খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার আলকা-দামোদর গ্রামে। কারিকর পাড়া হিসেবেই সবার কাছে বেশি পরিচিত গামছা বুননের এই তাঁতি পাড়াটি এবং এই তাঁত পাড়ার অধিকাংশ তাঁতিই নারী।
এখানকার আলকা গ্রামের তাঁতি শিরিন বেগম বলেন, ‘সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে গামছা বোনার কাজ করি। দিনে একথান বা চারটি গামছা বুনতে পারি। আবার সময় বেশি পেলে বেশি গামছাও বুনতে পারি। সাধারণত লম্বায় চার হাত ও চওড়ায় দুই হাত গামছা চারটি বিক্রি করা হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। এছাড়া লম্বায় সাড়ে তিন হাত ও চওড়ায় দেড় হাত গামছা টারটি বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। অনেক সময় রঙ, নকশা ও গুণগত মানের জন্য গামছার দাম কম বেশিও হয়ে থাকে। একথান বা চারটি গামছা বিক্রি করলে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাভ হয়। তবে আগে আরও বেশি লাভ থাকতো। এখন সুতার দাম বেশি হওয়ার কারণে লাভ আগের চাইতে কম হয়।’
তাঁতি আলেয়া বেগম বলেন, ‘গামছার সুতা কিনতে পাওয়া যায় ফুলতলার বাজার ও খুলনার বাজারে। দেশীয় এসব সুতার দাম দিন দিন বেড়েই চলছে। তাই আমাদের গামছা বুননের কাজও দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে। কারণ আগের তুলনায় সুতার দাম এখন অনেক বেশি। এজন্য আমাদের অনেকে গামছা বুননের কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য কাজ করছে। ফলে এখানকার তাঁত ও তাঁতির সংখ্যাও দিন দিন কমছে।’
তাঁতি পারভিন বেগম বলেন, ‘গামছা বুননের নকশা আমরা নিজেরাই করে থাকি। আমাদের এখানে বোনা গামছার নকশাগুলোর নাম— ঝুড়ি, চেক, ঝালকাঠি, লেডিসসহ ইত্যাদি। তবে গামছার জমিন আর পাড়ের রঙ ও নকশার মধ্যে কিছুটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। অর্থাত্ পাড় এবং জমিনের রঙ ও নকশা আলাদা আলাদা রঙের ও নকশার হয়ে থাকে। তাই এখানকার প্রতিটি গামছারই তিন থেকে পাঁচ ইঞ্চি চওড়া পাড় দেখা যাবে। এছাড়া এখানকার বোনা গামছার রঙ সাধারণত উজ্জ্বল হয়ে থাকে। লাল, সাদা, নীল, হলুদ, খয়েরিসহ প্রায় সব কটি রঙের সুতার ব্যবহার দেখা যাবে এখানকার বোনা গামছায়।’
তাঁতি মতিয়ার বিশ্বাস বলেন, ‘গামছা বুননের পেশা আমাদের বাবা-দাদাদের সময় থেকে দেখে আসছি। বলা যায় এটা আমাদের আদি পেশা। তাই এখানকার প্রায় প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি সদস্যই এই গামছা বোনার কাজের সঙ্গে জড়িত। অনেকের মতে এখানকার গামছা বুননের ঐতিহ্য প্রায় দুই থেকে আড়াইশ বছরের। রঙে, নকশায় এবং মানবৈচিত্র্যে এখানকার গামছার সুনাম ছিলো সারাদেশেই। অবশ্য গুণগত মানের সুনাম এখনও আছে। অর্থাত্ তাঁত ও তাঁতির সংখ্যা দিন দিন কমেছে। তার অন্যতম কারণ হলো-সুতার দাম দিন দিন বেড়েই চলছে। সরকারি-বেসরকারি এসব সুতার মিল এখন অধিকাংশই বন্ধ। তাই সুতা আসে অন্য জায়গা থেকে। সেই সুতার দামও বেশি। তাই সুতা কিনে গামছা বুনে লাভও বেশি করা যায় না। আর লাভ বেশি না হওয়ার কারণে অনেক তাঁতি গামছা বোনা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে গিয়েছে। অন্যদিকে মেশিনের তৈরি গামছার দাম কম হওয়াতে হাতে বোনা গামছার চাহিদাও কমেছে। তাই কয়েক বছর আগেও আলকা ও দামোদর গ্রামে পাঁচ শতাধিক তাঁত ছিলো। এখন সেখান থেকে কমে দুই থেকে আড়াইশ তাঁত আছে। এছাড়া জামেরিয়া গ্রামেও কিছু তাঁত এখনও চলছে।’
তাঁতি আনোয়ার বিশ্বাস বলেন, ‘সারা বছরই আমরা গামছা বুনি। তবে ঈদ, বৈশাখ, পূজা বা বিভিন্ন উত্সবের সময় গামছার চাহিদা বেশি থাকে। তখন আমরাও বেশি গামছা বুনে থাকি। গামছা বোনার জন্য আমরা প্রথমে বাজার থেকে সুতা কিনি। তারপর রঙ ও মাড় দিয়ে রোদে শুকাই। সেখান থেকে কিছু সুতা দিয়ে টানা বাঁধি। আবার কিছু সুতা চরকায় পেঁচিয়ে সেখান থেকে ভিমে বা গুটিতে পেঁচাই। তারপর বোনা শুরু করি। বোনা শেষ হলে ভাঁজ করে বিক্রির জন্য রেখে দিই।’
এখানকার তাঁতগুলোতে একজন তাঁতি একটি তাঁতে বুননের কাজ করেন। তার কোনো সহকারীর প্রয়োজন হয় না। হাতে টানা এই তাঁতগুলো মাটির ওপর বসানো। আর তাঁতি বসেন মাটিতে কিছুটা গর্ত করে সেই গর্তে। তাঁত বোনার সময় তাঁতির হাত ও পা একসঙ্গে কাজ করে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. নাজমুল ইসলাম বলেন ‘এখানকার গামছা দেশের ঐতিহ্যবাহী বুনন শিল্পের একটি। কিন্তু সুতার দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে এখানকার তাঁত ও তাঁতির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী বুনন শিল্পটি। তাই এখন এই শিল্পকে জাগিয়ে তুলতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা। তাদের সহযোগিতা পেলে এই শিল্প আবার ফিরে পেতে পারে তার পুরোনো ঐতিহ্য এবং সেই সঙ্গে তাঁতিরাও পুনরায় ফিরে আসতে পারে তাদের পারিবারিক আদি পেশায়।’
