দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সরকারও চিন্তিত। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন, জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি এবং ব্লগে আল্লাহ, হযরত মোহাম্মদ (স.) ও ইসলাম সম্পর্কে কটূক্তি ইস্যুতে চলমান আন্দোলন- কার্যত এই তিনটি বিষয় সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। জনমতের সঙ্গে থেকে, তবে আবেগ তাড়িত না হয়ে দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের পথেই এসব কিছুর সমাধানের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল। বিশেষ করে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে যে দাবি সোচ্চার হয়ে উঠেছে, সে বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায়ই ফয়সালা করতে চায় সরকার। এক্ষেত্রে নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নিষিদ্ধের পথে হাঁটতে আগ্রহী নয়।
সরকারের এসব চিন্তা-ভাবনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার সদস্যদের অবহিত করে কিছু জরুরি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী কিছুদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বলেছেন ‘আবেগ নয়, ধৈর্য, সহনশীলতা ও বিচক্ষণতা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।’ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরস্পরবিরোধী মন্তব্য না করার পরামর্শ দিয়ে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যদের বলেছেন ‘কেউ কারো নির্দিষ্ট দায়িত্বের বাইরে কথা বলবেন না, যত সম্ভব কথা কম বলার চেষ্টা করবেন, যা বলবেন তা জেনে-বুঝে এবং দেশের সংবিধান ও আইনের আলোকে বলবেন, কারণ তরুণরা আবেগের ভাষায় কথা বলতে পারে তবে আপনারা তা পারেন না।’
গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে একাধিক মন্ত্রী ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান। তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে শাহবাগের আন্দোলনের বিষয়েও কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তার দল ও সরকার বদ্ধপরিকর। যত প্রতিকূলতাই আসুক না কেন, এ বিচার সম্পন্নে তিনি জাতির কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তবে আবেগে নয়, এ বিচার সম্পন্ন হবে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে। বিচারবিভাগের প্রতি সবারই শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত। বিচারবিভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কারোই উচিত হবে না। এ ব্যাপারে কথাবার্তা বলার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়ে মন্ত্রিসভার সদস্যদের শেখ হাসিনা বলেছেন, আপনারা সরকারের দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন। সুতরাং সেই দায়িত্ববোধ মাথায় রেখেই আপনাদের কথা বলতে হবে। কোনো উস্কানি বা আবেগের বশবর্তী হয়ে আপনাদের এমন কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য দেয়া ঠিক হবে না, যাতে সামগ্রিক পরিস্থিতিকে তা আরো উস্কে দিতে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে খেয়াল রাখার জন্য তিনি নির্দেশনা দেন।
সূত্রের দাবি, শাহবাগসহ সারাদেশে গণজাগরণ মঞ্চে দেশের তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কিছু উদ্বেগের কথাও জানিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে কুচক্রি মহল নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে সবাইকে এখন সতর্ক থাকতে হবে। সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে, ষড়যন্ত্রকারীরা গণজাগরণ মঞ্চে গা শিউরে ওঠার মত ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটানোরও চক্রান্ত করছে। সুতরাং চলমান এই আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের নিজেদেরও সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে কষ্ট না দিয়ে অন্য কোনো উপায়ে দেশব্যাপী এই আন্দোলন জাগ্রত রাখা যায় কিনা সে বিষয়েও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
নতুন প্রজন্মসহ বিভিন্ন মহল থেকে উচ্চারিত জামায়াত নিষিদ্ধের দাবির বিষয়েও বৈঠকে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, এ প্রসঙ্গে মন্ত্রীদের কেউ কেউ বিভিন্ন স্থানে নানা রকম কথা বলছেন। এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। যেন কোনো বিভ্রান্তি দেখা না দেয় সেজন্য, দায়িত্বপ্রাপ্তদের বাইরে অন্য কারো এসব বিষয়ে কথা বলা উচিত নয়। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে দেশে আইন-কানুন রয়েছে। এসব মাথায় রেখেই আমাদের এগোতে হবে, আবেগে কথা বলে পরিস্থিতি আরও জটিল করা ঠিক নয়। নির্বাহী আদেশে নয়, সরকার যে আইনি প্রক্রিয়ায়ই জামায়াত নিষিদ্ধের ইস্যু ফয়সালা করতে আগ্রহী, প্রচ্ছন্নভাবে প্রধানমন্ত্রী সেই ইঙ্গিতই দেন মন্ত্রিদের।
একজন মন্ত্রী জানান, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন-সকল ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়ে আমরা শ্রদ্ধাশীল। কোনো ধর্মকে অবমাননা সরকার বরদাশত করবে না। তবে এ নিয়ে যেন কেউ রাজনীতি কিংবা ষড়যন্ত্র করতে না পারে সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। কারও উস্কানিতে সায় না দিয়ে আগে সত্য জানার চেষ্টা করতে হবে। ব্লগে যারা এ কাজ করেছে তারা নিশ্চয়ই খারাপ কাজ করেছে। তবে বিষয়টিকে গণমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে যারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করেছেন, তারাও অবশ্যই অপরাধী। ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে ব্যাপারে কী করণীয় তা খেয়াল রাখতে তথ্যমন্ত্রীসহ সবাইকে চিন্তা করার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য নিয়মিত সংসদ অধিবেশনে যোগ না দেয়ায় তিরস্কার করে প্রধানমন্ত্রী তাদের বলেন, আপনারাই যদি না যান তাহলে এমপিরা কেন যাবেন। বিশেষ করে সিনিয়ররা নিয়মিত না গেলে জুনিয়ররাও উত্সাহ হারিয়ে ফেলবেন।’
সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রী গতকালের মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আরও বলেছেন, একসময় ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান অনেকের পছন্দ ছিল না, এ শ্লোগান তাদের গাত্রদাহের কারণ ছিল। এটি যে কোনো দলের নয়, বাঙালি জাতির সার্বজনীন শ্লোগান তা আজ আবারও প্রমাণিত। এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আজকাল দেখা যাচ্ছে কেউ কেউ শাহবাগে গিয়ে বড় বড় কথা বলছেন, অথচ তাদের দুইশ লোক জড়ো করারও ক্ষমতা নেই।
