অস্ত্র গোলা-বারুদ ছাড়াই সামনে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:২০
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন! তবে এ যুদ্ধে অস্ত্র, গোলা-বারুদ, কামান, যুদ্ধ বিমান কিংবা সাবমেরিন ব্যবহার হবে না। থাকবে না সশস্ত্র সৈন্য। প্রশ্ন জাগে সৈন্য ছাড়া তাহলে কিসের যুদ্ধ? যুদ্ধটা হলো তথ্যযুদ্ধ। অস্ত্র বলতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে এমন কম্পিউটার। আর যোদ্ধা হলেন কম্পিউটার প্রযুক্তিতে অত্যন্ত দক্ষ একদল তরুণ। ইতিমধ্যে দেশে দেশে এ যুদ্ধের দামামা বাজছে। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার নেটওয়ার্কে চীনা হ্যাকাররা অনুপ্রবেশ করে তথ্য ‘চুরি’ করছে। আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হ্যাকাররা এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। শুধু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার নয়, চীনা হ্যাকারদের কবলে পড়তে হয়েছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ই-মেইল অ্যাকাউন্টসহ জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও। গত ৩১ জানুয়ারি আমেরিকার বিশ্বখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকা হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে। একই দিনে আরেক বিশ্বখ্যাত মার্কিন পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসও হ্যাকারদের কবলে পড়ে। পত্রিকাটি জানায়, চীনা হ্যাকাররা গত চার মাসে নিরবচ্ছিন্নভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওয়ের পরিবার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদের পাহাড় গড়েছে— এমন একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যেদিনই প্রকাশ করা হয় সেইদিনই সাইবার হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক কোম্পানি ম্যানডিয়ান্ট গত সোমবার জানিয়েছে, বিশ্বের একের পর এক সাইবার হামলার নেপথ্যে আছে চীনের সামরিক বাহিনীর অন্যতম গোপন ‘ইউনিট ৬১৩৯৮’। এই ইউনিট ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বের কমপক্ষে ১৪১টি প্রতিষ্ঠানের ‘শত শত টেরাবাইট উপাত্ত চুরি করেছে’। সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করে চীন ম্যানডিয়ান্টের প্রতিবেদনের সত্যাতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। চীনের কর্মকর্তারা বলছেন, কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের সঙ্গে চীন সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। সরকার এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। তবে সাইবার যুদ্ধ যে একটা বাঁধছেই এটা নিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেট্টা এ ব্যাপারে বলেছেন, আগামী দিনের সাইবার জগত্ই হবে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। নিজেদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে আগেই হামলা চালাবে। চীনের বিরুদ্ধে আরো যত অভিযোগ অপারেশন শ্যাডি রেট:ইন্টারনেট নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যাকাফির উদ্ধৃতি দিয়ে আমেরিকার গণমাধ্যম জানিয়েছে, ২০০৬-২০১১ সালের মধ্যে চীনের হ্যাকাররা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানসহ ৭২টি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার হ্যাকিং করে। ম্যাকাফির ভাইস প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি আলপারোভিচ বলেন, এসব উপাত্ত কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে তা একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। তবে তার পরিমাণ যদি খুব সামান্য হয়ে থাকে তাহলেও তা অপূরণীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি। যেসব দেশ ও সংস্থা এ হামলার শিকার হয় তাদের মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কানাডা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংগঠন আসিয়ান, ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি-ডপিং এজেন্সি এবং সামরিক ঠিকাদার থেকে শুরু করে উচ্চ প্রযুক্তির নিরাপত্তা কোম্পানি। গুগল:২০১১ সালে প্রযুক্তির জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান গুগল জানায়, জিনান প্রদেশের হ্যাকাররা শতাধিক মার্কিন কর্মকর্তা, সামরিক ব্যক্তি ও সাংবাদিকের ই-মেইল অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ করে তথ্য চুরি করেছে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে চীন থেকে এই জটিল সাইবার হামলা চালানো হয়। উইকিলিকসের ফাঁস করা কূটনৈতিক তারবার্তা নিশ্চিত করেছে সাইবার হামলার পেছনে একজন জ্যেষ্ঠ চীনা কর্মকর্তার হাত ছিল। দক্ষিণ কোরিয়া: দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ, চীনা হ্যাকাররা গত বছরের জুলাইয়ে একটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রায় ৩৫ মিলিয়ন একাউন্ট হ্যাক করেছে। লকারহিড মার্টিন: ২০১১ সালে আমেরিকার গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করে, ২০০৯ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান লকারহিড মার্টিনে চীনা হ্যাকাররা ‘বিশেষ’ সাইবার হামলা চালিয়েছে। সে সময় লকারহিড মার্টিনের কম্পিউটার থেকে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধ বিমান সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য চুরি যায়। কোকাকোলা:বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ পানীয় প্রতিষ্ঠান কোকাকোলা জানিয়েছে, ২০০৯ সালে চীনের হুইয়ুন প্রদেশের একটি জুস কোম্পানি কেনার চেষ্টা করলে তাদের কম্পিউটার সিস্টেম ভেঙ্গে ফেলে চীনা হ্যাকাররা। প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তার কাছে ই-মেইলে কম্পিউটারের জন্য ক্ষতিকর একটি বার্তা পাঠায়। ওই ই-মেইল বার্তাটি খোলার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায় হ্যাকারদের কাছে। পেন্টাগন:চীনা সামরিক বাহিনী ২০০৭ সালে পেন্টাগনের কম্পিউটার ব্যবস্থা হ্যাক করে। ২০১০ সালে ডেইলি মেইলে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, হ্যাকাররা হোয়াইট হাউসের এমন একটি নেটওয়ার্কে হামলা চালিয়েছে যেটিতে পারমাণবিক বোমা বিষয়ক তথ্যাদি সংরক্ষিত থাকে। গোস্ট নেট:কানাডার গবেষকরা ২০০৯ সালে ঘোষণা দিয়েছে গত ১০ মাস জুড়ে অব্যাহত একটি বড় সাইবার আক্রমণের চিহ্ন তারা দেখতে পেয়েছে। গোস্ট নেট নামে এই হামলাটি ১০৩টি দেশের ১২৯৫টি কম্পিউটারে চালানো হয়েছে। তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাইলামার সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসে হামলা চালানো ছিল এই চক্রটির লক্ষ্য। নাসা:২০১১ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি ৪৭টি সাইবার আক্রমণের শিকার হয়। চীনের আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করে হ্যাকাররা মহাকাশে নাসার রোবট নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা জেট প্রোপালশান ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। জাপান:জাপানের শীর্ষ অস্ত্র উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান মিতসুবিশি তাদের মিসাইল, সাবমেরিন ও পরমাণু জ্বালানি স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে। ২০১১ সালে তাদের ৮০টির মতো সার্ভার ও কম্পিউটার সাইবার হামলার শিকার হয়। আর এ ঘটনার জন্য দায়ী করা হয় চীনকেই। ভারত:ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের কম্পিউটারে ক্ষতিকর প্রোগ্রাম দেখতে পেয়েছেন। একটি ভাইরাস কম্পিউটার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যেটি ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। চীনের একটি আইপি অ্যাড্রেস থেকে এ ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। চীন যতই অস্বীকার করুক ইন্টারনেট নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি তাদেরকেই এসব ঘটনার জন্য অভিযুক্ত করেছে। ইন্টারনেট সার্ভিসেস কোম্পানি আকামাই টেকনোলজি দাবি করেছে, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে সারা বিশ্বে যত সাইবার হামলা হয়েছে তার বেশিরভাই এসেছে চীন থেকে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ১৩ শতাংশ ও রাশিয়া ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হামলার শিকার হয়েছে। সাইবার হামলার ব্যাপারে ব্যাপক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে আমেরিকা। এ ধরনের হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে তা মোকাবিলায় আগেভাগেই একই ধরনের হামলা চালানোর নীতিমালা প্রণয়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৯ সালে পেন্টাগন জানিয়েছে, সাইবার হামলা রোধে ও ক্ষতিগ্রস্ত কম্পিউটারের তথ্য উদঘাটনে ছয় মাসে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতসহ অন্যান্য দেশেও হামলা রোধে কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের নিয়ে পৃথক সেল গঠন করা হয়েছে।