ইসলামী ও সমমনা ১২ দলের ডাকা গতকালের হরতাল প্রতিহত করতে ভোর থেকেই রাজপথে সতর্ক প্রহরায় ছিল ১৪ দলের নেতা-কর্মীরা। হরতাল বিরোধী মিছিলে রাজপথ ছিল সরব। রাজধানীর প্রায় শতাধিক স্থানে হরতাল বিরোধী মিছিল ও সভা-সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল। অনেক স্থানে আবার ট্রাক ও মোটর সাইকেল শোভাযাত্রাও বের হয়। আর এসব কর্মসূচিতে সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে হরতাল বিরোধী কর্মসূচি পালনকালে ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ বলেন, বিএনপি-জামায়াত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো জঙ্গি রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র করছে। গতকালের হরতাল এ ষড়যন্ত্রেরই অংশ। এ কারণে হরতাল প্রতিহত করতে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ১৪ দল মাঠে রয়েছে। গতকাল বিকালে ধানমন্ডিতে ১৪ দলের এক বৈঠকে দেশব্যাপী তান্ডবের প্রতিবাদে আগামী ৪ মার্চ রাজধানীসহ সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
সকালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আওয়ামী সমর্থক গোষ্ঠীর ব্যানারে ২২টি সংগঠন হরতাল বিরোধী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো জঙ্গি রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র চলছে। জনগণ হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিহত করতে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। গণজাগরণ নিয়ে মিথ্যাচার হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এরা হুজুর (সা.)কে নিয়ে কথিত কুত্সার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মসজিদকে অপমান করেছে, জাতীয় পতাকা ও শহীদ মিনারকে অপমান করেছে। আর এসব ঘটনায় একটি পত্রিকাও উস্কানি দিয়েছে। তিনি বলেন, দেশের বিরুদ্ধে ধর্মের বিরুদ্ধে এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো তথ্য প্রচার করার অধিকার কোনো মিডিয়ার নেই।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম, সহ-সভাপতি মুকুল চৌধুরী, ফয়েজ উদ্দিন মিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদসহ নগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও কৃষকলীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতারা। সকাল ৯টা থেকেই বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে বিভিন্ন এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতারা মিছিল সহকারে উপস্থিত হন। পুরান ঢাকা, সদর ঘাট, কাওরান বাজার, মহাখালী ওয়ারলেস গেট এলাকায় মিছিল করেছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ঘাট শ্রমিক ইউনিয়ন ও বঙ্গবন্ধু কৃষি পরিষদ। সকাল ৯টার দিকে বঙ্গবন্ধু কৃষি পরিষদ কাওরান বাজারে ওয়াসা ভবনের সামনে থেকে লাঠি মিছিল বের করে। সংগঠনের সভাপতি মোবারক হোসেনের নেতৃত্বে মিছিলে শতাধিক নেতা-কর্মী অংশ নেয়। মিছিলটি কাওরান বাজার, সোনারগাঁও হোটেলের সামনের এলাকা প্রদক্ষিণ করে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের লাঠি মিছিলটি মহাখালী ওয়ারলেস এলাকা প্রদক্ষিণ করে। একই এলাকায় মিছিল করে ছাত্রলীগ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ঘাট শ্রমিক ইউনিয়ন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সদরঘাট এলাকা থেকে একটি লাঠি মিছিল বের করে। মিছিলটি পাটুয়াটুলি, ইসলামপুর, ওয়াইজঘাট ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থান প্রদক্ষিণ করে। বিআইডব্লিউটিএ ঘাট শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মহর চান বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের জন্য ডাকা এই হরতাল প্রতিহত করতে আমরা মাঠে নেমেছি। সকাল ৯টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকা থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদারের নেতৃত্বে একটি হরতাল বিরোধী মিছিল বের হয়। মিছিলটি মিরপুরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পল্লবীতে দুটি হরতাল বিরোধী মিছিল করে স্থানীয় ১৪ দলের নেতারা। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও দনিয়া এলাকায় হকিস্টিক হাতে হরতাল বিরোধী মিছিল বের হয়। মহাখালী এলাকায় ছাত্রলীগের তিতুমীর কলেজ শাখার নেতা-কর্মীরা দিনব্যাপী হরতাল বিরোধী মিছিল চালিয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে বংশাল ও কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগ যৌথভাবে একটি হরতাল বিরোধী মিছিল বের করে। এদিকে হরতালের প্রতিবাদে সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকারীরা গণমিছিল নিয়ে মত্স্য ভবন, জাতীয় প্রেসক্লাব, পল্টন ও দৈনিক বাংলার মোড় হয়ে একই রুটে আবার শাহবাগে গিয়ে মিলিত হয়।
যুব সংগ্রাম পরিষদের মিছিল ও সমাবেশ
হরতাল প্রতিহত করতে রাজধানীতে মিছিল ও সমাবেশ করেছে যুব সংগ্রাম পরিষদ। মিছিলটি বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে শুরু করে নূর হোসেন স্কোয়ার, মুক্তাঙ্গন, পল্টন মোড় হয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে এসে সমাবেশ করে। যুব সংগ্রাম পরিষদ নেতা মহানগর যুবলীগ (দক্ষিণ) সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে বক্তৃতা করেন যুবলীগ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মো. হারুন অর রশীদ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউছার, সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, যুব মহিলা লীগের সভানেত্রী নাজমা আক্তার এমপি, সাধারণ সম্পাদিকা অপু উকিল এমপি, জাতীয় যুব জোটের সভাপতি রোকনুজ্জামান রোকন, যুব আন্দোলনের সভাপতি মোশাহিদ আহমেদ, জাতীয় যুব ঐক্যের সভাপতি খায়রুল আলম, কেন্দ্রীয় যুবলীগের মো. ফারুক হোসেন, আতাউর রহমান, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন এমপি ও মহিউদ্দিন আহমেদ মহি প্রমুখ।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত অশুভ জোট ছদ্মবেশে দেশের বিভিন্ন স্থানে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে তারা নানা ফন্দি-ফিকির আঁটছে। নামে-বেনামে, প্রকাশ্যে, গোপনে একের পর এক দুরভিসন্ধিমূলক ন্যক্কারজনক ঘটানা তারা ঘটাচ্ছে। রবিবারের হরতালে সমর্থন দিয়ে বিএনপি তাদের মুখোশ উন্মোচিত করেছে। দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এই অপশক্তির তাণ্ডবের প্রতিবাদে আগামী ৪ মার্চ রাজধানীসহ সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল। এর আগে কর্মসূচি সফল করতে সকল পেশাজীবী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ১৪ দল মতবিনিময় করবে।
গতকাল রবিবার বিকালে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১৪ দলের বৈঠক শেষে মোহাম্মদ নাসিম আরো বলেন, গতকাল জনগণ হরতাল প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশবাসীর জীবনযাত্রা পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল। হরতাল ব্যর্থ হওয়ায় প্রমাণিত হয়েছে ভুয়া লিফলেট বিতরণ করে তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানিকগঞ্জের একটি গ্রামে কিছু দুষ্কৃতকারী জনজীবন ব্যাহত করার জন্য একটি রাজনৈতিক অফিস ভাঙচুর চালাতে যায়। পুলিশ বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের ওপর তারা হামলা চালায়। এ সময় আত্মরক্ষার্থে জনগণকে সাথে নিয়ে পুলিশ যা করেছে তা সঠিক ছিল। উল্লেখ্য, গতকাল হরতাল চলাকালে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে পুলিশের সঙ্গে হরতাল সমর্থকদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৫ জন নিহত হন।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এমপি, সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মল্লিক, জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়া, প্রেসিডিয়াম সদস্য শিরিন আক্তার, গণতন্ত্রী পার্টির নূরুর রহমান সেলিম, প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. শহীদুল্লাহ শিকদার, ডা. শাহাদাত হোসেন, গণআজাদী লীগের সভাপতি হাজী আব্দুস সামাদ, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের অসিত বরণ রায়, ন্যাপের ইসলাইল হোসেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আব্দুস সোহবান গোলাপ প্রমুখ।
