মেলার মেয়াদ বাড়ছে না

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৩
অমর একুশে গ্রন্থমেলার সময় সাতদিন বাড়ানোর পক্ষে প্রকাশকরা। অন্যদিকে বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ এ দাবির বিপক্ষে—স্রেফ না বলে দিয়েছে। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক বলেন, নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এবছর মেলার পরিসর ছোট করা হয়েছে। ফলে দিন বাড়ানো কোনভাবেই সম্ভব হবে না। অপরদিকে প্রকাশকরা বলছেন, শাহবাগ আন্দোলনে মানুষের সম্পৃক্ততার কারণে এবার পাঠকরা বই সংগ্রহ করতে পারেননি। তাই এ সময়সীমা বাড়ানো উচিত একাডেমীর। প্রকাশকরা জামায়াত-শিবিরের চারদিনের হরতাল ও গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের কারণে পাঠক-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ও বেচা-বিক্রির হার কম হওয়ার কারণ দেখিয়ে মেলার সময়সীমা এক সপ্তাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। গতকাল রবিবার বিকেলে মেলার তথ্যকেন্দ্রের সামনে প্রকাশকদের তিনটি সমিতির যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে এ দাবি জানায়। এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, মেলার সময়সীমা বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই। তবে, প্রকাশকদের দাবির প্রেক্ষিতে মেলার শেষ দুইদিন ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টার পরিবর্তে সকাল ১১টায় মেলার দ্বার খুলে দেয়া হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দেশের অশান্ত পরিস্থিতিতে মেলার নিরাপত্তার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা জড়িত। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সে হিসাবে মেলার জন্য নির্ধারিত দিন কোনভাবেই বাড়ানো সম্ভব নয়।’ সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আগামী প্রকাশনীর ওসমান গনি, পুস্তক প্রকাশক-বিক্রয় কমিটির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন, অনুপম প্রকাশনীর মিলন কান্তি নাথ, সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ, অন্য প্রকাশের মাজহারুল ইসলাম, অনন্যা’র মনিরুল হক, অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের সৈয়দ জাকির হোসাইন, পাঠসূত্রের নির্বাহী প্রকাশক তনুজা আকবর, শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ চৌধুরী, তাম্রলিপির তরিকুল ইসলাম রনি প্রমুখ। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শ্রাবণের রবিন আহসান। ওসমান গনি বলেন, ‘এই বইমেলা শুধু বাংলা একাডেমীর বইমেলা নয়। এতে প্রকাশকরা অংশ নেয়। আমরা মেলার সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সাথে কোন বৈঠকে না বসেই আমাদের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। আমরা এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের গণজমায়েতের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আসছি। একাডেমী মেলার সময় না বাড়ালে আমরা এই মেলা প্রাঙ্গণে থাকবো ততদিন, যতদিন শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থাকবে।’ লিখিত বক্তব্যে রবিন আহসান বলেন, এসব বিষয়কে বিবেচনায় রেখে আমরা মেলা এক সপ্তাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু, একাডেমী আমাদের এই দাবিকে গ্রাহ্য করেনি।’ বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার প্রদান : গতকাল বিকেলে সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালের বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। সৃজনশীল আর মননশীল বিভাগে এ বছর বিজয়ী হয়েছেন নয় জন কবি-কথাসাহিত্যিক। আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে একাডেমী পুরস্কার তুলে দেন একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। এবারের বাংলা একাডেমীর পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন—কবিতায় যৌথভাবে সানাউল হক খান ও আবিদ আনোয়ার, কথাসাহিত্যে হরিশংকর জলদাস, প্রবন্ধে সনত্কুমার সাহা, গবেষণায় খোন্দকার সিরাজুল হক, শিশু সাহিত্যে মাহবুব তালুকদার, অনুবাদ সাহিত্যে ফকরুল আলম, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মাহবুব আলম এবং বিজ্ঞান/প্রযুক্তি/পরিবেশ সাহিত্যে তপন চক্রবর্তী। পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্মাননাপত্র, সম্মাননা স্মারক এবং এক লক্ষ টাকা মূল্যমানের চেক পুরস্কারস্বরূপ প্রদান করা হয়। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ও সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার তার প্রবর্তনলগ্ন থেকে একটি মান বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। এবার যারা পুরস্কার পেলেন তাঁরা নানাক্ষেত্রে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। আমরা আশাকরি এই পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে তাঁরা নতুনতর সৃষ্টির দিকে যাত্রা শুরু করার উত্সাহ লাভ করবেন।’ নজরুল মঞ্চের চিত্র : গতকাল রবিবার মেলার ২৪তম দিনে নজরুল মঞ্চে ৯টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এরমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডা. দীপু মনি উন্মোচন করেন মূর্ধণ্য থেকে প্রকাশিত ডা. খালেদা বেগমের ‘স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যান্য, ডা. মো. জায়েদ হোসেনের মেঘ বালিকা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন ডা. মোস্তফা জালাল মহীউদ্দিন এমপি, বইটি ভ্যালেন্টিনো প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত। এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম উন্মোচন করেন রোকসানা পারভীন সাথীর লিলিপুটের দেশে ও মোহাম্মদ মাসরুর আহসানের ‘অসম প্রেম’ বই দুটির। বইগুলো প্রকাশ করেছে নলেজ ভিউ। অধ্যাপক ড. আহমেদ মাওলা উন্মোচন করেন গাংচিল থেকে প্রকাশিত আহসানুল হক খান টুকুর চিত্কার বইটি। এদিকে, গত শনিবার বইমেলায় মোড়ক উন্মোচন করা হয় নজমুল হক নান্নুর গ্রন্থ ‘ইতিহাসের ধারায় চে গুয়েভারা’। বইটি প্রকাশ করেছেন নবরাগ প্রকাশনী। বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রথম সরকারি কূটনীতিক জাকারিয়া খান চৌধুরী। নতুন বই : রবিবারে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— জয়তী মেলায় এনেছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর উপন্যাস ‘ছায়া সঙ্গিনী’, নান্দনিক এনেছে মহাদেব সাহার ‘আত্মস্মৃতি ১৯৭৫: সেই অন্ধকার সেই বিভীষিকা’, কথাপ্রকাশ এনেছে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ‘অবিশ্বাস ও বিদ্বেষ পেরিয়ে’, আবেদ খানের ‘অনেক কথা বলার আছে’, অন্যপ্রকাশ এনেছে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘বিবি হাওয়ার আপনজন’, বাংলা একাডেমী এনেছে মিনার মনসুরের গবেষণাগ্রন্থ ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জীবন ও কর্ম’, অনন্যা এনেছে লুত্ফর রহমান রিটনের ‘অর্জুন’, উইসডম এনেছে ডা. রফিক আহমেদের ‘আপনার ঘাতককে চিনুন’, অ্যাডর্ন এনেছে রেজাউর রহমানের ‘পরজীবী প্রাণী’, অনিন্দ্য এনেছে মঈনুল আহসান সাবেরের ‘গল্পসমগ্র ৪-৫’, আলফ্রেড খোকনের ‘মনে আসছে যা যা’, এম আর মাহবুবের ‘রাষ্ট্র আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘বিবি হাওয়ার আপনজন’, শিখা প্রকাশ থেকে মাহমুদুর রহমান মান্নার ‘গণতন্ত্র ও নাগরিক আন্দোলন’, নালন্দা থেকে মামুনুর রশীদের নাটকসমগ্র-২, আফতার ব্রাদার্স থেকে এসেছে মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, আলামিন এনেছে সৌমিত্র দেবের ‘বিষয় গণমাধ্যম’, জয়তী এনেছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘ছায়া সঙ্গিনী’, দাউদ হায়দারের ‘ভালোবাসার কবিতা’, ভাষাচিত্র এনেছে নকিব খুকশির ‘কাছিমের পিঠে গণতন্ত্র’, মেলায় জাতীয় সাহিত্যপ্রকাশ এনেছে বিভুরঞ্জন সরকারের চারটি বই ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘আওয়ামী লীগ নিয়ে আশা ও আশঙ্কা’, ‘বৃত্তবন্দি রাজনীতি’ ও ‘দোষারোপের রাজনীতি’, ঐশী প্রকাশনী—সালমান ফরিদের ‘প্রজেক্ট টু থার্টিন’ ও ‘লীয়েত ইলতিইনা’, অনিন্দ্য প্রকাশনী মোকারম হোসেনের ‘জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার পুষ্প-বৃক্ষ’, অ্যাডর্ন রেজাউর রহমানের ‘পরজীবী প্রাণী’। মেলামঞ্চের আয়োজন : গতকাল রবিবার বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘আবদুল হক চৌধুরী : জীবন ও সাধনা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তসিকুল ইসলাম রাজা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ড. আবদুল ওয়াহাব, শাহিদা খাতুন এবং শিরীন আখতার। সভাপতিত্ব করেন শফিউল আলম। আজকের আয়োজন : আজ সোমবার মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘রশীদ চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রবিউল হুসাইন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন রফিকুন নবী, সামসুল ওয়ারেস এবং মইনুদ্দীন খালেদ। সভাপতিত্ব করবেন কাইয়ুম চৌধুরী। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।