নারীরা ঘরে বাইরে বৈষম্যের শিকার। এই একবিংশ শতাব্দিতে এসেও ঘরের বাইরে যায়গা করে নেয়ার জন্য তাদেরকে যেমন নিজের ঘরেই প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে তেমনি লড়তে হচ্ছে এমন একটা সমাজের বিরুদ্ধে যে সমাজের পুরুষ নামক একশ্রেণীর হিংস্র দানবের বিরুদ্ধে যারা নারীদেরকে শুধু ভোগের সামগ্রী হিসেবেই কল্পনা করে। ঘরের বাইরে পা বাড়ালেই বিপদ, যেন প্রতিকূল পরিস্থিতি তার নিত্য সহচর। তবু সেই প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে কিছু নারী শুধু অদম্য মনের জোর আর সাহস নিয়ে নিজেদের সকল বাধাকে জয় করে চলেছে । তাদের কয়েকজন নারীর গল্প বলব এখানে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সকল পেশায়ই পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সমানভাবে অংশগ্রহণ করলেও পেশাদার ট্যাক্সি ড্রাইভিংয়ে এখনও পর্যন্ত পুরুষেরাই প্রায় শতভাগ স্থান দখল করে আছে। নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার বিবেচনা করে ভারতের দিল্লীর একটি ক্যাব কোম্পানি শুধু নারীদের জন্য ক্যাব ড্রাইভার এবং যাত্রী বহনের কাজ করে আসছে। তেমন একজন ড্রাইভার একত্রিশ বছরের শান্তি শর্মা। শান্তির মতে, আমি গর্ব অনুভব করি যখন আমি রাস্তায় থাকি, কারণ এই ট্যাক্সি সেবাটি শুধু মহিলাদের জন্য এবং আমি একজন নারী। ঐ কোম্পানির যে আটজন মহিলা ট্যাক্সি ড্রাইভার আছে শান্তি তাদের অন্যতম। সম্প্রতি দিল্লীর বাসে এক মেডিক্যাল ছাত্রী ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ড শান্তি এবং তার সহকর্মীদের ব্যস্ততা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শান্তির মতে যে সকল মহিলা অন্য ক্যাবের সেবা গ্রহণ করত তারাও আমাদের দিকে ঝুঁকছে।
দিল্লীর অধিকাংশ নারীর মতে ধারাবাহিকভাবে বিশেষ করে গণপরিবহনে মহিলারা ক্রমাগতভাবে হয়রানির শিকার। কিন্তু মহিলা ক্যাব চালকদের জীবন অত সহজ নয়। তাদের অনেকেই ক্যাব চালানোর আগে এমনকি একদিনের জন্যও ট্যাক্সিতেই ওঠেনি। ক্যাব চালানোর জন্য তাদের শুধু কয়েকমাস ক্যাব চালানো এবং রাস্তার নিয়ম সম্পর্কে প্রশিক্ষণই দেয়া হয়নি, সেই সাথে দেয়া হয়েছে প্রাথমিক চিকিত্সা এবং আত্মরক্ষার কৌশলও। ট্যাক্সিতে পেট্রোল ভরার সময় একজন মহিলা ট্যাক্সি ড্রাইভার একজন পুরুষ চালক কর্তৃক আক্রান্ত হয়। এক ধনাঢ্য দম্পতি আরেক মহিলা চালককে আক্রমণ করে কারণ প্রধান সড়কে তাদের রাস্তা ছেড়ে দেয়ার জন্য সে ভুল পথে আসতে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
এই কাজটি শুরু হওয়ার পর থেকে শান্তি শর্মা তার তিন মেয়েকে নিয়ে ২০১১ সাল থেকে ট্যাক্সিক্যাব চালিয়ে আসছে এবং এটা তার জীবনকে বদলে দিয়েছে। তার পরিবারকে সহায়তা দিতে এই প্রথম সে মাসে ২৫০ ডলার উপার্জন করছে। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে শান্তি বলেন, যখন আমি কোথাও গাড়ি পার্ক করতে যাই তখন দেখি পাঁচ-ছয় জন পুরুষ মানুষ আমাকে বাধা দিয়ে জায়গাটা দখল করে নেয়। বাইরে রাস্তাটা খুব কঠিন। পুরুষ চালকেরা আমাকে একটা কঠিন সময়ে ফেলে দেয়। একজন মহিলাকে ড্রাইভিং করতে দেখলেই বিনা কারণে তারা অনবরত হর্ণ বাজাতে থাকে। তারা সর্বদা আমাকে ওভারটেক করার চেষ্টা করে। আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাকে সর্বদাই সতর্ক থাকতে হয়।
একস্থানে দেখা গেল একজন মহিলা ড্রাইভার ইউটার্ন নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে মুহূর্তে কিছু ট্যাক্সিক্যাব পিছনে জটলা বাধিয়ে দেয়। হয়তো দেখা গেল সরকারি জিপের গাড়ি চালক পিছনে অনবরত হর্ণ বাজিয়ে চলেছে। ফলে অন্য ক্যাব চালকেরাও মওকাটা লুফে নেয়। শর্মাকে একটু উদ্বিগ্ন দেখায়। কিন্তু হেসে সে ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলে দেয়। সাকা কনসাল্টিং উইং যখন নারীদের জন্য ট্যাক্সিক্যাবের এই উদ্যোগটি চালু করে তার পিছনে কিছু উদ্দেশ্য ছিল। নারীদের জন্য ক্যাব। এই ক্যাবের অংশীদার আজাদ ফাউন্ডেশন সেই সকল নারীকে সুযোগটা দিতে চেয়েছিল যারা দরিদ্র এবং অনগ্রসর পরিবার থেকে উঠে এসেছে এবং যারা পুরুষের পাশাপাশি উপার্জনে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলবে। নারীদের কাঁধে প্রযুক্তির দায়িত্বভার তুলে দেয়া বিশেষ করে মোটরগাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে, তারা চেয়েছিলো মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন এবং নারীদের জন্য সুযোগের দ্বার উন্মোচন করে দেয়া। একটি শাখার প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ আসলে ছিল নারীদের ট্যাক্সিক্যাব চালানো প্রশিক্ষণ দেয়া, তারা এখন ৫০ জন ড্রাইভার নিয়োগ দিয়েছে।
নারীদের খারাপ ড্রাইভার হওয়ার বিশেষ ঝুঁকি আছে। যে সকল নারী তাদের ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয় কিংবা অন্যান্য স্থান থেকে বাড়িতে যাতায়াতের ব্যাপারে প্রধানত পুরুষ চালকদের উপর নির্ভরশীল তারা স্বীকার করেছে যে, ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা উদ্বিগ্ন এবং তারা নারী চালকদের উপর এই দায়িত্ব অর্পণে যথেষ্ট অনাগ্রহী। সুতরাং নারী চালকদের প্রথম খরিদ্দার হচ্ছে বন্ধু অথবা আত্মীয়। অবশ্য তারা সার্ভিস পেয়ে যথেষ্ট খুশি এবং খবরটাও ছড়িয়ে দিয়েছে। শান্তি শর্মা বলেন, আমরা যখন মাত্র সাতজন চালক ছিলাম আমরা খুব কমই চোখে পড়তাম যা কোম্পানিকে সার্ভিসটা চালু করার সাহস জুগিয়েছিল। এটি শুরু হয়েছিলো একটি মাত্র ক্যাব এবং দুইজন চালক নিয়ে। সবার ধারণা ছিল, নারীদের দিয়ে দিল্লীতে ক্যাব চালানোর বিষয়টি সম্ভবপর হবে না। কিন্তু সেটা আমরা করে দেখিয়েছি এবং এখন কী হচ্ছে সেটা সকলে দেখছে। এখন সে অপেক্ষা করছে অষ্টম ক্যাবটি নামার জন্য। অধিকাংশই প্রায় সচ্ছল এবং স্বাধীন যাদের নিয়মিত প্রচুর ভ্রমণ করতে হয়। কেউ কেউ শহরে নতুন অথবা কিছুদিনের জন্য এসেছে। একজন স্থায়ী গ্রাহক প্রণীতা সুকণ্যা (৪০) একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থায় কাজ করেন। তিনি প্রবাস থেকে আগত সহকর্মীদের নিকট প্রায়ই এই ট্যাক্সিক্যাবের কথা উল্লেখ করেন।
দিল্লীতে মেডিক্যাল ছাত্রীটি নিহত হবার পর সারা বিশ্ব থেকে সাকা গ্রুপকে সাহায্যের জন্য ই-মেইল আসছে। এখন ভোক্তার সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ। অনেক মহিলা যারা প্রথমবারের মতো ভারতে আসছে, মেডিক্যাল ছাত্রী ধর্ষণের ভয়ংকর গল্পটি শুনেছে, তারা শহরটি সম্পর্কে কিছুই জানে না। সাকা তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং নিরাপদে দিল্লীকে দেখিয়ে দেয়। কিন্তু সুকণ্যা ঐ সকল মহিলা ক্যাবচালকের পদকে পছন্দ করেন যারা ভারতীয় সমাজে মুম্বাই কিংবা কলকাতায় তাদের সহকর্মীদের মতো সমভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। একটা ছোট্ট পরিবর্তনের ধারা একটা বিপ্লব আনতে পারে।
— দেবাশীষ পাল
