সমাবর্তন বক্তৃতা

বাঁচার মতো বাঁচো

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:২৩
প্রো ভি ডে ন্স ক লে জ ভায়োলা ডেভিস একজন মার্কিন অভিনেত্রী। তিনি প্রোভিডেন্স কলেজ থেকে পড়াশুনা শেষ করেন। এরপর অভিনয় জীবনে প্রবেশ করেন। ২০১২ সালে প্রোভিডেন্স কলেজের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হন তিনি। এখানকার নাট্যকলার সহযোগী অধ্যাপক জন গ্যারিটি যখন আমাকে বিমানবন্দরে অভিবাদন জানালেন তখন আমি তাকে প্রথম যে কথাটি বলি তা হলো, ‘আমি অনেক নার্ভাস, আমাকে ১২০০ ছাত্র-ছাত্রীর সামনে কথা বলতে হবে।’ এবং তিনি বললেন, ‘সংখ্যা আরো কিছু বেশি হবে’! কিন্তু, একটি কথা বলতেই হবে, সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমাকে আমন্ত্রিত হওয়ায় আমি গর্বিত। আমি আজকের বক্তৃতায় যে কথাগুলো বলবো তা এখন থেকে ১০ বছর আগে আমার নিজের কাছেই সম্পূর্ণ ভিন্নরকম মনে হতো, বিয়ের পূর্বে, সন্তান জন্ম নেয়ার পূর্বে, আমার বাবার মৃত্যুর পূর্বে, মধ্য বয়সের পূর্বের কথা সেগুলো। আমি হয়তো বলার জন্য অনেক কথাই তৈরি করে নিয়ে আসতাম এবং নাটকীয় কথা দিয়ে বক্তৃতা প্রস্তুত করতাম। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, এটা সে সময় নয়। সুতরাং এখন আমি তোমাদেরকে কী বলতে পারি? আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু লেথ ফ্র্যাঙ্কলিনের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে রাত জেগে আড্ডা দেয়া এবং আবেগতাড়িত কথাবার্তা বলেছি। তার সাথে এভাবে আলাপের পর আমি তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি এবং তার ভাষায় বলতে চেষ্টা করি, ‘ওহ্ ভী, কেউ তোমাকে বলবে না সে সুখী। একমাত্র ব্যতিক্রম ২ বছর বয়সী শিশু এবং ৮০ বছর বয়স্ক কোন বিলিওনিয়র।’ আমি ২ বছর বয়সী তো দেখেছি অনেক কিন্তু ৮০ বছর বয়সী বিলিওনিয়র দেখিনি। হতে পারে হিউগ হেফনার, কিন্তু... কিছু বিশেষ কারণে আমার মাথার মধ্যে তালগোল পাকিয়েছে এবং একটি চিত্রই বারবার পেয়েছি। তা ‘এক্সজোসিস্ট’ মুভি থেকে। তোমরা জানো, যখন এলিন ব্রুসটেইন দেরি করে বাসায় ফেরে তখন তার সাহায্যকারী তার কিশোরী কন্যা রেগানের রুমে প্রবেশ করে তখন দেখতে পায় ওই রুমটি অন্ধকারে তমাচ্ছন্ন এবং বরফশীতল। এই রুমের মধ্যে রাখা খাটে রেগানকে বেঁধে রেখে ঢেকে রাখা হয়েছে; যে আসলে রেগান না, বরং রেগানের অবয়বধারী শয়তান। এই সময় সাহায্যকারী বলে, আমি তোমাকে বিরক্ত করতে চাই না, কিন্তু তোমাকে এটা দেখতে হবে’। তখন সে দেখে এবং দেখায় রেগানের পেটের উপরে লেখা আছে, ‘আমাকে সাহায্য করো’। আমি এই সময় ভাবি এটাই জীবনের সব থেকে বড়ো মেটাফোর। আমি তোমাদেরকে আরো গভীর কিছু বলবো। আমাদের প্রত্যেকের নিজেদের স্বকীয়তা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের কবলে বন্দী হয়ে পড়ে। এবং এটা আমাদের প্রতিদিনের যুদ্ধ। কখনো কখনো আমি অনুভব করি, আমাদের প্রতিদিনের নিজস্বতা এবং অন্তরাত্মা এই শয়তানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এই শয়তানগুলো কিন্তু গরিলা বা ভয়ংকর মুখাবয়বের কোনো মানুষ বা প্রাণী নয় বরং তা আমাদের স্বপ্নে, বাসনায়, সফলতার সূত্রে, লোভে, অর্থ, পেশায় প্রভৃতিতে বাস করে এবং সব থেকে বিপজ্জনক শয়তান যেগুলো বিনা কারণে মনের মধ্যে বাস করে। আমি যদি না-ই জানি আমি কে তাহলে বুঝতে হবে এর কারণ- আমার আশপাশের মানুষ আমাকে যেভাবে চায় আমি নিজেকে সেভাবে উপস্থাপন করি। হয়তো আমি নিজেকে কোনোদিন জিজ্ঞাসা করিনি আমি কী হতে চাই, কী করতে চাই। তোমরা খেয়াল করে দেখো, তোমাদের জীবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিন কোন্ কোনিট। এই দিন দুটি হলো যে: তুমি জন্মেছো এবং যেদিনটিতে তুমি বুঝেছ যে, তুমি জন্মেছো। এই বিষয়টিকে আমি সবসময় আমার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখি। এটি অত্যন্ত কাজের বিষয়। জীবনের কোনো এক পর্যায়ে যখন মনে হবে এই পৃথিবীতে না আসলেই ভালো হতো কিংবা পৃথিবী এবং জীবনের উপর বিতৃষ্ণা জন্মাবে তখন এই দুটি বিষয় স্মরণ করবে। আমার বাবা যখন মৃত্যুশজ্জায় তখন আমার মায়ের বয়স ৪২ বছর। কিন্তু নার্সরা অপেক্ষা করছিল বাবাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমার মা সেই অনুমতি দিতে পারছিলেন না। এখন বলি, আমি কী এবং তা কীভাবে হতে চেয়েছিলাম। আমি একজন ‘আর্টিস্ট’ হতে চেয়েছিলাম। বাবার মৃত্যুর সময় আমার কোনো স্বপ্ন ছিল না। আমি ভেবেছিলাম বিয়ে হবে না বা করবো না। এরপরও বিয়ে হলো। বিয়ের অনুষ্ঠান যে ভবনে হয়েছিল সেই ভবনের লিফটে দাঁড়িয়ে আমি আপন মনে ভাবছিলাম, এই আমি ৩৮ বছরের আমি নই, ২০ বছরের সেই তরুণী। অবশ্য আমাকে কেউ কেউ বলেছিল, বিয়ে করা অর্থ নিজের মৃত্যু নিজে ডেকে আনা! এবং সেই আমিই অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সাথে বিয়ের মন্ত্রপাঠ সম্পন্ন করলাম। সে সময় ৪৬ বছর বয়সে ২ বছর বয়সের এক সন্তানের মা হলে কী ধরনের অনুভূতি হতে পারে সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। এরপরও আমি এই পর্যায়ে এসেছি। এবং জীবনকে উপভোগ করছি ওই ‘আমাকে সাহায্য কর’ কথাটি আমার মনের মধ্যে গুঞ্জরিত হতে শুনি। এখন আমি জানি,আমি কী এবং কোন্ পর্যায়ে আছি। আর আমরা সকলে তো জানি মানুষ তার মায়ের গর্ভে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাস করে। ভালো সংবাদ হলো আমরা কেমন এবং আমাদের মনের এই শয়তানকে কীভাবে দূর করতে হয় তা আমরা জানতে পারি আমাদের জীবনের মাধ্যমেই। আর আমরা এটা কীভাবে জানি? যারা বলে জীবনের লক্ষ্য কী? আমি তাদেরকে বলি, ‘তোমরা জানো তোমাদের জীবনের লক্ষ্য কী’। আর যারা তা জানে আমি তাদেরকে বলি, ‘এবার ঝাঁপিয়ে পড়ো’। আমাদের পূর্বসূরীরা তো আমাদেরকে এই শিক্ষা দিয়ে গেছেন এবং এই শিক্ষা আমরা ইতিহাস থেকেই নিতে পারি। আমাদের কর্মের মাধ্যমে নিজেদেরকে চিনতে, জানতে পারি এবং ঈশ্বরকে পেতে পারি। এভাবেই আমরা নিজেরা নিজেদেরকে আবিষ্কার করতে পারি নতুনভাবে। আর এই অনুভূতিটা আসে একান্তই মনের গভীর থেকে। আজকে প্রোভিডেন্স কলেজের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যে ১২০০ ছাত্র-ছাত্রী তাদের স্নাতক শেষে এই পর্যায়ে এসে বলবো, তোমাদের জীবনে নতুন এক অভিযানের সূচনা হতে চলেছে। আমি তোমাদেরকে বলবো, ‘যাও, এবং বাঁচো, বাঁচার মতো বাঁচো’। (সংক্ষিপ্ত)