টর্নেডো ফৌজার শেষ দৌড়

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১৬
অবশেষে থেমে গেল ‘টারবানড টর্নেডো’র ছোটা। সারাবিশ্বকে বিস্ময়ের চাদরে ঢেকে রেখে ১০১ বছর বয়সেও দৌড়াতে থাকা ফৌজা সিং অবশেষে গতকাল হংকংয়ে ক্যারিয়ারের শেষ প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে অংশ নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল অনানুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বয়সী দৌড়বিদ বলে পরিচিত ফৌজা সিংয়ের ক্যারিয়ার। সেঞ্চুরি পার করে এসেও ক্যারিয়ারের শেষ দৌড়ে গত বছরের চেয়েও ভালো টাইমিং করলেন। তাই বিদায় বেলায় হেসে বলতে পারলেন, ‘আমি এখনও ফিট, আমি এখনও শক্তিশালী। আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন।’ ফৌজা সিংয়ের নাম লোকেরা আসলে জানলো তার বয়স ৯৩ বছর হওয়ার পরই। নব্বই ঊর্ধ্ব বয়স ভিত্তিক দৌড়বিদদের ম্যারাথনের বিশ্বরেকর্ড করে ফেললেন তিনি। তখনই লোকেরা প্রথম জানতে চাইলো—কে এই ফৌজা সিং? পাঞ্জাবের জলন্ধরে জন্ম নেয়া বর্তমানের এক বৃটিশ নাগরিক এই ফৌজা সিং। জন্মের পর পাঁচ বছর লেগেছিল তার হাঁটা শিখতে। হাঁটা শেখার পরও ঠিকমতো হাঁটতে পারতেন না। খানিক দূর হাঁটতে গেলেই পড়ে যেতেন। বন্ধুরা ‘খোঁড়া’ বলে খ্যাপাতো। বেশ বয়স পর্যন্ত এসব সমস্যা ভোগ করেছেন। আর এসব সমস্যা থেকে বের হতেই অনেকটা সেই বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘ফরেস্ট গাম্প’-এর মতো দৌড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ফৌজা। দৌড়টা অবশ্য পেশাদারি ভাবে শুরু করেননি তখনও। জীবনের নানা টানা পোড়েনে দৌড় হারিয়েই যেতে বসেছিল। নিজের ছেলে-মেয়ে-স্ত্রীদের মৃত্যু দেখেছেন চোখের সামনে। এসব শোকে একসময় হার মানতে বসেছিলেন। কিন্তু নিজেকে বারবার বলেছেন, যুদ্ধে শিখরা কখনো হারে না; হোক সে জীবনযুদ্ধ। এই জীবনযুদ্ধে শোকের কাছে না হারার জন্যই ৮৯ বছর বয়সে শুরু করলেন পেশাদার দৌড়। একটার পর একটা ম্যারাথনে অংশ নিতে থাকলেন। ২০১১ সালে টরোন্টোতে বিশ্বের প্রথম শতবর্ষী দৌড়বিদ হিসাবে ম্যারাথন দৌড়ালেন। কানাডাতে ওই বছরই তার নামে একটি আন্তর্জাতিক মিটে ৯৫-ঊর্ধ্ব বয়সীদের ১০০ মিটার থেকে ১৫০০ মিটারের সব রেকর্ড ভেঙে দেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, এর বেশিরভাগ ক্যাটাগরিতে ফৌজার আগে কোনো রেকর্ডই ছিল না। যদিও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ফৌজার এসব রেকর্ডকে স্বীকৃতি দেয় না। কারণ, ১৯১১ সালে জন্ম নেয়া ফৌজার কাছে কোনো জন্ম সনদপত্র নেই। গিনেজ কর্তৃপক্ষ স্বীকৃতি দিক আর নাই দিক; ফৌজার স্বীকৃতির অভাব নেই। তারই আত্মজীবনী অনুযায়ী লোকেরা তাকে ডাকে ‘টারবানড টর্নেডো’। ২০০৪ সালে এই কিংবদন্তিকে এডিডাস তাদের এক বিজ্ঞাপনে মোহাম্মদ আলী ও ডেভিড বেকহামের সঙ্গে হাজির করেছিল। ২০১২ অলিম্পিকে মশাল নিয়ে দৌড়েছেন তিনি। তার শততম জন্মবার্ষিকীতে চিঠি পাঠান খোদ ব্রিটেনের রানী। এরপর আর কী চাই! সে জন্যই বিদায়ের এই দিনেও ফৌজা সিংহের মুখজোড়া হাসি। সেই হাসি নিয়েই বললেন, ‘আমি আমার এই ক্যারিয়ার খুব উপভোগ করেছি। আজ খুব আনন্দের সঙ্গেই বিদায় নিচ্ছি। তবে আপনাদের খুব মিস করবো। তাই ঠিক করেছি; পেশাদার দৌড়ে আর না থাকলেও চ্যারিটি দৌড় ছাড়বো না।’ তাহলে এখানেও আসলে শেষ হচ্ছে না ফৌজার বিস্ময়।